১০:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এক বছর :

সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগতে পারেনি খুলনাঞ্চল : যোগাযোগ-কানেকটিভিটির অভূতপূর্ব উন্নয়ন, পিছিয়েছে বিনিয়োগে

####

স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এক বছর পূর্তি হচ্ছে ২৫জুন-২০২৩। এ সেতুর উদ্বোধনের ফলে বিপুল সম্ভাবনা ও সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে খুলনাঞ্চলের মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছিল আকাশচুম্বি প্রত্যাশা। সরকারী ও বেসরকারী ‍উদ্যোগে গড়ে উঠবে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা, আইসিটি ও তথ্যপ্রযুক্তিগত স্থাপনা, স্বাস্থ্য-শিক্ষায়তন, পর্যটন কেন্দ্র ও কৃষি-মৎস্যসহ বিভিন্ন খাতে উন্নত ও আধুনিক পরিকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা। বাড়বে ব্যবসা-বনিজ্য, রপ্তানী ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং কর্মসংস্থান। কিন্তু গত এক বছরেও খুলনাঞ্চলে আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন হয়নি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান কেন্দ্র খুলনাকে ঘিরে মানুষের আশা-আকাংখার সাথে বাস্তবতায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও সার্বিক বিচারে হতাশায় রয়েছে এ অঞ্চলের মানুষ।পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ও কানেকটিভিটির বৈপ্লবিক উন্নয়ন ঘটেছে।যা চোখে পড়ার মতো। অন্যখাতগুলোতে সেভাবে উন্নয়ন ও উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। তবে মোংলা কেন্দ্রীক অনেকগুলো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। নাগরিক নেতা ও চেম্বারের নেতাদের দাবী শিল্প কারখানার পরিবেশ তৈরী ও জ্বালানি হিসেবে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় সবদিক দিয়েই পিছিয়ে পড়ছে খুলনাঞ্চল। তাই দ্রুত সরকারী উদ্যোগেই গ্যাস সরবরাহ ও অর্থনৈতিক জোনসহ অবকাঠামোগত সুবিধা গড়ে তোলার দাবীও তাদের। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এক বছর পূর্তিতে খুলনাঞ্চলের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সম্ভাবনার বিষয় বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

২০২২ সালের ২৫জুন দেশের সর্বাধুনিক পদ্মা সেতু উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বপ্নের এ সেতুর উদ্বোধনের পর দেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বেশী উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন ঘটেছে সড়ক যোগাযোগ ও কানেকটিভি ব্যবস্থার। এ অঞ্চলের সড়কের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। যে উন্নয়ন কর্মকান্ড এখনও চলমান রয়েছে। খুলনা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো:আনিসুজ্জামান মাসুদ বলেন, খুলনাঞ্চলের সড়কের উন্নয়নে বেশকিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং চলমান রয়েছে। এরমধ্যে নগরীর ময়রাপোতা-জিরোপয়েন্ট চারলেন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। ১০০কোটি টাকার এ প্রকল্প নগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও যানজট নিরসনে বিশেষ ভুমিকা রাখবে। এছাড়া খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কের বেতগ্রাম-তালা-পাইকগাছা-কয়রা সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার একটু বেশী দেখা যাচ্ছে। এ প্রকল্প-এর ৬৫কিমি রাস্তার মেরামত ও উন্নয়ন এবং কয়রার অতিরিক্ত ৩৩৯কোটি টাকা ব্যয়ে আরও ৩১কিমি রাস্তার কাজের প্রায় ৭০শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। এদিকে, ১৭কোটি টাকা ব্যয়ে ভৈরব সেতু নির্মান প্রকল্প কাজ ৩০শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এ প্রকল্পের ভুমি অধিগ্রহনসহ অনেকটাই কাজ অগ্রগতি হয়েছে। খুলনা মহানগরীর প্রবেশ দ্বার জিরো পয়েন্টে ৩০কোটি টাকা ব্যয়ে বিউটিফিকেশনসহ উন্নয়ন ও সৌন্দর্য বর্ধন কাজের ৫০শতাংশ কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে।

তিনি বলেন, খুলনাঞ্চলের সড়কের উন্নয়নে আরও কিছু পরিকল্পনা এখন পাইপ লাইনে রয়েছে। খুলনার সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে ভবিষ্যত পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে-খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারী বিএল কলেজের সামনে ৭কোটি টাকা ব্যয়ে ফুট ওভার ব্রিজ নির্মান প্রকল্প, ২৫কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর ফেরীঘাট মোড় থেকে পূর্ব রূপসা ফেরীঘাট পর্যন্ত খানজাহান আলী সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। এ প্রকল্পের কাজ ৯০শতাংশ শেষ হয়েছে। গল্লামালী পুরাতন ব্রিজের স্থলে রাজধানীর হাতির ঝিলের অনুরূপ দৃষ্টিনন্দন চার লেনেরে আর্চ ব্রিজ প্রকল্প, ৭০কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। খুলনা-চুকনগর-সাতক্ষীরা সড়কের দূর্ঘটনা রোধে গুটুদিয়া-বানিয়ালকালী-কাঠালতলা বাক সরলীকরন প্রকল্প ও দাকোপের চুনকুড়ি নদীতে ৭৪৭কোটি টাকা ব্যয়ে চুনকুড়ি ব্রিজ প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের পর প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং ইওআই আহবান করা হয়েছে। ভবিষ্যত পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে-খুলনা সিটি বাইপাস দিয়ে খুলনা-যশোর ০৬লেন প্রকল্প। এ প্রকল্পের ডিপিপি সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া খুলনা নগরীর মধ্যে ফুলতলার আফিল গেট থেকে ডাকবাংলা মোড় পর্যন্ত ফোরলেন প্রকল্প, গল্লামারী-বটিয়াঘাটা-নলিয়ান পর্যন্ত ৫৮কিমি সড়ক প্রকল্প, দাকোপের ঝপঝপিয়া নদীতে পানখালী ব্রিজ নির্মানের জন্য প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।একই সাথে রাজধানীর সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি ও সড়ক পথে দুরত্ব কমিয়ে আনতে ফুলতলা-শিকিরহাট-নড়াইল সড়ক উন্নয়ণ ও ফেরীঘাট নির্মান প্রকল্প এবং খুলনা মহানগরীর ভৈরব নদীর জেলখানা ঘাট পয়েন্টে ব্রিজ বা টানেল নির্মান প্রকল্প। এ সব প্রকল্পের ফিজিবিলিটি ষ্ট্যাডি চলছে। অচিরেই যোগাযোগ ব্যবস্তার উন্নয়নে এসব প্রকল্প মাঠ পর্যায় বাস্তবায়ন শুরু হবে বলেও তিনি জানান। এছাড়াও নগরীর আরেক প্রবেশ দ্বার রূপসা খানজাহান আলী ব্রীজ থেকে লবনচরা হয়ে রূপসা ফেরীঘাট পর্যন্ত সড়কের চারলেন প্রকল্প, নগরীর নিরালা থেকে বাইপাস সড়ক পর্যন্ত লিংক রোড, খুলনা বিশ্ববিধ্যালয় থেকে রায়েরমহল এবং মুজগুন্নী শেখ আবু নাসের হাসপাতাল থেকে বাইপাস পর্যন্ত থ্রি-লিংক রোড প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।

