০৪:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
‘অগ্নিঝরা মার্চ’র ১৫তম দিন :

ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগ

###    ১৯৭১সালের ‘অগ্নিঝরা মার্চ’র ১৫তম দিন আজ। অগ্নিঝরা মার্চ বাঙালির যৌক্তিক স্বপ্নপুুরণের স্বাধীনতার মাস। বাংলাদেশের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্দু শেখ মুজিবুর রহমালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ’র মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির কয়েক হাজার বছরের সামাজিক-রাজনৈতিক স্বপ্ন পূরণের যাত্রা শুরু। স্বাধীনতা সংগ্রামে ১৯৭১ সালের এই মার্চেই রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে, একাত্তরের মার্চ মাসের দিনগুলো ছিল থমথমে, উৎকণ্ঠা, শঙ্কায় পরিপূর্ণ। চাপা উদ্বেগ, অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি। অবরুদ্ধ গণমানুষ ইতোমধ্যে প্রস্তুত চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য। লক্ষ্য একটাই, নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা। স্বাধীনতাকামী বাঙালির ঐক্য সুদৃঢ় হচ্ছিল প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের ‘স্বাধীনতা’র দুর্বার আকাঙ্খার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। বাংগালীর ইতিহাসের ৭১’র আজকের দিনে পূর্ব বাংলার পেক্ষাপট পাল্টে যায় বঙ্গবন্ধুর সশস্ত্র সংগ্রাম ও স্বাধীনতার ডাকে। ৭১’র অগ্নিঝরা মার্চের ১৫তম দিনের ঘটনা প্রবাহে সেনাবাহিনী ছাড়া সবকিছু বঙ্গবন্ধুর নিয়ন্ত্রণে। কঠোর গোপনীয়তা ইয়াহিয়ার ঢাকা আসেন। সফরসূচিতে ছিল না সাংবাদ সম্মেলনের ব্যবস্থা। দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু নতুন নির্দেশ ঘোষণা করেন এদিনে। ভুট্টোর দুই পার্টির সমস্যা সমাধানকে অগণতান্ত্রিক বলে উল্লেখ করেন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ। চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে সকল কাজে বাংলা প্রচলনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করে স্থানীয় শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীদের এক সভায় ‘বেতার কেন্দ্রে সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করে।
৭১’র ১৫ মার্চের এই দিনে সারা বাংলার অফিস-আদালতে পূর্ণ কর্মবিরতি চলে। রাজধানী ঢাকায় দিনব্যাপী সভা ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি ও বেসরকারি ভবনের শীর্ষে এবং যানবাহনে কালো পতাকা ওড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। আন্দোলন অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয় মুক্তিকামী বাঙালির কাছে। প্রতিপক্ষের আঘাতের জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুত সবাই। একাত্তরের এদিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করতে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান কড়া নিরাপত্তার মধ্যে করাচি থেকে ঢাকায় আসেন। বিমানবন্দরে সামরিক গর্ভানর লে. জেনারেল টিক্কা খান তাকে স্বাগত জানান। তবে কোনো সাংবাদিক ও বাঙালিকে এ সময় বিমানবন্দরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রামের একটি মিছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অবস্থানের পর বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাদা রঙের গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করতে যান। ১৬ মার্চ শুরু হবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব-ইয়াহিয়া খানের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক। স্বাধীনতার দাবিতে অটল থেকেই তিনি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনায় বসার ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ। এ প্রসঙ্গে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর গ্রন্থ ‘একাত্তরের দিনগুলো’তে লিখেছেন, ‘… সিঁড়ির মুখ থেকে জামি চেঁচিয়ে ডাকল, মা, ভাইয়া, শীঘ্রই এসো, খবর শুরু হয়ে গেছে। টিভিতে শেখ মুজিবকে দেখাচ্ছে। হুড়মুড়িয়ে উঠে নিচে ছুটলাম। খবর খানিকটা হয়ে গেছে। শেখ মুজিবের গাড়িতে পতপত করে উড়ছে কালো পতাকা। দেখে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। প্রতিবাদের কালো পতাকা উঁচিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় গিয়েছেন শেখ মুজিব। এর আগে কোনদিনও পাকিস্তান সরকার বাঙালীর প্রতিবাদের এই কালো পতাকা স্বীকার করে নেয়নি। এবার সেটাও সম্ভব হয়েছে।’
