ঢাকা ০৯:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদের শিরোনাম :
পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়? জেডএফসি-২: বাংলাদেশের কমব্যাট স্পোর্টসে নতুন দিগন্ত মোংলায়  জীবাশ্ম জ্বালানির নতুন প্রকল্প না করার দাবিতে মানববন্ধন রাজশাহীতে নারীসহ আলোচিত সাবেক ওসি মাহবুব আলম আটক  বাউফলে তিন লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে দোকানে তালা দেওয়ার অভিযোগ যুবদল কর্মীর বিরুদ্ধে ভোলায় ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে নারীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ মাদারীপুরে বেশি লাভের আশায় পচে গেল ৩ কোটি টাকার আলু পাথরঘাটায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাবিতে মানববন্ধন ভোলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ড্রেজার-বাল্কহেডসহ আটক ৭

গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে নয়া সমীকরণে ঢাকা-দিল্লি 

গঙ্গার পানি এবার শুধু নদীর স্রোত নয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করতে পারে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ৩০ বছরমেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি বছর ডিসেম্বরে। চুক্তি নবায়নের আগে তাই দুই দেশের মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন করে কূটনৈতিক দরকষাকষি। ঢাকার দাবি, নতুন চুক্তিতে গঙ্গার পানির বৈজ্ঞানিক, ন্যায্য ও টেকসই বণ্টনের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। দিল্লি চাইছে তার অভ্যন্তরীণ পানির চাহিদা ও পরিবর্তিত বাস্তবতাকে আলোচনায় রাখতে। কিন্তু এবারের আলোচনা আর শুধু পানি নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, এর প্রভাব পড়েছে সীমান্ত, বাণিজ্য, তিস্তা, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সম্ভাব্য প্রত্যর্পণ ইস্যুতেও। ফলে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন এখন দুই দেশের বৃহত্তর সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকেরা। বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে চুক্তিটি পর্যালোচনার জন্য উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছে এবং এ বিষয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এখন দিল্লির জবাবের অপেক্ষায় ঢাকা। ভারতের পক্ষ থেকে অতীতে বলা হয়েছে, গঙ্গা পানিবণ্টনসহ অভিন্ন নদীর বিষয়গুলো যৌথ নদী কমিশনের কাঠামোর মধ্যে আলোচনা করা যেতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যদি ভারত আমাদের এই যৌক্তিক অবস্থানে সাড়া না দেয়, তবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্য ক্ষেত্রগুলোতেও এর প্রভাব পড়তে বাধ্য। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ নতজানু কূটনীতির যুগ পার করেছে। গঙ্গা চুক্তির বিষয় পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠিত হয়েছে। এরই মধ্যে ভারতকে অবহিত করা হয়েছে। এখন তাদের সাড়া পাওয়ার অপেক্ষা। তিস্তা ইস্যু প্রসঙ্গে তিনি জানান, চীনকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ একটি কারিগরি মূল্যায়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর কার্যক্রম দ্রুতই শুরু হবে। এর ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই পরের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক হাসান মাহমুদ বলেন, ১৯৯৬ সালের চুক্তিকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। চুক্তির আওতায় ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানির প্রবাহ পরিমাপ করে শুষ্ক মৌসুমে দুই দেশের মধ্যে পানিবণ্টনের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, উজানে পানি প্রত্যাহার এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তনের কারণে চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকার উদ্বেগের জায়গা আরও বড়। তিনি আরও বলেন, গঙ্গা অববাহিকার পানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, জীববৈচিত্র্য এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে লবণাক্ততা বাড়ে, নদী ও খাল শুকিয়ে যায় এবং কৃষি ও পরিবেশে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। তাই নতুন চুক্তিতে শুধু নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি নয়; বরং নদীর সামগ্রিক প্রতিবেশ ও অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে বাংলাদেশ।

কূটনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, তিস্তা হয়ে উঠছে দ্বিতীয় ফ্রন্ট। গঙ্গার সঙ্গে আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসছে তিস্তা। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি এখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে অন্যতম অমীমাংসিত ইস্যু। ভারত তিস্তা নিয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার কথা বললেও বাংলাদেশ নদীটির পানির ন্যায্য হিস্যা এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়ে আসছে। এ অবস্থায় তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীনের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা নতুন ভূরাজনৈতিক মাত্রা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ তিস্তা নিয়ে চীনের সহায়তায় কারিগরি মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন আলোচনায় তিস্তা সরাসরি দরকষাকষির অংশ না হলেও এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ঢাকার কৌশলটি মূলত- ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করে নিজেদের বিকল্প ও কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা। চীনকে নিয়ে তিস্তা ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ সেই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ‘একদিকে তিস্তা নদীর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় চীনের অর্থায়নে কারিগরি সমীক্ষা প্রকল্পের প্রস্তুতি, অন্যদিকে গঙ্গা চুক্তির ডেডলাইন- সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন তার কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে দিল্লির সঙ্গে দরকষাকষি করতে চাইছে।তবে গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় বাধা হয়তো নদীর পানি নয়, রাজনৈতিক আস্থার সংকট। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে তার বিভিন্ন মন্তব্য ঢাকায় অসন্তোষ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্ন। ঢাকার পক্ষ থেকে তাকে ফেরত পাঠানোর দাবি থাকলেও দিল্লির অবস্থান এখনো দুই দেশের সম্পর্কে একটি স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে রয়েছে। এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছে শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগেও। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর অনুকূল পরিবেশ তৈরির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। ফলে পানি নিয়ে আলোচনা যখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে, তখন দুই দেশের রাজনৈতিক আস্থার সংকটও সমান্তরালে চলছে।

বিশ্লেষকেরা আরও বলছেন, বাণিজ্যেও একটা ঠান্ডা সম্পর্কের ছাপ পড়েছে। রাজনৈতিক দূরত্বের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে অর্থনৈতিক সম্পর্কেও। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে ১২ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। ট্রানজিট ও যোগাযোগের বিভিন্ন সুযোগ চালু থাকলেও সীমান্ত বাণিজ্য, শুল্ক, লজিস্টিকস এবং বাণিজ্যিক আস্থার প্রশ্নে জটিলতা রয়েছে। ফলে পানি নিয়ে নতুন বিরোধ তৈরি হলে তা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককেও আরও চাপের মুখে ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে দিল্লিরও সামনে কঠিন সমীকরণ। মনে হচ্ছে, ভারতের জন্যও গঙ্গা চুক্তি নবায়ন সহজ হবে না। ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের কৃষি, নগরায়ণ এবং শিল্পে পানির চাহিদা বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহের ধরনও বদলাচ্ছে। ফলে দিল্লিকে একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় প্রতিশ্রুতি বিবেচনায় নিতে হবে, অন্যদিকে নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও পানির চাহিদার বিষয়টিও সামলাতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও সূক্ষ্ম। ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীদের একটি বাংলাদেশ। সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সরাসরি যুক্ত। ফলে গঙ্গা চুক্তিতে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই ভারসাম্যও ঢাকাকে রক্ষা করতে হবে। কূটনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক মাস তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গঙ্গা চুক্তি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা, তিস্তা, বাণিজ্য এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ- প্রতিটি ইস্যু আলাদাভাবে হলেও শেষ পর্যন্ত একই কূটনৈতিক সমীকরণে এসে মিলবে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, গঙ্গা চুক্তি নিয়ে সামনে মূলত তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছে নতুন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, পুরোনো চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক টানাপোড়েন পানি আলোচনাকেও দীর্ঘসূত্রতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তবে যে পথই নেওয়া হোক, এবার বাংলাদেশের দরকষাকষির কেন্দ্রে শুধু কত পানি- এই প্রশ্ন থাকলে চলবে না। নদীর প্রবাহ, জলবায়ু পরিবর্তন, উজানের পানি প্রত্যাহার, পরিবেশগত প্রবাহ, তথ্যবিনিময় এবং দীর্ঘমেয়াদি অববাহিকা ব্যবস্থাপনাকে আলোচনার অংশ করতে হবে। কারণ গঙ্গার পানি বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি পররাষ্ট্রনীতির ইস্যু নয়; এটি কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ এবং কোটি মানুষের জীবিকার প্রশ্ন।