কৃষি খাতে উন্নয়ণ :

পদ্মার উদ্বোধনের পর খুলনাঞ্চলে উন্নয়নের আরেকটি বড় খাত কৃষি। কৃষির আধুনিকায় ও উন্নয়নের ফলে খুলনাঞ্চল এখন স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ এলাকা। এক সময়ের খাদ্যে ঘাটতির এলাকা থেকে খুলনা এখন খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলাতে পরিনত হয়েছে। খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলার ৯টি উপজেলায় কৃষির আধুনিকায়ন ও উন্নয়নে ১২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যার মাধ্যমে খুলনাঞ্চলের কৃষির যেমন উন্নয়ণ ঘটছে। তেমনি আধুনিকতার ধারায় বদলে যাচ্ছে চিরায়ত কৃষির ভাবনাও। এসব প্রকল্পের মধ্যে ডুমুরিয়া উপজেলায় কন্দাল ফসল উন্নয়ণ প্রকল্প, জেলার ৯টি উপজেলায় বাস্তবয়ন হচ্ছে রাজস্ব নামে আরেকটি প্রকল্প। রূপসা, ফুলতলা, বটিয়াঘাটা ও তেরখাদা উপজেলায় কৃর্ষি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কৃষক প্রশিক্ষণ প্রকল্প, ৯ উপজেলায় আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে ধান, পাট, গম ও বীজ উৎপাদন , সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্প, গোপালগঞ্জ-খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা ও পিরোজপুর কৃর্ষি উন্নয়ন প্রকল্প, ডুমুরিয়া ও তেরখাদায় জলাবদ্ধ এলাকায় ভাসমান বেডে সজ্বি ও মশলা চাষ গবেষনা, সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়করন প্রকল্প, তেল জাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প, পরিবেশ বান্ধব কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদন প্রকল্প বা আইপিএম, ক্লাইমেট-স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে খুলনার কৃর্ষি অঞ্চলের জলবায়ু পরির্তন অভিযোজন প্রকল্প, খামার যান্ত্রিকরনের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প, সৌরশক্তি ও পানি সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির পাইলট প্রকল্প ও অনাবাদি পতিত জমিতে ও বসত বাড়ীর সীমনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃর্ষির উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া চলতি বছরে আরও বড় আকারের পার্টনার নামে আরেকটি প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। খুলনা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপপরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সরকারীভাবে খুলনায় কৃষির উন্নয়নে যেসব প্রকল্প শুরু হয়েছে তা অভাবনীয়। এসব প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। আমরা আশা করছি খুলনার চিংড়ী, তরমুজ, তিল, চুইঝাল, নারিকেলসহ অনেক প্রচলিত ও অপ্রচলিত কৃষিপন্য এখন বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে। যা আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে এবং সফলতাও আসছে।

মৎস্য শিল্প খাত :

পদ্মা সেতুর সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে বেশী লাভবান ও উন্নয়ণ হয়েছে খুলনার মৎস সেক্টরে। খুলনাঞ্চল দেশের একমাত্র চিংড়ী উৎপাদন ও রপ্তানী এলাকা। যেখান থেকে দেশের চিংড়ী রপ্তানীর ৮০শতাংশ হয়ে থাকে। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হওয়ায় খুলনাঞ্চলের মাছ চাষ ও বাজারজাত করনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। এ অঞ্চলের দুই লক্ষাধিক মৎস্য চাষী, মাছ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ঠ ১০লক্ষাধিক মানুষ বেশী উপকৃত হচ্ছেন। খুলনা থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের দুরুত্ব যেমন কমেছে। তেমনি হ্রাস পেয়েছে পরিবহন ও যাতায়াত খরচ এবং কর্মঘন্টাও। ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে বিপনন ও মৎস্য চাষীদের আয়ের পথ।

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল বলেন, খুলনাঞ্চল বরাবরই মৎস্য চাষের জন্য সমৃদ্ধ এলাকা। এ অঞ্চলে দুই লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে চিংড়ী চাষ হয়ে থাকে। যা দেশের চিংড়ী রপ্তানীর ৮০ভাগ। এছাড়াও রুই-কাতলা-মৃগেলসহ সাদা মাছের জন্যও ব্যিখাত। এ মাছ ‍উপাদনকে ঘিরে খুলনা-বাগেরহাট ও যশোরে ৭০টি মাছ প্রক্রিয়াকরন কারখানা গড়ে ‍উঠেছে। পদ্মা ব্রিজ উদ্বোধন হওয়ায় খুলনাঞ্চলের মৎস্য চাষী , মাছ ব্যবসায়ী ও রপ্তানীকারকরা খুবই সহজেই ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের উৎপাদিত মাছ পরিবহন ও বিপনন করতে পারছে। এখন খুলনা থেকে মাত্র সাড়ে তিন ঘন্টায় রাজধানীতে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। একই সাথে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে মাত্র ৭-৮ঘন্টার মধ্যে পৌছাতে পারছে। সেজন্য এ অঞ্চলের মাছের চাহিদা যেমন বেড়েছে। তেমনি মাছ চাষী ও ব্যবসায়ীরাও তাদের উৎপাদিত মাছের দামও ভালো পাচ্ছেন। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের চিংড়ী প্রক্রিয়াকরন ফ্যাক্টরীগুলো সম্পূর্ণভাবে খুলনাঞ্চলের চিংড়ীর উপর নির্ভরশীল। আগে যেখানে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে চিংড়ী পাঠাতে দেড় থেকে ‍দুই দিন লাগতো এখন সেখানে সকালে গিয়ে রাতেই ব্যবসায়ীরা ফিরে আসতে পারছে। এতে পরিবহন খরচ, বিপনন খরচ এবং ব্যবসায়ীদের কর্মঘন্টাও কমেছে। অন্যদিকে, খুলনাঞ্চলের চিংড়ী ঘেরগুলো চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের হ্যাচারীর উপর নির্ভরশীল থাকায় চিংড়ীর রেনুপোনা পরিবহন কাজ অনেক সহজ ও খরচও কমে গেছে।একই সাথে রেনুপোনার মর্টালিটির হারও অনেকাংশে কমেছে। এজন্য চিংড়ী চাষীরা যেমন লাভবান হচ্ছেন। তেমনি মৎস্য প্রক্রিয়াকরন কারখানাগুলোও ঘুরে দাড়ানোর স্বপ্ন দেখছে।বর্তমানের চিংড়ী রপ্তানী খাতে সাড়ে ৫হাজার ডলার রপ্তানীর মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। ফলে সার্বিকভাবে দেশের রপ্তানী আয়ও বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনীতিতেও ভুমিকা রাখছে। মৎস্য সেক্টরের এ প্রবৃদ্ধি দিন দিন আরও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