এদিন কবি সুফিয়া কামালের সভাপতিত্বে তোপখানা রোডে মহিলাদের এক সভা হয়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বেতার ও টিভি শিল্পীরা দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্যরা ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে গণসঙ্গীত, পথনাটক পরিবেশন করেন। এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দু’জন ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তাৎক্ষণিক পদত্যাগ করেন। এটিই ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন একমাত্র পদত্যাগ। এদিনে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের বাড়ি অভিমুখে সারাদিন শ্লোগানমুখর বিক্ষুব্ধ মিছিলের পর মিছিল আসা অব্যাহত থাকে। ঐতিহাসিক ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধুর ৩২নং রোডের বাড়িটি রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়। ঢাকার বিভিন্ন জায়গার চেকপোষ্ট বসিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের নজরদারি বন্ধের দাবি জানান বঙ্গবন্ধু। এরফলে বাঙালীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার সব চেষ্টাও ব্যর্থ হয় ইয়াহিয়া খানের সরকারের। সারা বাংলা উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ১৫ মার্চ বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে ছাত্র সমাবেশে সামরিক বাহিনীর নয়া আইন জারির প্রতিবাদে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ‘বাংলাদেশ আজ স্বাধীন’ বলে ঘোষণা দেন। সভায় ছাত্র নেতারা অবিলম্বে বাংলাদেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানান। এদিন ছাত্রদের সাথে একাত্বতা ঘোষনা করে আ স ম আব্দুর রব বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশেই সবকিছু চলবে। পাকিস্তান সরকারের সামরিক ফরমান আমরা আর মেনে চলবো না। দেশবাসীকে তাদের অধিকার বঞ্চিত করার প্রতিবাদস্বরূপ শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা তাদের খেতাব বর্জন অব্যাহত রাখেন। চারদিকে শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। শিল্পাচার্য জয়নুলের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন ও অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী তাদের রাষ্ট্রীয় খেতাব বর্জন করেন। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে খেতাব বর্জনের বিষয়টি ব্যাপক সাড়া ফেলে। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্যরা ভ্রাম্যমাণ ট্রাক নিয়ে গণসঙ্গীত ও পথনাটক পরিবেশন করেন এবং দেশরক্ষা বিভাগের বেসামরিক কর্মচারীরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশ উপেক্ষা করে কর্মবিরতি পালন করেন।
৭১’র আজকের দিনে খুলনার হাদিস পার্কের জনসভায় বাংলা জাতীয় লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান বলেন, বাংলার প্রতিটি মানুষ আজ বঙ্গবন্ধুর পেছনে একতাবদ্ধ। তিনি আরো বলেন, রেডিও, টিভি, ইপিআর, পুলিশ বাহিনী, সেক্রেটারিয়েট প্রভৃতি আজ আওয়ামী লীগ প্রধানের আজ্ঞাবাহী। পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো করাচিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে নতুন দাবি উত্থাপন করে বলেন, কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও পিপলস পার্টির সমন্বয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে হবে। করাচিতে এক জনসভায় কয়েকজন প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা বলেন, ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অনেক কথাই বলেছেন। কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন তার পিপলস পার্টি এ অঞ্চলে শতকরা আটত্রিশ ভাগ ভোটও পায়নি। তারা বলেন, ক্ষমতা লাভ করার জন্য আওয়ামী লীগই একমাত্র দল। রাতে ঢাকায় প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ বিবৃতির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ব্যাখ্যা করে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এ আহ্বানে জনগণের নিরঙ্কুশ সাড়া পাওয়া গেছে। জাপান আর ব্রিটিশ সরকার তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নিতে থাকে। প্রতিদিন শত শত অবাঙালি পশ্চিম পাকিস্তান যাচ্ছিলো। কিন্তু বাঙালিদের প্লেনের টিকেট দেওয়া হচ্ছিলো না। বিশেষ করে বাঙালি ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে পড়েছিল। এরা এদের স্ত্রী ছেলে-মেয়েদের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে শুরু করেছিলো। মার্চে নিজেরা যাওয়ার চেষ্টা করছিলো।
১৯৭১ সালের মার্চে সারা দেশে চলছিল টানা অসহযোগ আন্দোলন। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা কোনোভাবেই ঠেকাতে পারেনি কূটকৌশল নিয়ে করাচি থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকায় এসেও। বাঙালীর দাবিতে সারা দেশ ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠছিল। বিভিন্ন শহরে সভা, সমাবেশ, মিছিল, মিটিং চলতে থাকে। এদিন নেত্রকোনায় সুইপার ও ঝাড়ুদাররা ঝাড়ু, দা, লাঠি ও কোদাল নিয়ে মিছিল করে। খুলনা, কুষ্টিয়া, রংপুর, বগুড়া, লাকসাম ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে স্বাধীনতার পক্ষে মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।##

