০৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
ত্রিদেশীয় সফরে অর্থনীতি কূটনীতি ও দ্বিপাক্ষীক সর্ম্পক উন্নিত

জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে সফর শেষে দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী

### জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ১৫ দিনের সফর শেষে আজ দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি নিয়মিত ফ্লাইট মঙ্গলবার সকাল ১০টা ১০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান জাহিদ তুষার সমকালকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। লন্ডনের স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ২৫ মিনিটে দেশের উদ্দেশে হিথ্রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে ফ্লাইটটি। যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান।

গত ২৫ এপ্রিল স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ চার্টার্ড ভিভিআইপি ফ্লাইট (বিজি ১৪০৩) টোকিওর হানেদা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে জাপান বিমানবন্দরে একটি লালগালিচা সংবর্ধনা এবং রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদান করে। জাপান সফরে তিনি কৃষি, মেট্রো রেল, শিল্প আপগ্রেড, জাহাজ রিসাইক্লিং, শুল্ক বিষয়াদি, মেধা সম্পদ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, আইসিটি ও সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ে আটটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ২৬ এপ্রিল শেখ হাসিনা জাপানের সম্রাট নারুহিতোর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। একই দিনে তিনি চুক্তি স্বাক্ষরের পর ফুমিও কিশিদার সঙ্গে দ্বিপক্ষী বৈঠক করেন। ২৭ এপ্রিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য চার জাপানি নাগরিককে ‘ফ্রেন্ডস অফ লিবারেশন ওয়ার অনার’ হস্তান্তরের পাশাপাশি একটি বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলন এবং একটি কমিউনিটি সংবর্ধনায়ও যোগ দেন। তিনি জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োশিমাসা হায়াশির পাশাপাশি জাইকা, জেট্রো, জেইবিআইসি, জেবিপিএফএল ও জেবিসিসিইএল-এর নেতাদের সঙ্গে একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগ দেন। তিনি জাপানের প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের স্ত্রী আকি আবে এবং জাপানি স্থপতি তাদাও আন্দোর সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। জাপানের টোকিওতে চার দিনের সরকারি সফর শেষে ২৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী ওয়াশিংটন ডিসি পৌঁছেন। যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-বিশ্বব্যাংক অংশীদারিত্বের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান এবং কিছু পার্শ্ব ইভেন্টে যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সঙ্গেও একাধিক বৈঠক করেন। ৪ মে প্রধানমন্ত্রী ওয়াশিংটন ডিসি থেকে লন্ডনে যান। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে শেখ হাসিনা ৬ মে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানির অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। লন্ডনে শেখ হাসিনা রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে মতবিনিময় ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। তিনি সেখানে ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগেল ওয়াংচুক, রানি জেটসুন পেমার, মিশর ও রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট, সিয়েরা লিওন, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, গাম্বিয়া, নামিবিয়া ও উগান্ডার প্রধানমন্ত্রীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ৭ মে শেখ হাসিনার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়র এবং কমনওয়েলথ মহাসচিব ব্যারনেস প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড সাক্ষাৎ করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ত্রিদেশীয় সফরটি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে বর্তমানে স্মার্ট বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ২০২৬-৪১ সালের ভিশন উন্নত দেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় স্বপ্ন বাস্তবায়নে এ সফর অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। জাপান সফর সাহায্যনির্ভরতা থেকে কৌশলগত অংশীদারিত্বে সফর। এর ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিই গুরুত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ সফরে ৩০ বিলিয়ন ইয়েনের বাজেট সহায়তা ছাড়াও কৃষি, তথ্য-প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তাসহ আটটি চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে জাপান সরকারের সঙ্গে। এর মধ্যে কৃষি, শুল্ক, আইসিটি, গণপরিবহন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ। গণপরিবহনে মেট্রোরেল বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে দুটি দেশ ঐকমত্য হয়েছে। প্রযুক্তিগত বিশ্বে প্রযুক্তির উৎকর্ষসাধনের মধ্যেমে সামাজিক নিরাপত্তা, যোগাযোগ, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসায়-বাণিজ্যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে। আশার বিষয় হচ্ছে, দু’দেশের স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগে আরো সহায়তা ও উত্সাহিত করবে। জাপানের উদ্যোক্তা শিল্পপতি তথা বিনিয়োগকারীদের সম্মেলনে শেখ হাসিনা ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রসারে তার রাজনৈতিক কমিটমেন্টের কারণে জাপানিরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে অধিক উত্সাহী দেখিয়েছে। এরফলে খুব শিগিগর বাংলাদেশে আরো ১০০টি জাপানি কোম্পানি ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ১ লাখেরও বেশি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সার্বিক বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে প্রতিযোগিতামূলক খরচ, প্রচুর মানবসম্পদ, বিশাল দেশীয় ভোক্তা বাজার, এদেশে জাপানি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে এবং দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