এছাড়া খুলনাসহ উপকুলীয় এলাকার মৎস্য সম্পদ উন্নয়নে সাসটেইনএ্যাবল কোষ্টাল এন্ড মেরিন ফিসারিজ প্রকল্প বাস্তাবায়িত হচ্ছে।এ প্রকল্পের আওতায় সামুদ্রিক একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলে (EEZ) মৎস্য জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে চিংড়ি, তলদেশীয় এবং ভাসমান প্রজাতির মৎস্যের মজুদ নিরূপন কর্মসূচি জোরদারকরণ;  সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা সংস্থার সামর্থ্য বৃদ্ধিপূর্বক বিজ্ঞানভিত্তিক টেকসই মৎস্য মজুদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন; বাণিজ্যিক ও ক্ষুদ্রায়তন মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নে অধিকতর কার্যকর পরিবীক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারী (এমসিএস) পদ্ধতির বাস্তবায়ন; উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, সার্ভিস সেন্টার, মৎস্যবাজর উন্নয়নকরতঃ আহরিত ও উৎপাদিত মৎস্যের ভ্যালূ চেইন উৎকর্ষ ও গুণগতমান উন্নয়ন ও অপচয় হ্রাস করা;  উপকূলীয় জেলা সমূহে ক্লাস্টার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সম্প্রসারণ ঘটিয়ে বাগদা চিংড়ির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও চিংড়ি রপ্তানী বৃদ্ধি করা;  দরিদ্র মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠি কর্তৃক চালিত তাঁদের নেতৃত্বে উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ-এর টেকসই সহ-ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা এবং বিকল্প জীবিকায়নে সহায়তা  করা;  উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ এর টেকসই আহরণ ব্যবস্থাপনায় ‘সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ প্রণয়ন করা; এবং  উপকূলীয় এবং সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংক্রান্ত বিভিন্ন ক্রসকাটিং ইস্যুর ওপর সমীক্ষা পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে খুলনাসহ উপকুলীয় এলাকার মৎস্য সম্পদ উন্নয়ন ও মৎস্য সেক্টর আরও বেশী আধুনিকায়ন হবে।

পর্যটন শিল্প খাত :

খুলনার পর্যটন শিল্প খাতও পিছিয়ে নেই। পদ্মার সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে খুলনাঞ্চলের পর্যটন শিল্প খাতও সমৃদ্ধ হচ্ছে। এ খাতে সরকারী ও বেসরকারী বিনিয়োগও বাড়ছে। বিশেষ করে বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন ও নয়নাভিরাম সাগর কেন্দ্রিক পর্যটনের সুবিধা বাড়ার সাথে সাথে দেশী-বিদেশী পর্যটকের আকর্ষনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পর্যটকদের চাহিদার বিবেচনায় সরকারীভাবে যেমন বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তেমনি বেসরকারী পর্যায়েও উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছে। ফলে খুলনাঞ্চলের পর্যটনের সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে উদ্যোগী হচ্ছেন সবাই। খুলনার বন সংরক্ষক মিহির ‍কুমার দো বলেন, বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনের দুই বিভাগ মিলে দেশী-বিদেশী ভ্রমন ও সৌন্দর্য্য পিপাসু পর্যটকদের আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু। সুন্দরবনের বাগেরহাট-খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলেই বেশী পর্যটকের আনোগোনা দেখা যায়। সুন্দরবন ‍সুরক্ষা করে পর্যটনকে উৎসাহ দিতে সরকারীভাবে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যার ফলে পর্যটকও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে আগে সুন্দরবনের হাড়বাড়িয়া, কচিখালী, কটকা, দুবরার চরসহ ট্যুরিজম স্পটগুলো কোর জোন বা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবস্থিত। সেকারনে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি না হয় বিবেচনায় নিয়ে পর্যটকদের জন্য অনেক বিধিনিষেধ ছিল। এবং ট্যুরিজম স্পটগুলো গভীরে থাকায়  ৩-৪দিন সময় লাগতো। একই সাথে অনেক সময় ব্যয় হওয়া এবং বিধিনিষেধের কারনে পর্যটকরা সুন্দবনে ভ্রমনে নিরুৎসাহিত হতেন। এ অবস্তার পরিবর্তনে সরকারীভাবে বাফার জোনে ৪টি নতুন ট্যুরিজম স্পট গড়ে তোলা হচ্ছে।এ ষ্পটগুলোর মধ্যে বাগেরহাটের শরনখোরার আলীবান্দা, মংলার আন্দারমানিক, খুলনার দাকোপের সুতরখালীর কালাবগী ও শেখেরটেক এলাকায়  গড়ে তোলা হচ্ছে। যা সহজ যোগযোগ ও কম গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্থাপন হওয়ায়  যে কোন দেশী-বিদেশী পর্যটকরা কোন বিধিনিষেধ ছাড়াই ভ্রমন করতে পারবেন। পর্যটকরা দিনে ভ্রমনে গিয়ে দিনেই ফিরতে পারবেন। ইতিমধ্যেই এ চারটি পর্যটন স্পট তৈরীর কাজ ৮০শতাংশ শেষ হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সবগুলোর কাজ শেষ হবে বলে তিনি আশা করেন। তিনি বলেন, সুন্দরবনের বাফার জোনে এ পর্যটন স্পটগুলো হওয়ায় সুন্দরবনের সুরক্ষায় ভুমিকা রাখবে। বিশেষ করে আগের পর্যটন স্পটগুলো কোর জোন বা সংরক্ষিত এলাকায় হওয়ায় বনের প্রানী, মৎস্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ হুমকির মুখে ছিল। যে কারনে সুন্দরবন সংরক্ষনে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতো। কিন্তু নির্মানাধীন চারটি পর্যটন স্পট বাফার জোন অর্থাৎ মানুষের চলাচলের এলাকায় অবস্থিত হওয়ায়  সুন্দরবন সুরক্ষা অনেক সহজ হবে। পর্যটকরাও স্বচ্ছন্দে ভ্রমনে যেতে পারবেন। এতে বাড়বে সরকারের রাজস্ব এবং নির্ভরশীল মানুষের কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে কয়েকগুন। ইতিমধ্যেই চারটি পর্যটন স্পটের মধ্যে সুতোরখালীর কালাবগী স্পট সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। বাকীগুলো ডিসেম্বরের পরে উন্মুক্ত করে দেয়া সম্ভব হবে বলেও তিনি আশা করেন।