Tag :
লেখক তথ্য সম্পর্কে

Dainik adhumati

জনপ্রিয়

যশোরে জমি-জায়গা বিরোধের জের: ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা

‘অগ্নিঝরা মার্চ’র ১৫তম দিন :

ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগ

প্রকাশিত সময় : ০৯:৫৯:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ মার্চ ২০২৩

###    ১৯৭১সালের ‘অগ্নিঝরা মার্চ’র ১৫তম দিন আজ। অগ্নিঝরা মার্চ বাঙালির যৌক্তিক স্বপ্নপুুরণের স্বাধীনতার মাস। বাংলাদেশের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্দু শেখ মুজিবুর রহমালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ’র মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির কয়েক হাজার বছরের সামাজিক-রাজনৈতিক স্বপ্ন পূরণের যাত্রা শুরু। স্বাধীনতা সংগ্রামে ১৯৭১ সালের এই মার্চেই রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে, একাত্তরের মার্চ মাসের দিনগুলো ছিল থমথমে, উৎকণ্ঠা, শঙ্কায় পরিপূর্ণ। চাপা উদ্বেগ, অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি। অবরুদ্ধ গণমানুষ ইতোমধ্যে প্রস্তুত চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য। লক্ষ্য একটাই, নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা। স্বাধীনতাকামী বাঙালির ঐক্য সুদৃঢ় হচ্ছিল প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের ‘স্বাধীনতা’র দুর্বার আকাঙ্খার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। বাংগালীর ইতিহাসের ৭১’র আজকের দিনে পূর্ব বাংলার পেক্ষাপট পাল্টে যায় বঙ্গবন্ধুর সশস্ত্র সংগ্রাম ও স্বাধীনতার ডাকে। ৭১’র অগ্নিঝরা মার্চের ১৫তম দিনের ঘটনা প্রবাহে সেনাবাহিনী ছাড়া সবকিছু বঙ্গবন্ধুর নিয়ন্ত্রণে। কঠোর গোপনীয়তা ইয়াহিয়ার ঢাকা আসেন। সফরসূচিতে ছিল না সাংবাদ সম্মেলনের ব্যবস্থা। দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু নতুন নির্দেশ ঘোষণা করেন এদিনে। ভুট্টোর দুই পার্টির সমস্যা সমাধানকে অগণতান্ত্রিক বলে উল্লেখ করেন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ। চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে সকল কাজে বাংলা প্রচলনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করে স্থানীয় শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীদের এক সভায় ‘বেতার কেন্দ্রে সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করে।
৭১’র ১৫ মার্চের এই দিনে সারা বাংলার অফিস-আদালতে পূর্ণ কর্মবিরতি চলে। রাজধানী ঢাকায় দিনব্যাপী সভা ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি ও বেসরকারি ভবনের শীর্ষে এবং যানবাহনে কালো পতাকা ওড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। আন্দোলন অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয় মুক্তিকামী বাঙালির কাছে। প্রতিপক্ষের আঘাতের জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুত সবাই। একাত্তরের এদিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করতে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান কড়া নিরাপত্তার মধ্যে করাচি থেকে ঢাকায় আসেন। বিমানবন্দরে সামরিক গর্ভানর লে. জেনারেল টিক্কা খান তাকে স্বাগত জানান। তবে কোনো সাংবাদিক ও বাঙালিকে এ সময় বিমানবন্দরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রামের একটি মিছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অবস্থানের পর বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাদা রঙের গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করতে যান। ১৬ মার্চ শুরু হবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব-ইয়াহিয়া খানের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক। স্বাধীনতার দাবিতে অটল থেকেই তিনি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনায় বসার ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ। এ প্রসঙ্গে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর গ্রন্থ ‘একাত্তরের দিনগুলো’তে লিখেছেন, ‘… সিঁড়ির মুখ থেকে জামি চেঁচিয়ে ডাকল, মা, ভাইয়া, শীঘ্রই এসো, খবর শুরু হয়ে গেছে। টিভিতে শেখ মুজিবকে দেখাচ্ছে। হুড়মুড়িয়ে উঠে নিচে ছুটলাম। খবর খানিকটা হয়ে গেছে। শেখ মুজিবের গাড়িতে পতপত করে উড়ছে কালো পতাকা। দেখে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। প্রতিবাদের কালো পতাকা উঁচিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় গিয়েছেন শেখ মুজিব। এর আগে কোনদিনও পাকিস্তান সরকার বাঙালীর প্রতিবাদের এই কালো পতাকা স্বীকার করে নেয়নি। এবার সেটাও সম্ভব হয়েছে।’