জাপান সফর শেষে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাসের বিশেষ আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন অংশীদারির ৫০ বছর উদযাপনের অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। এ অনুষ্ঠানে ‘কানেক্টিভিটি প্রকল্প, ‘সবুজ, সহিষ্ণু অন্তর্ভুক্তি উন্নয়ন’প্রকল্প, জলবায়ু সহিষ্ণু প্রকল্প, অভিযোজন ও ঝুঁকি নিরসনের অবকাঠামো প্রকল্প, পরিবেশ টেকসই ও রূপান্তর প্রকল্প এবং পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের একটি প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষর করে বিশ্বব্যাংক। এ পাঁচটি প্রকল্পে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশকে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এছাড়াও ৫০০ মিলিয়ন ডলারের আরও একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পাইপলাইনে রয়েছে। ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্র্নির্মাণের জন্য পাঁচ কোটি ডলার সহযোগিতার মাধ্যমে যে গল্পের শুরু তার আকার বেড়ে বাংলাদেশকে দেওয়া বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তার অঙ্গীকার এ বছর ৩০০ কোটি ডলারেরও বেশি। কারিগরি, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আর্থিক সহযোগিতার অধীনে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবেই বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা পেয়ে আসছে। কিন্তু পদ্মাসেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন কিছু দুস্কৃতিকারীদের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের কারণে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের মাঝে কিছুটা দৃরত্ব সৃষ্ঠি হয়। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এদেশের অর্থনীতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নে জলবায়ুবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়ন সহায়তার উদ্যোগ নেয়ার অঙ্গীকারের করেছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংক মনে করে পৃথিবীর অনেক দেশই দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্ভাবনী ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে পারে। বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তিনি বলেন, সকল বাধাবিপত্তি মোকাবিলা করে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো নেতৃত্ব প্রয়োজন। বাংলাদেশ বিশ্বে একটি রোল মডেল। শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে দেশটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভূতপূর্ণ উন্নয়ন অর্জন করেছে। হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব কোভিড-১৯-এর পরও বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল রেখেছে। ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সুসংযোগ স্থাপন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেভাবে তার সাফল্য দেখিয়েছে তাতে দেশটি জাপানি বিনিয়োগের একটি আকর্ষণীয় কেন্দ্রে পরিণত হতে যাচ্ছে। জাপানি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো, বিশেষ করে মাতারবাড়িকেন্দ্রিক গভীর সমুদ্রবন্দরসহ যে সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়নের গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও উন্নত হবে। সেই সঙ্গে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কেরও উন্নতি ঘটবে। এই শিল্প ও অবকাঠামো হাব শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ আশপাশের দেশগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। জাপান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মনে করেন যে এসব শিল্পাঞ্চলে জাপানি আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নয়ন অভিজ্ঞতার ছোঁয়া লেগে দুই দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে ও সমৃদ্ধি অর্জনে বড় মাপের প্রভাব ফেলবে। প্রদান-প্রাপ্তির ও হিসাব-নিকাশ ছাপিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সফর বাংলাদেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে বলে বিশিষ্টজনদের প্রত্যাশা।##