সুতরাং ডিসেম্বরের ডেডলাইন যত এগিয়ে আসছে, ততই পরিষ্কার হচ্ছে, এবার গঙ্গা চুক্তির টেবিলে শুধু দুই দেশের পানি বিশেষজ্ঞরা বসবেন না, আলোচিত হবে দুই দেশের বৃহত্তর ভূরাজনীতিও। তিস্তা, চীন, বাণিজ্য, সীমান্ত এবং শেখ হাসিনা- সবকিছুর ছায়া পড়বে সেই টেবিলে। গঙ্গার স্রোত কোন দিকে যাবে? সেই প্রশ্নের চেয়ে এখন বড় প্রশ্ন, ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক কোন দিকে যাবে?

বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, তিন দশক আগের চুক্তিটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংশোধন ও নবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন চুক্তি করার আগে অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের যুক্ত করে একটি ব্যাপক মূল্যায়ন ও পরিকল্পনা করা দরকার।

এশিয়ান গ্রোথ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা ড. এস নজরুল ইসলাম বলেন, নদী নিয়ে বাংলাদেশের এত দিনের বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে পরিবেশসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। নদী ব্যবস্থাপনা ও আইনি দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহার সম্পর্কিত জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের সনদ দ্রুত স্বাক্ষর ও অনুস্বাক্ষর (র‌্যাটিফাই) করা দরকার।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবন ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ বাঁচাতে এবং পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে নতুন চুক্তিতে ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক পানিপ্রাপ্তির সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি ক্লজ বা ধারা থাকা প্রয়োজন। তাদের সুপারিশ, তিন দশক আগের বাস্তবতার ভিত্তিতে তৈরি এই চুক্তি নবায়নের আগে বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীর গতিপ্রকৃতির পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নে কেবল আমলা বা রাজনীতিক নন; বরং অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও নগর পরিকল্পনাবিদদের যুক্ত করতে হবে।  নদীকে কেবল বাণিজ্যিক সম্পদ না ভেবে প্রকৃতিসম্মত ও পরিবেশগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। দরকষাকষিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে আন্তর্জাতিক নদী আইন বা জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের পানিকোর্স কনভেনশন দ্রুত অনুস্বাক্ষর করা দরকার। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে পানির ন্যূনতম প্রবাহের গ্যারান্টি বা বাংলাদেশের জন্য সুনির্দিষ্ট পানির হিস্যা আদায়ে আরও দক্ষ ও সুসংগঠিত কারিগরি দল গঠন করা দরকার বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

danik madhumati

জনপ্রিয় পোস্ট

পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা

গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে নয়া সমীকরণে ঢাকা-দিল্লি 

আপডেটের সময় : ০৬:১০:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গঙ্গার পানি এবার শুধু নদীর স্রোত নয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করতে পারে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ৩০ বছরমেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি বছর ডিসেম্বরে। চুক্তি নবায়নের আগে তাই দুই দেশের মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন করে কূটনৈতিক দরকষাকষি। ঢাকার দাবি, নতুন চুক্তিতে গঙ্গার পানির বৈজ্ঞানিক, ন্যায্য ও টেকসই বণ্টনের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। দিল্লি চাইছে তার অভ্যন্তরীণ পানির চাহিদা ও পরিবর্তিত বাস্তবতাকে আলোচনায় রাখতে। কিন্তু এবারের আলোচনা আর শুধু পানি নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, এর প্রভাব পড়েছে সীমান্ত, বাণিজ্য, তিস্তা, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সম্ভাব্য প্রত্যর্পণ ইস্যুতেও। ফলে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন এখন দুই দেশের বৃহত্তর সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকেরা। বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে চুক্তিটি পর্যালোচনার জন্য উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছে এবং এ বিষয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এখন দিল্লির জবাবের অপেক্ষায় ঢাকা। ভারতের পক্ষ থেকে অতীতে বলা হয়েছে, গঙ্গা পানিবণ্টনসহ অভিন্ন নদীর বিষয়গুলো যৌথ নদী কমিশনের কাঠামোর মধ্যে আলোচনা করা যেতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যদি ভারত আমাদের এই যৌক্তিক অবস্থানে সাড়া না দেয়, তবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্য ক্ষেত্রগুলোতেও এর প্রভাব পড়তে বাধ্য। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ নতজানু কূটনীতির যুগ পার করেছে। গঙ্গা চুক্তির বিষয় পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠিত হয়েছে। এরই মধ্যে ভারতকে অবহিত করা হয়েছে। এখন তাদের সাড়া পাওয়ার অপেক্ষা। তিস্তা ইস্যু প্রসঙ্গে তিনি জানান, চীনকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ একটি কারিগরি মূল্যায়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর কার্যক্রম দ্রুতই শুরু হবে। এর ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই পরের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক হাসান মাহমুদ বলেন, ১৯৯৬ সালের চুক্তিকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। চুক্তির আওতায় ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানির প্রবাহ পরিমাপ করে শুষ্ক মৌসুমে দুই দেশের মধ্যে পানিবণ্টনের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, উজানে পানি প্রত্যাহার এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তনের কারণে চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকার উদ্বেগের জায়গা আরও বড়। তিনি আরও বলেন, গঙ্গা অববাহিকার পানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, জীববৈচিত্র্য এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে লবণাক্ততা বাড়ে, নদী ও খাল শুকিয়ে যায় এবং কৃষি ও পরিবেশে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। তাই নতুন চুক্তিতে শুধু নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি নয়; বরং নদীর সামগ্রিক প্রতিবেশ ও অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে বাংলাদেশ।

কূটনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, তিস্তা হয়ে উঠছে দ্বিতীয় ফ্রন্ট। গঙ্গার সঙ্গে আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসছে তিস্তা। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি এখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে অন্যতম অমীমাংসিত ইস্যু। ভারত তিস্তা নিয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার কথা বললেও বাংলাদেশ নদীটির পানির ন্যায্য হিস্যা এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়ে আসছে। এ অবস্থায় তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীনের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা নতুন ভূরাজনৈতিক মাত্রা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ তিস্তা নিয়ে চীনের সহায়তায় কারিগরি মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন আলোচনায় তিস্তা সরাসরি দরকষাকষির অংশ না হলেও এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ঢাকার কৌশলটি মূলত- ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করে নিজেদের বিকল্প ও কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা। চীনকে নিয়ে তিস্তা ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ সেই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ‘একদিকে তিস্তা নদীর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় চীনের অর্থায়নে কারিগরি সমীক্ষা প্রকল্পের প্রস্তুতি, অন্যদিকে গঙ্গা চুক্তির ডেডলাইন- সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন তার কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে দিল্লির সঙ্গে দরকষাকষি করতে চাইছে।তবে গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় বাধা হয়তো নদীর পানি নয়, রাজনৈতিক আস্থার সংকট। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে তার বিভিন্ন মন্তব্য ঢাকায় অসন্তোষ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্ন। ঢাকার পক্ষ থেকে তাকে ফেরত পাঠানোর দাবি থাকলেও দিল্লির অবস্থান এখনো দুই দেশের সম্পর্কে একটি স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে রয়েছে। এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছে শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগেও। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর অনুকূল পরিবেশ তৈরির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। ফলে পানি নিয়ে আলোচনা যখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে, তখন দুই দেশের রাজনৈতিক আস্থার সংকটও সমান্তরালে চলছে।