তিনি আরও বলেন, খুলনাঞ্চলে বিশেষ করে সুন্দরবন কেন্দ্রীক পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি বেশকিছু বেসরকারী সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান পর্যটনে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে ‍উঠেছে। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএসএআইডি কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম উন্নয়নে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ সংস্তাটি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সুশীলন, রূপান্তরসহ কয়েকটি সংস্থাকে সাথে নিয়ে সুন্দরবন কেন্দ্রিক ইকো ট্যুরিজম প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ সংস্থা খুলনার দাকোপের বানীশান্তা এলাকা, কালাবগী, সুতোরখালী, পাইকগাছা ও কয়রার বিভিন্ন এলাকা এবং সাতক্ষীরার শ্যমনগর, কালীগঞ্জ ও বাগেরহাটের মোংলা-শরণখোলার অনেকগুলো এলাকায় এই কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় এলাকাবাসীর যেমন কর্মসংস্থান তৈরী হবে তেমনি সুন্দরবন সুরক্ষায়ও ভুমিকা রাখবে বলেও তিনি জানান।

আরও সরকারী উদ্যোগ :

পদ্মা সেতৃ উদ্বোধনের পর গত এক বছরে সরকারীভাবে খুলনায় বেশকিছু উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে। এ সকল প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহনসহ বাস্তবায়ন কাজ চলমান রয়েছে। আবার অনেকগুলো অবকাঠামোগত নির্মান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসকের রাজস্ব ও ভুমি শাখার তথ্য মতে, পদ্মা সেতু উদ্বোধন থেকে শুরু করে খুলনায় বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।এসব প্রকল্পের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বৃদ্ধি, উন্নয়ণ, স্বাস্থ্য, ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পরিরবেশ সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্নতা, খাদ্য সংরক্ষানাগার ও আইসিটির উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে। সরকারের এসব প্রকল্পের কোনটির জমি অধিগ্রহন শেষ হয়েছে। আবার কোনটির ভুমি অধিগ্রহনের কাজ চলছে। এরমধ্যে সড়ক বিভাগের খুলনা সিটি-দিঘলিয়া উপজেলার যোগাযোগ সহজ করতে ভৈরব নদীর উপর এক কিমি সেতু নির্মান প্রকল্পের জন্য ৪একর জমি অধিগ্রহন করা হয়েছে। কেসিসি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কেডিএ’র আওতায় তিনটি লিংক রোড নির্মান প্রকল্পের মধ্যে শেখ আবু নাসের হাসপাতাল থেকে আড়ংঘাটা পর্যন্ত লিংক রোড প্রকল্পের ১১.৮একর, খুলনা বিশ্ববিধ্যালয় থেকে রায়ের মহল পর্যন্ত লিংক রোড প্রকল্পের ১৩.৮৮একর এবং নিরালা আবাসিক এলাকা থেকে সিটি বাইপাস পর্যন্ত লিংক রোড প্রকল্পের ৭.০৩একর জমি অধিগ্রহন করা হয়েছে। এছাড়া কয়রা, পাইকগাছায় দুটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষনে স্মৃতি জাদুঘর নির্মান প্রকল্পের জন্য ১৯শতক জমি অধিগ্রহন সম্পন্ন হয়েছে। নগরীর বিল পাবলা এলাকায় ইন্ডাষ্ট্রিয়াল পুলিশের অফিস ভবন নির্মান প্রকল্পের জন্য ৫একর, খুলনা-কয়রা সড়কের বেতগ্রাম থেকে পাইকগাছা ভায়া কয়রা সড়কের বাঁক সরলীকরন প্রকল্পের জন্য ১৪একর, রূপসা উপজেলায় খাদ্যপন্য সংরক্ষনে গুদাম নির্মান প্রকল্পের জন্য ১.৮৩একর, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর সিটি নির্মানের জন্য কেসিসি এলাকায় বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কেসিসি এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন প্রকল্পের সেকেন্ডারী ডাম্পিং ষ্টেশনের জন্য বটিয়াঘাটার রাঁজবাধে ৩০একর, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের গ্যারেজ নির্মানে বটিয়াঘাটার খোলাবাড়িয়ায় ১০একর, কেসিসির ০৬টি এসটিএস নির্মানে মহেশ্বরপাশা, রায়েরমহল, দেয়ানা, টুটপাড়া, মীরেরডাঙ্গা ও ছোট বয়রা এলাকায় ৩০শতাংশ জমি এবং কেসিসির গ্যারেজ বর্ধিতকরন প্রকল্পের জন্য নগরীর পাওয়ার হাউজ মোড়ে ৪৭শতক জমি অধিগ্রহন করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাত :

খুলনাঞ্চলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে একই সাথে কয়েকটি প্রকল্পের কাজও এগিয়ে চলেছে। এরমধ্যে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মান প্রকল্পের জন্য ২০০একর জমি, খুলনা শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের জন্য এক হাজার একর ও খুলনা আধুনিক শিশু হাসপাতাল নির্মান প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহন কাজ চলমান রয়েছে। একই সময়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিসি ইউনিটের আধুনিকায়ন ও ক্যান্সার ইউনিট স্থাপন এবং শেখ আবু নাসের হাসপাতালের প্লাষ্টিক ও বার্ন ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া খুলনা জেনারেল হাসপাতালের ১০তলা নতুন ভবন, সিভিল সার্জনের নতুন অফিস ভবন, নূরনগরে ডায়াবেটিস হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মান করা হয়েছে। খুলনায় স্বাস্থ্যসেবা ‍বৃদ্ধির লক্ষ্যে সোনাডাঙ্গা এলাকায় র্সিং কলেজ নির্মানের কাজও এগিয়ে চলেছে।

খুলনার জেলা প্রশাসক খন্দকার ইয়াসির আরেফিন বলেন, পদ্মা সেতুর সুবিধা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে খুলনায় সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগে অনেকগুলো মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এসব প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহন ও ফিজিবিলিটি ষ্টাডিও হয়েছে। চলমান এ কাজ শেষ হলে খুলনার দ্যৃশমান উন্নয়নে বদলে যাবে সার্বিক পরিবেশ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প-কারখানা ও হোটেল-মোটেল এবং পর্যটন খাতেও অনেক উন্নয়ন কাজ হয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ শিল্পগুলোও চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে তথ্য প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে বন্ধকৃত দাদাম্যাচ ফ্যাক্টরীর অব্যবহৃত ৪১৫.২৪শতক জমিতে ১৬০কোটি টাকা ব্যয়ে হাইটেক পার্ক স্থাপনসহ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অন্যদিকে, দুটি অর্থনৈতিক জোনসহ আরও কয়েকটি প্রকল্প শুরু হতে যাচ্ছে। যেগুলো সম্পন্ন হলে খুলনা উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি একটি পর্যায়ে পৌছাবে বলেও তিনি জানান।

খুলনার বিনিয়োগের পরিমান কমেছে : 