Tag :
লেখক তথ্য সম্পর্কে

Dainik adhumati

জনপ্রিয়

গলাচিপায় অবৈধ দোকান উচ্ছেদের মাধ্যমে রাস্তা উন্মুক্ত করায় প্রসংশিত মেয়র

ত্রিদেশীয় সফরে অর্থনীতি কূটনীতি ও দ্বিপাক্ষীক সর্ম্পক উন্নিত

জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে সফর শেষে দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত সময় : ০৪:২৬:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ মে ২০২৩

### জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ১৫ দিনের সফর শেষে আজ দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি নিয়মিত ফ্লাইট মঙ্গলবার সকাল ১০টা ১০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান জাহিদ তুষার সমকালকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। লন্ডনের স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ২৫ মিনিটে দেশের উদ্দেশে হিথ্রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে ফ্লাইটটি। যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান।

গত ২৫ এপ্রিল স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ চার্টার্ড ভিভিআইপি ফ্লাইট (বিজি ১৪০৩) টোকিওর হানেদা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে জাপান বিমানবন্দরে একটি লালগালিচা সংবর্ধনা এবং রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদান করে। জাপান সফরে তিনি কৃষি, মেট্রো রেল, শিল্প আপগ্রেড, জাহাজ রিসাইক্লিং, শুল্ক বিষয়াদি, মেধা সম্পদ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, আইসিটি ও সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ে আটটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ২৬ এপ্রিল শেখ হাসিনা জাপানের সম্রাট নারুহিতোর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। একই দিনে তিনি চুক্তি স্বাক্ষরের পর ফুমিও কিশিদার সঙ্গে দ্বিপক্ষী বৈঠক করেন। ২৭ এপ্রিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য চার জাপানি নাগরিককে ‘ফ্রেন্ডস অফ লিবারেশন ওয়ার অনার’ হস্তান্তরের পাশাপাশি একটি বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলন এবং একটি কমিউনিটি সংবর্ধনায়ও যোগ দেন। তিনি জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োশিমাসা হায়াশির পাশাপাশি জাইকা, জেট্রো, জেইবিআইসি, জেবিপিএফএল ও জেবিসিসিইএল-এর নেতাদের সঙ্গে একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগ দেন। তিনি জাপানের প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের স্ত্রী আকি আবে এবং জাপানি স্থপতি তাদাও আন্দোর সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। জাপানের টোকিওতে চার দিনের সরকারি সফর শেষে ২৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী ওয়াশিংটন ডিসি পৌঁছেন। যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-বিশ্বব্যাংক অংশীদারিত্বের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান এবং কিছু পার্শ্ব ইভেন্টে যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সঙ্গেও একাধিক বৈঠক করেন। ৪ মে প্রধানমন্ত্রী ওয়াশিংটন ডিসি থেকে লন্ডনে যান। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে শেখ হাসিনা ৬ মে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানির অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। লন্ডনে শেখ হাসিনা রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে মতবিনিময় ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। তিনি সেখানে ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগেল ওয়াংচুক, রানি জেটসুন পেমার, মিশর ও রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট, সিয়েরা লিওন, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, গাম্বিয়া, নামিবিয়া ও উগান্ডার প্রধানমন্ত্রীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ৭ মে শেখ হাসিনার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়র এবং কমনওয়েলথ মহাসচিব ব্যারনেস প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড সাক্ষাৎ করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ত্রিদেশীয় সফরটি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে বর্তমানে স্মার্ট বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ২০২৬-৪১ সালের ভিশন উন্নত দেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় স্বপ্ন বাস্তবায়নে এ সফর অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। জাপান সফর সাহায্যনির্ভরতা থেকে কৌশলগত অংশীদারিত্বে সফর। এর ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিই গুরুত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ সফরে ৩০ বিলিয়ন ইয়েনের বাজেট সহায়তা ছাড়াও কৃষি, তথ্য-প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তাসহ আটটি চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে জাপান সরকারের সঙ্গে। এর মধ্যে কৃষি, শুল্ক, আইসিটি, গণপরিবহন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ। গণপরিবহনে মেট্রোরেল বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে দুটি দেশ ঐকমত্য হয়েছে। প্রযুক্তিগত বিশ্বে প্রযুক্তির উৎকর্ষসাধনের মধ্যেমে সামাজিক নিরাপত্তা, যোগাযোগ, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসায়-বাণিজ্যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে। আশার বিষয় হচ্ছে, দু’দেশের স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগে আরো সহায়তা ও উত্সাহিত করবে। জাপানের উদ্যোক্তা শিল্পপতি তথা বিনিয়োগকারীদের সম্মেলনে শেখ হাসিনা ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রসারে তার রাজনৈতিক কমিটমেন্টের কারণে জাপানিরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে অধিক উত্সাহী দেখিয়েছে। এরফলে খুব শিগিগর বাংলাদেশে আরো ১০০টি জাপানি কোম্পানি ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ১ লাখেরও বেশি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সার্বিক বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে প্রতিযোগিতামূলক খরচ, প্রচুর মানবসম্পদ, বিশাল দেশীয় ভোক্তা বাজার, এদেশে জাপানি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে এবং দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