এদিন কবি সুফিয়া কামালের সভাপতিত্বে তোপখানা রোডে মহিলাদের এক সভা হয়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বেতার ও টিভি শিল্পীরা দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্যরা ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে গণসঙ্গীত, পথনাটক পরিবেশন করেন। এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দু’জন ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তাৎক্ষণিক পদত্যাগ করেন। এটিই ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন একমাত্র পদত্যাগ। এদিনে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের বাড়ি অভিমুখে সারাদিন শ্লোগানমুখর বিক্ষুব্ধ মিছিলের পর মিছিল আসা অব্যাহত থাকে। ঐতিহাসিক ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধুর ৩২নং রোডের বাড়িটি রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়। ঢাকার বিভিন্ন জায়গার চেকপোষ্ট বসিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের নজরদারি বন্ধের দাবি জানান বঙ্গবন্ধু। এরফলে বাঙালীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার সব চেষ্টাও ব্যর্থ হয় ইয়াহিয়া খানের সরকারের। সারা বাংলা উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ১৫ মার্চ বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে ছাত্র সমাবেশে সামরিক বাহিনীর নয়া আইন জারির প্রতিবাদে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ‘বাংলাদেশ আজ স্বাধীন’ বলে ঘোষণা দেন। সভায় ছাত্র নেতারা অবিলম্বে বাংলাদেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানান। এদিন ছাত্রদের সাথে একাত্বতা ঘোষনা করে আ স ম আব্দুর রব বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশেই সবকিছু চলবে। পাকিস্তান সরকারের সামরিক ফরমান আমরা আর মেনে চলবো না। দেশবাসীকে তাদের অধিকার বঞ্চিত করার প্রতিবাদস্বরূপ শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা তাদের খেতাব বর্জন অব্যাহত রাখেন। চারদিকে শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। শিল্পাচার্য জয়নুলের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন ও অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী তাদের রাষ্ট্রীয় খেতাব বর্জন করেন। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে খেতাব বর্জনের বিষয়টি ব্যাপক সাড়া ফেলে। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্যরা ভ্রাম্যমাণ ট্রাক নিয়ে গণসঙ্গীত ও পথনাটক পরিবেশন করেন এবং দেশরক্ষা বিভাগের বেসামরিক কর্মচারীরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশ উপেক্ষা করে কর্মবিরতি পালন করেন।
৭১’র আজকের দিনে খুলনার হাদিস পার্কের জনসভায় বাংলা জাতীয় লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান বলেন, বাংলার প্রতিটি মানুষ আজ বঙ্গবন্ধুর পেছনে একতাবদ্ধ। তিনি আরো বলেন, রেডিও, টিভি, ইপিআর, পুলিশ বাহিনী, সেক্রেটারিয়েট প্রভৃতি আজ আওয়ামী লীগ প্রধানের আজ্ঞাবাহী। পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো করাচিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে নতুন দাবি উত্থাপন করে বলেন, কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও পিপলস পার্টির সমন্বয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে হবে। করাচিতে এক জনসভায় কয়েকজন প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা বলেন, ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অনেক কথাই বলেছেন। কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন তার পিপলস পার্টি এ অঞ্চলে শতকরা আটত্রিশ ভাগ ভোটও পায়নি। তারা বলেন, ক্ষমতা লাভ করার জন্য আওয়ামী লীগই একমাত্র দল। রাতে ঢাকায় প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ বিবৃতির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ব্যাখ্যা করে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এ আহ্বানে জনগণের নিরঙ্কুশ সাড়া পাওয়া গেছে। জাপান আর ব্রিটিশ সরকার তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নিতে থাকে। প্রতিদিন শত শত অবাঙালি পশ্চিম পাকিস্তান যাচ্ছিলো। কিন্তু বাঙালিদের প্লেনের টিকেট দেওয়া হচ্ছিলো না। বিশেষ করে বাঙালি ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে পড়েছিল। এরা এদের স্ত্রী ছেলে-মেয়েদের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে শুরু করেছিলো। মার্চে নিজেরা যাওয়ার চেষ্টা করছিলো।
১৯৭১ সালের মার্চে সারা দেশে চলছিল টানা অসহযোগ আন্দোলন। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা কোনোভাবেই ঠেকাতে পারেনি কূটকৌশল নিয়ে করাচি থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকায় এসেও। বাঙালীর দাবিতে সারা দেশ ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠছিল। বিভিন্ন শহরে সভা, সমাবেশ, মিছিল, মিটিং চলতে থাকে। এদিন নেত্রকোনায় সুইপার ও ঝাড়ুদাররা ঝাড়ু, দা, লাঠি ও কোদাল নিয়ে মিছিল করে। খুলনা, কুষ্টিয়া, রংপুর, বগুড়া, লাকসাম ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে স্বাধীনতার পক্ষে মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।##