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর গত এক বছরে খুলনাঞ্চলে বিনিয়োগের মাত্রা ও পরিমান কমেছে। বিভিন্ন সেক্টরে গত কয়েক বছরের তুলনায় বিনিয়োগ নিবন্ধন হ্রাস পেয়েছে। বিনিয়োগ নিবন্ধনের এ পরিস্থিতি খুলনাঞ্চলের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য হতাশাজনক। খুলনার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কতৃর্পক্ষের পরিচালক প্রনব ‍কুমার রায় বলেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগেই খুলনাঞ্চলে বেশকিছু বিনোয়গ সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি, শিল্প কারখানা, মৎস্য সংরক্ষন ও রপ্তানী, গ্যাস, সিমেন্ট কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে পদ্মা সেতুর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা খুলনাঞ্চলে বিনিয়োগে ঝুঁকছেন। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২১-২২ অর্থ বছরে বিনিয়োগের ৪৩টি নতুন প্রস্তাবনায় ৪হাজার ১৬১দশমিক ৮৪৯ মিলিয়ন এবং সংশোধনীর প্রস্তাবনায় অতিরিক্ত আরও ৫২টি প্রস্তাবনায় ৬হাজার ৩৩১দশমিক ৪৬১মিলিয়ন টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাবনা নিবন্ধিত হয়েছে। কিন্তু উদ্বোধনের পর গত এক বছরে ২০২২সালের জুলাই থেকে ২০২৩সালের ২০জুন পর্যন্ত মোট ১৬টি বিনিয়োগ প্রস্তাবনা রেজিষ্ট্রেশনভুক্ত হয়েছে। যা এর আগের বছরের তুলনায় কম। এসকল বিনিয়োগ প্রস্তাবনায় ২হাজার ৩৮৮ দশমিক ৮৩৩মিলিয়ন টাকার প্রস্তাব নিবন্ধন হয়েছে। এছাড়া আরও ৩১টি বিনিয়োগ প্রস্তাব সংশোধন করে নতুনভাবে অতিরিক্ত ৪হাজার ৮০৮ দশমিক ৩৪৮মিলিয়ন টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাবনা নিবন্ধ করা হয়েছে।এ বিনিয়োগের মাধ্যমে খুলনাঞ্চলে ৬হাজার ৩৫৩জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে বটিয়াঘাটায় বায়োএ্যাকোয়া ইন্ডাষ্ট্রিজ, দুবাই ম্যাক্স পাওয়ার কেমিক্যালস লিমিটেড, ডুমুরিয়ায় অটো ফ্লাওয়ার মিলস, খালিশপুরে সুতা তৈরীর সুমাইয়া পেট ফ্লেক্স রিসাইকেল লিমিটেড, চিংড়ী রপ্তানী খাতে রূপসায় বেঙ্গল প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং, সেনাডাঙ্গায় এনজিন মেটাল ইন্ডাষ্ট্রিজ, সাতক্ষীরা রংধনু শ্রিম্প প্যাকেজিং, রিপন এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড ও মালিহা জুট ইন্ডাষ্ট্রিজ, বাগেরহাটে লাফস গ্যাস লিমিটেড, দুবাই-বাংলা সিমেন্ট মিলস এবং খুলনায় ওয়েভ জুট মিলস লিমিটেড কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সর্বোচ্চ বেসরকারী বিনিয়োগের হোটেল :

পদ্মা সেতুর সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সরকারী প্রতিষ্টানের পাশাপাশি খুলনায় প্রাইভেট সেক্টরে বেশকিছু বিনিয়োগে হোটেল, শিল্প-কারখানা স্থাপিত হচ্ছে।এরমধ্যে খুলনা মহানগরীর বৈকালীতে ভূইয়া গ্রুপের ৩০তলা বিশিষ্ঠ ফাইভ ষ্টার মানের মোভেনপিক হোটেল এন্ড রিসোর্ট উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ। এ হোটেলটি খুলনার সর্বোচ্চ ভবন হিসেবে ইতিমধ্যেই খ্যাতি পেয়েছে। নগরীর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু শেখ আবু নাসের ষ্টেডিয়াম সংলগ্ন দৃষ্টি নন্দন এ হোটেল ভবনটির নির্মান কাজ প্রায় শেষের দিকে। এ হোটেল ও রিসোর্ট প্রকল্পের এক্সিকিউটিভ অফিসার মো: নাইমুল ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু শেখ আবু নাসের ষ্টেডিয়ামকে বিবেচনায় নিয়ে এ ফাইভ ষ্টার হোটেলটি নির্মান করা হচ্ছে। বিগত দিনে খুলনায় ক্রিকেট ম্যাচের সময় বিদেশী খেরোয়াড়দের আবাসন সমস্যায় খুলনাঞ্চল পিছিয়ে গেছে। মূলত আর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু, সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটন সম্ভাবনা এবং ষাটগম্বুজ মসজিদ ও সুন্দরবনের মত দুই বিশ্বঐতিহ্যের প্রতি দেশী-বিদেশীদের আকর্ষণকে বিবেচনায় নিয়েই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এজন্য এই হোটেলে আন্তর্জাতিক মানের ২১৭টি কক্ষ রাখা হয়েছে। এছাড়া এক হাজার আসন বিশিষ্ঠ সেমিনার হল, কনফারেন্স হল, ফুডকোট, সুইমিং পুলসহ সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ হোটেলটির নির্মান কাজ শেষ করার প্রস্তুতি রয়েছে। এটি খুলনার অবস্থান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হবে। একই সাথে বাড়বে খুলনাঞ্চলের পর্যটন, ব্যবসা-বানিজ্য ও কর্মসংস্থান। খুলনার এ সর্বোচ্চ ও বৃহৎ ফাইভস্টার হোটেল ২০২৫সালের মধ্যেই চালু করার উদ্যোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে, রূপসায় ওহাব জুট মিল, ফুড প্রসেসিং কারখানা, ওরিয়ন পাওয়ার প্লান্ট, শিরোমনিতে রহমান পেটফ্লেক্সসহ অর্ধশতাধিক কারখানা ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে।