জাপান সফর শেষে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাসের বিশেষ আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন অংশীদারির ৫০ বছর উদযাপনের অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। এ অনুষ্ঠানে ‘কানেক্টিভিটি প্রকল্প, ‘সবুজ, সহিষ্ণু অন্তর্ভুক্তি উন্নয়ন’প্রকল্প, জলবায়ু সহিষ্ণু প্রকল্প, অভিযোজন ও ঝুঁকি নিরসনের অবকাঠামো প্রকল্প, পরিবেশ টেকসই ও রূপান্তর প্রকল্প এবং পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের একটি প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষর করে বিশ্বব্যাংক। এ পাঁচটি প্রকল্পে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশকে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এছাড়াও ৫০০ মিলিয়ন ডলারের আরও একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পাইপলাইনে রয়েছে। ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্র্নির্মাণের জন্য পাঁচ কোটি ডলার সহযোগিতার মাধ্যমে যে গল্পের শুরু তার আকার বেড়ে বাংলাদেশকে দেওয়া বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তার অঙ্গীকার এ বছর ৩০০ কোটি ডলারেরও বেশি। কারিগরি, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আর্থিক সহযোগিতার অধীনে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবেই বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা পেয়ে আসছে। কিন্তু পদ্মাসেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন কিছু দুস্কৃতিকারীদের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের কারণে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের মাঝে কিছুটা দৃরত্ব সৃষ্ঠি হয়। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এদেশের অর্থনীতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নে জলবায়ুবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়ন সহায়তার উদ্যোগ নেয়ার অঙ্গীকারের করেছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংক মনে করে পৃথিবীর অনেক দেশই দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্ভাবনী ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে পারে। বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তিনি বলেন, সকল বাধাবিপত্তি মোকাবিলা করে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো নেতৃত্ব প্রয়োজন। বাংলাদেশ বিশ্বে একটি রোল মডেল। শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে দেশটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভূতপূর্ণ উন্নয়ন অর্জন করেছে। হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব কোভিড-১৯-এর পরও বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল রেখেছে। ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সুসংযোগ স্থাপন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেভাবে তার সাফল্য দেখিয়েছে তাতে দেশটি জাপানি বিনিয়োগের একটি আকর্ষণীয় কেন্দ্রে পরিণত হতে যাচ্ছে। জাপানি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো, বিশেষ করে মাতারবাড়িকেন্দ্রিক গভীর সমুদ্রবন্দরসহ যে সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়নের গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও উন্নত হবে। সেই সঙ্গে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কেরও উন্নতি ঘটবে। এই শিল্প ও অবকাঠামো হাব শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ আশপাশের দেশগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। জাপান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মনে করেন যে এসব শিল্পাঞ্চলে জাপানি আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নয়ন অভিজ্ঞতার ছোঁয়া লেগে দুই দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে ও সমৃদ্ধি অর্জনে বড় মাপের প্রভাব ফেলবে। প্রদান-প্রাপ্তির ও হিসাব-নিকাশ ছাপিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সফর বাংলাদেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে বলে বিশিষ্টজনদের প্রত্যাশা।##