বিশ্লেষকেরা আরও বলছেন, বাণিজ্যেও একটা ঠান্ডা সম্পর্কের ছাপ পড়েছে। রাজনৈতিক দূরত্বের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে অর্থনৈতিক সম্পর্কেও। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে ১২ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। ট্রানজিট ও যোগাযোগের বিভিন্ন সুযোগ চালু থাকলেও সীমান্ত বাণিজ্য, শুল্ক, লজিস্টিকস এবং বাণিজ্যিক আস্থার প্রশ্নে জটিলতা রয়েছে। ফলে পানি নিয়ে নতুন বিরোধ তৈরি হলে তা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককেও আরও চাপের মুখে ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে দিল্লিরও সামনে কঠিন সমীকরণ। মনে হচ্ছে, ভারতের জন্যও গঙ্গা চুক্তি নবায়ন সহজ হবে না। ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের কৃষি, নগরায়ণ এবং শিল্পে পানির চাহিদা বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহের ধরনও বদলাচ্ছে। ফলে দিল্লিকে একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় প্রতিশ্রুতি বিবেচনায় নিতে হবে, অন্যদিকে নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও পানির চাহিদার বিষয়টিও সামলাতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও সূক্ষ্ম। ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীদের একটি বাংলাদেশ। সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সরাসরি যুক্ত। ফলে গঙ্গা চুক্তিতে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই ভারসাম্যও ঢাকাকে রক্ষা করতে হবে। কূটনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক মাস তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গঙ্গা চুক্তি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা, তিস্তা, বাণিজ্য এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ- প্রতিটি ইস্যু আলাদাভাবে হলেও শেষ পর্যন্ত একই কূটনৈতিক সমীকরণে এসে মিলবে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, গঙ্গা চুক্তি নিয়ে সামনে মূলত তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছে নতুন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, পুরোনো চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক টানাপোড়েন পানি আলোচনাকেও দীর্ঘসূত্রতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তবে যে পথই নেওয়া হোক, এবার বাংলাদেশের দরকষাকষির কেন্দ্রে শুধু কত পানি- এই প্রশ্ন থাকলে চলবে না। নদীর প্রবাহ, জলবায়ু পরিবর্তন, উজানের পানি প্রত্যাহার, পরিবেশগত প্রবাহ, তথ্যবিনিময় এবং দীর্ঘমেয়াদি অববাহিকা ব্যবস্থাপনাকে আলোচনার অংশ করতে হবে। কারণ গঙ্গার পানি বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি পররাষ্ট্রনীতির ইস্যু নয়; এটি কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ এবং কোটি মানুষের জীবিকার প্রশ্ন।

সুতরাং ডিসেম্বরের ডেডলাইন যত এগিয়ে আসছে, ততই পরিষ্কার হচ্ছে, এবার গঙ্গা চুক্তির টেবিলে শুধু দুই দেশের পানি বিশেষজ্ঞরা বসবেন না, আলোচিত হবে দুই দেশের বৃহত্তর ভূরাজনীতিও। তিস্তা, চীন, বাণিজ্য, সীমান্ত এবং শেখ হাসিনা- সবকিছুর ছায়া পড়বে সেই টেবিলে। গঙ্গার স্রোত কোন দিকে যাবে? সেই প্রশ্নের চেয়ে এখন বড় প্রশ্ন, ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক কোন দিকে যাবে?

বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, তিন দশক আগের চুক্তিটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংশোধন ও নবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন চুক্তি করার আগে অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের যুক্ত করে একটি ব্যাপক মূল্যায়ন ও পরিকল্পনা করা দরকার।

এশিয়ান গ্রোথ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা ড. এস নজরুল ইসলাম বলেন, নদী নিয়ে বাংলাদেশের এত দিনের বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে পরিবেশসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। নদী ব্যবস্থাপনা ও আইনি দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহার সম্পর্কিত জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের সনদ দ্রুত স্বাক্ষর ও অনুস্বাক্ষর (র‌্যাটিফাই) করা দরকার।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবন ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ বাঁচাতে এবং পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে নতুন চুক্তিতে ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক পানিপ্রাপ্তির সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি ক্লজ বা ধারা থাকা প্রয়োজন। তাদের সুপারিশ, তিন দশক আগের বাস্তবতার ভিত্তিতে তৈরি এই চুক্তি নবায়নের আগে বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীর গতিপ্রকৃতির পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নে কেবল আমলা বা রাজনীতিক নন; বরং অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও নগর পরিকল্পনাবিদদের যুক্ত করতে হবে।  নদীকে কেবল বাণিজ্যিক সম্পদ না ভেবে প্রকৃতিসম্মত ও পরিবেশগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। দরকষাকষিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে আন্তর্জাতিক নদী আইন বা জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের পানিকোর্স কনভেনশন দ্রুত অনুস্বাক্ষর করা দরকার। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে পানির ন্যূনতম প্রবাহের গ্যারান্টি বা বাংলাদেশের জন্য সুনির্দিষ্ট পানির হিস্যা আদায়ে আরও দক্ষ ও সুসংগঠিত কারিগরি দল গঠন করা দরকার বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।