খুলনা চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক মো: মফিদুল ইসলাম টুটুল বলেন,  দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন ছিল পদ্মা সেতু। সেটির উদ্বোধনের পরে সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলের সম্ভাবনার অনেকটাই পুরন হয়েছে। বিশেস করে কৃষি, মৎস্য ও ক্ষদ্র শিল্পের মালামাল খুবই সহজেই রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের পরিবহন ও বিক্রি করতে পারছে। চিংড়ী, পাট, আমসহ উৎপাদিত পন্য সহজেই রপ্তানী করা সম্ভব হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ন থেকে রেহাই পেয়েছে। শিক্সা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রেও উন্নয়ন ঘটেছে। তবে খুলনাঞ্চলের মানুষ যতটা আমা করেছিল তা হয়নি। বিশেষ করে শিল্পের ক্সেত্রে অনেকটাই মন্থর গতি। খুলনায় গ্যাস সরবরাহ না থাকায় শিল্প কারখানার অগ্রগতি ও গতিশীলতা পাচ্ছে না। শিল্পের উন্নয়ণ হচ্ছে না জ্বালানী গ্যাস না থাকায়। সরকার গ্যাস সরবরাহ করলে শিল্পের শতভাগ সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হবে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে অর্থনৈতিক জোন হলেও খুলনায় প্রস্তাবিত তেরখাদা ও বটিয়াঘাটায় দুটি অর্থনৈতিক জোন স্থাপনের কোন অগ্রগতি হয়নি। গ্যাস সরবরাহ ও অর্থনৈতিক জোন বাস্তবায়িত হলেই ব্যবসা-বানিজ্য সম্প্রসারিত হবে। একই সাথে ঢাকা-ভাংগা এক্সপ্রেসওয়ে মোংলা বন্দর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হলে মোংরা বন্দরের পাশাপাশি শিল্প, ব্যবসা-বানিজ্য ও পর্যটনসহ সকল সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হবে বলেও তিনি মনে করেন।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ-জামান বলেন, খুলনাঞ্চলের মানুষের শত আন্দোলন-সংগ্রামের পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ পদ্মা সেতুর জন্য চেয়ে ছিল। ২০২২সালে পদ্মা সেতুর ‍উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সে স্বপ্ন পুরন হয়েছে। পদ্মার সুবিধা কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক উন্নয়ণ ঘটেছে। আগে রাজধানীর সাথে যে কানেকটিভিটির ঘাটতি ছিল তা পুরন হয়েছে।  কিন্তু মোংলা বন্দর, বিনিয়োগ, শিল্প-কারখানা, কর্শসংস্থানসহ অর্থনৈতিক উন্নয়ণ কাঙ্খিত হারে হয়নি। গড়ে ওঠেনি পর্যটন হাব। শিল্পাঞ্চল খ্যাত খালিশপুর-দৌলতপুরের বন্ধ পাটকল চালু করা হয়নি। দীর্ঘ কয়েক দশকেও খুলনাকে ব্যান্ডিং করার মত কিছুই গড়ে ওঠেনি। খুলনার চিংড়ী যেটা ছিল তাও আজকে ধ্বংসের পথে। যা খুবই হতাশাজনক। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি অর্থনৈতিক জোন হলেও খুলনায় প্রস্তাবিত তেরখাদা ও বটিয়াঘাটায় দুটি অর্থনৈতিক জোন স্থাপনের কোন অগ্রগতি হয়নি। সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটন ও ট্যুর অপারেটরদের উন্নয়নে কোন পদক্ষেপ নেই। সুতরাং অর্থনৈতিক সুবিধা কাজে লাগাতে হলে গ্যাস সরবরাহ, অর্থনৈতিক জোনসহ শিল্পের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। শিল্পের স্থান নির্ধারণ ও জ্বালানী গ্যাস সরবরাহ না হলে পদ্মা সেতুর টোটাল প্যাকেজ  সুবিধা ও সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। এ জন্য তিনি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহবান জানান। ##

Tag :
লেখক তথ্য সম্পর্কে

Dainik Madhumati

জনপ্রিয়

বাকেরগঞ্জে কৃষি ব্যাংকের গ্রাহকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এক বছর :

সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগতে পারেনি খুলনাঞ্চল : যোগাযোগ-কানেকটিভিটির অভূতপূর্ব উন্নয়ন, পিছিয়েছে বিনিয়োগে

প্রকাশিত সময় : ১১:৪১:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জুন ২০২৩

####

স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এক বছর পূর্তি হচ্ছে ২৫জুন-২০২৩। এ সেতুর উদ্বোধনের ফলে বিপুল সম্ভাবনা ও সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে খুলনাঞ্চলের মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছিল আকাশচুম্বি প্রত্যাশা। সরকারী ও বেসরকারী ‍উদ্যোগে গড়ে উঠবে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা, আইসিটি ও তথ্যপ্রযুক্তিগত স্থাপনা, স্বাস্থ্য-শিক্ষায়তন, পর্যটন কেন্দ্র ও কৃষি-মৎস্যসহ বিভিন্ন খাতে উন্নত ও আধুনিক পরিকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা। বাড়বে ব্যবসা-বনিজ্য, রপ্তানী ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং কর্মসংস্থান। কিন্তু গত এক বছরেও খুলনাঞ্চলে আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন হয়নি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান কেন্দ্র খুলনাকে ঘিরে মানুষের আশা-আকাংখার সাথে বাস্তবতায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও সার্বিক বিচারে হতাশায় রয়েছে এ অঞ্চলের মানুষ।পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ও কানেকটিভিটির বৈপ্লবিক উন্নয়ন ঘটেছে।যা চোখে পড়ার মতো। অন্যখাতগুলোতে সেভাবে উন্নয়ন ও উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। তবে মোংলা কেন্দ্রীক অনেকগুলো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। নাগরিক নেতা ও চেম্বারের নেতাদের দাবী শিল্প কারখানার পরিবেশ তৈরী ও জ্বালানি হিসেবে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় সবদিক দিয়েই পিছিয়ে পড়ছে খুলনাঞ্চল। তাই দ্রুত সরকারী উদ্যোগেই গ্যাস সরবরাহ ও অর্থনৈতিক জোনসহ অবকাঠামোগত সুবিধা গড়ে তোলার দাবীও তাদের। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এক বছর পূর্তিতে খুলনাঞ্চলের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সম্ভাবনার বিষয় বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

২০২২ সালের ২৫জুন দেশের সর্বাধুনিক পদ্মা সেতু উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বপ্নের এ সেতুর উদ্বোধনের পর দেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বেশী উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন ঘটেছে সড়ক যোগাযোগ ও কানেকটিভি ব্যবস্থার। এ অঞ্চলের সড়কের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। যে উন্নয়ন কর্মকান্ড এখনও চলমান রয়েছে। খুলনা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো:আনিসুজ্জামান মাসুদ বলেন, খুলনাঞ্চলের সড়কের উন্নয়নে বেশকিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং চলমান রয়েছে। এরমধ্যে নগরীর ময়রাপোতা-জিরোপয়েন্ট চারলেন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। ১০০কোটি টাকার এ প্রকল্প নগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও যানজট নিরসনে বিশেষ ভুমিকা রাখবে। এছাড়া খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কের বেতগ্রাম-তালা-পাইকগাছা-কয়রা সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার একটু বেশী দেখা যাচ্ছে। এ প্রকল্প-এর ৬৫কিমি রাস্তার মেরামত ও উন্নয়ন এবং কয়রার অতিরিক্ত ৩৩৯কোটি টাকা ব্যয়ে আরও ৩১কিমি রাস্তার কাজের প্রায় ৭০শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। এদিকে, ১৭কোটি টাকা ব্যয়ে ভৈরব সেতু নির্মান প্রকল্প কাজ ৩০শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এ প্রকল্পের ভুমি অধিগ্রহনসহ অনেকটাই কাজ অগ্রগতি হয়েছে। খুলনা মহানগরীর প্রবেশ দ্বার জিরো পয়েন্টে ৩০কোটি টাকা ব্যয়ে বিউটিফিকেশনসহ উন্নয়ন ও সৌন্দর্য বর্ধন কাজের ৫০শতাংশ কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে।

তিনি বলেন, খুলনাঞ্চলের সড়কের উন্নয়নে আরও কিছু পরিকল্পনা এখন পাইপ লাইনে রয়েছে। খুলনার সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে ভবিষ্যত পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে-খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারী বিএল কলেজের সামনে ৭কোটি টাকা ব্যয়ে ফুট ওভার ব্রিজ নির্মান প্রকল্প, ২৫কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর ফেরীঘাট মোড় থেকে পূর্ব রূপসা ফেরীঘাট পর্যন্ত খানজাহান আলী সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। এ প্রকল্পের কাজ ৯০শতাংশ শেষ হয়েছে। গল্লামালী পুরাতন ব্রিজের স্থলে রাজধানীর হাতির ঝিলের অনুরূপ দৃষ্টিনন্দন চার লেনেরে আর্চ ব্রিজ প্রকল্প, ৭০কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। খুলনা-চুকনগর-সাতক্ষীরা সড়কের দূর্ঘটনা রোধে গুটুদিয়া-বানিয়ালকালী-কাঠালতলা বাক সরলীকরন প্রকল্প ও দাকোপের চুনকুড়ি নদীতে ৭৪৭কোটি টাকা ব্যয়ে চুনকুড়ি ব্রিজ প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের পর প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং ইওআই আহবান করা হয়েছে। ভবিষ্যত পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে-খুলনা সিটি বাইপাস দিয়ে খুলনা-যশোর ০৬লেন প্রকল্প। এ প্রকল্পের ডিপিপি সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া খুলনা নগরীর মধ্যে ফুলতলার আফিল গেট থেকে ডাকবাংলা মোড় পর্যন্ত ফোরলেন প্রকল্প, গল্লামারী-বটিয়াঘাটা-নলিয়ান পর্যন্ত ৫৮কিমি সড়ক প্রকল্প, দাকোপের ঝপঝপিয়া নদীতে পানখালী ব্রিজ নির্মানের জন্য প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।একই সাথে রাজধানীর সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি ও সড়ক পথে দুরত্ব কমিয়ে আনতে ফুলতলা-শিকিরহাট-নড়াইল সড়ক উন্নয়ণ ও ফেরীঘাট নির্মান প্রকল্প এবং খুলনা মহানগরীর ভৈরব নদীর জেলখানা ঘাট পয়েন্টে ব্রিজ বা টানেল নির্মান প্রকল্প। এ সব প্রকল্পের ফিজিবিলিটি ষ্ট্যাডি চলছে। অচিরেই যোগাযোগ ব্যবস্তার উন্নয়নে এসব প্রকল্প মাঠ পর্যায় বাস্তবায়ন শুরু হবে বলেও তিনি জানান। এছাড়াও নগরীর আরেক প্রবেশ দ্বার রূপসা খানজাহান আলী ব্রীজ থেকে লবনচরা হয়ে রূপসা ফেরীঘাট পর্যন্ত সড়কের চারলেন প্রকল্প, নগরীর নিরালা থেকে বাইপাস সড়ক পর্যন্ত লিংক রোড, খুলনা বিশ্ববিধ্যালয় থেকে রায়েরমহল এবং মুজগুন্নী শেখ আবু নাসের হাসপাতাল থেকে বাইপাস পর্যন্ত থ্রি-লিংক রোড প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।

কৃষি খাতে উন্নয়ণ :

পদ্মার উদ্বোধনের পর খুলনাঞ্চলে উন্নয়নের আরেকটি বড় খাত কৃষি। কৃষির আধুনিকায় ও উন্নয়নের ফলে খুলনাঞ্চল এখন স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ এলাকা। এক সময়ের খাদ্যে ঘাটতির এলাকা থেকে খুলনা এখন খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলাতে পরিনত হয়েছে। খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলার ৯টি উপজেলায় কৃষির আধুনিকায়ন ও উন্নয়নে ১২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যার মাধ্যমে খুলনাঞ্চলের কৃষির যেমন উন্নয়ণ ঘটছে। তেমনি আধুনিকতার ধারায় বদলে যাচ্ছে চিরায়ত কৃষির ভাবনাও। এসব প্রকল্পের মধ্যে ডুমুরিয়া উপজেলায় কন্দাল ফসল উন্নয়ণ প্রকল্প, জেলার ৯টি উপজেলায় বাস্তবয়ন হচ্ছে রাজস্ব নামে আরেকটি প্রকল্প। রূপসা, ফুলতলা, বটিয়াঘাটা ও তেরখাদা উপজেলায় কৃর্ষি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কৃষক প্রশিক্ষণ প্রকল্প, ৯ উপজেলায় আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে ধান, পাট, গম ও বীজ উৎপাদন , সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্প, গোপালগঞ্জ-খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা ও পিরোজপুর কৃর্ষি উন্নয়ন প্রকল্প, ডুমুরিয়া ও তেরখাদায় জলাবদ্ধ এলাকায় ভাসমান বেডে সজ্বি ও মশলা চাষ গবেষনা, সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়করন প্রকল্প, তেল জাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প, পরিবেশ বান্ধব কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদন প্রকল্প বা আইপিএম, ক্লাইমেট-স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে খুলনার কৃর্ষি অঞ্চলের জলবায়ু পরির্তন অভিযোজন প্রকল্প, খামার যান্ত্রিকরনের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প, সৌরশক্তি ও পানি সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির পাইলট প্রকল্প ও অনাবাদি পতিত জমিতে ও বসত বাড়ীর সীমনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃর্ষির উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া চলতি বছরে আরও বড় আকারের পার্টনার নামে আরেকটি প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। খুলনা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপপরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সরকারীভাবে খুলনায় কৃষির উন্নয়নে যেসব প্রকল্প শুরু হয়েছে তা অভাবনীয়। এসব প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। আমরা আশা করছি খুলনার চিংড়ী, তরমুজ, তিল, চুইঝাল, নারিকেলসহ অনেক প্রচলিত ও অপ্রচলিত কৃষিপন্য এখন বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে। যা আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে এবং সফলতাও আসছে।

মৎস্য শিল্প খাত :

পদ্মা সেতুর সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে বেশী লাভবান ও উন্নয়ণ হয়েছে খুলনার মৎস সেক্টরে। খুলনাঞ্চল দেশের একমাত্র চিংড়ী উৎপাদন ও রপ্তানী এলাকা। যেখান থেকে দেশের চিংড়ী রপ্তানীর ৮০শতাংশ হয়ে থাকে। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হওয়ায় খুলনাঞ্চলের মাছ চাষ ও বাজারজাত করনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। এ অঞ্চলের দুই লক্ষাধিক মৎস্য চাষী, মাছ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ঠ ১০লক্ষাধিক মানুষ বেশী উপকৃত হচ্ছেন। খুলনা থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের দুরুত্ব যেমন কমেছে। তেমনি হ্রাস পেয়েছে পরিবহন ও যাতায়াত খরচ এবং কর্মঘন্টাও। ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে বিপনন ও মৎস্য চাষীদের আয়ের পথ।

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল বলেন, খুলনাঞ্চল বরাবরই মৎস্য চাষের জন্য সমৃদ্ধ এলাকা। এ অঞ্চলে দুই লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে চিংড়ী চাষ হয়ে থাকে। যা দেশের চিংড়ী রপ্তানীর ৮০ভাগ। এছাড়াও রুই-কাতলা-মৃগেলসহ সাদা মাছের জন্যও ব্যিখাত। এ মাছ ‍উপাদনকে ঘিরে খুলনা-বাগেরহাট ও যশোরে ৭০টি মাছ প্রক্রিয়াকরন কারখানা গড়ে ‍উঠেছে। পদ্মা ব্রিজ উদ্বোধন হওয়ায় খুলনাঞ্চলের মৎস্য চাষী , মাছ ব্যবসায়ী ও রপ্তানীকারকরা খুবই সহজেই ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের উৎপাদিত মাছ পরিবহন ও বিপনন করতে পারছে। এখন খুলনা থেকে মাত্র সাড়ে তিন ঘন্টায় রাজধানীতে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। একই সাথে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে মাত্র ৭-৮ঘন্টার মধ্যে পৌছাতে পারছে। সেজন্য এ অঞ্চলের মাছের চাহিদা যেমন বেড়েছে। তেমনি মাছ চাষী ও ব্যবসায়ীরাও তাদের উৎপাদিত মাছের দামও ভালো পাচ্ছেন। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের চিংড়ী প্রক্রিয়াকরন ফ্যাক্টরীগুলো সম্পূর্ণভাবে খুলনাঞ্চলের চিংড়ীর উপর নির্ভরশীল। আগে যেখানে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে চিংড়ী পাঠাতে দেড় থেকে ‍দুই দিন লাগতো এখন সেখানে সকালে গিয়ে রাতেই ব্যবসায়ীরা ফিরে আসতে পারছে। এতে পরিবহন খরচ, বিপনন খরচ এবং ব্যবসায়ীদের কর্মঘন্টাও কমেছে। অন্যদিকে, খুলনাঞ্চলের চিংড়ী ঘেরগুলো চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের হ্যাচারীর উপর নির্ভরশীল থাকায় চিংড়ীর রেনুপোনা পরিবহন কাজ অনেক সহজ ও খরচও কমে গেছে।একই সাথে রেনুপোনার মর্টালিটির হারও অনেকাংশে কমেছে। এজন্য চিংড়ী চাষীরা যেমন লাভবান হচ্ছেন। তেমনি মৎস্য প্রক্রিয়াকরন কারখানাগুলোও ঘুরে দাড়ানোর স্বপ্ন দেখছে।বর্তমানের চিংড়ী রপ্তানী খাতে সাড়ে ৫হাজার ডলার রপ্তানীর মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। ফলে সার্বিকভাবে দেশের রপ্তানী আয়ও বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনীতিতেও ভুমিকা রাখছে। মৎস্য সেক্টরের এ প্রবৃদ্ধি দিন দিন আরও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

এছাড়া খুলনাসহ উপকুলীয় এলাকার মৎস্য সম্পদ উন্নয়নে সাসটেইনএ্যাবল কোষ্টাল এন্ড মেরিন ফিসারিজ প্রকল্প বাস্তাবায়িত হচ্ছে।এ প্রকল্পের আওতায় সামুদ্রিক একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলে (EEZ) মৎস্য জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে চিংড়ি, তলদেশীয় এবং ভাসমান প্রজাতির মৎস্যের মজুদ নিরূপন কর্মসূচি জোরদারকরণ;  সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা সংস্থার সামর্থ্য বৃদ্ধিপূর্বক বিজ্ঞানভিত্তিক টেকসই মৎস্য মজুদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন; বাণিজ্যিক ও ক্ষুদ্রায়তন মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নে অধিকতর কার্যকর পরিবীক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারী (এমসিএস) পদ্ধতির বাস্তবায়ন; উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, সার্ভিস সেন্টার, মৎস্যবাজর উন্নয়নকরতঃ আহরিত ও উৎপাদিত মৎস্যের ভ্যালূ চেইন উৎকর্ষ ও গুণগতমান উন্নয়ন ও অপচয় হ্রাস করা;  উপকূলীয় জেলা সমূহে ক্লাস্টার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সম্প্রসারণ ঘটিয়ে বাগদা চিংড়ির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও চিংড়ি রপ্তানী বৃদ্ধি করা;  দরিদ্র মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠি কর্তৃক চালিত তাঁদের নেতৃত্বে উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ-এর টেকসই সহ-ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা এবং বিকল্প জীবিকায়নে সহায়তা  করা;  উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ এর টেকসই আহরণ ব্যবস্থাপনায় ‘সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ প্রণয়ন করা; এবং  উপকূলীয় এবং সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংক্রান্ত বিভিন্ন ক্রসকাটিং ইস্যুর ওপর সমীক্ষা পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে খুলনাসহ উপকুলীয় এলাকার মৎস্য সম্পদ উন্নয়ন ও মৎস্য সেক্টর আরও বেশী আধুনিকায়ন হবে।

পর্যটন শিল্প খাত :

খুলনার পর্যটন শিল্প খাতও পিছিয়ে নেই। পদ্মার সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে খুলনাঞ্চলের পর্যটন শিল্প খাতও সমৃদ্ধ হচ্ছে। এ খাতে সরকারী ও বেসরকারী বিনিয়োগও বাড়ছে। বিশেষ করে বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবন ও নয়নাভিরাম সাগর কেন্দ্রিক পর্যটনের সুবিধা বাড়ার সাথে সাথে দেশী-বিদেশী পর্যটকের আকর্ষনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পর্যটকদের চাহিদার বিবেচনায় সরকারীভাবে যেমন বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তেমনি বেসরকারী পর্যায়েও উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছে। ফলে খুলনাঞ্চলের পর্যটনের সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে উদ্যোগী হচ্ছেন সবাই। খুলনার বন সংরক্ষক মিহির ‍কুমার দো বলেন, বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনের দুই বিভাগ মিলে দেশী-বিদেশী ভ্রমন ও সৌন্দর্য্য পিপাসু পর্যটকদের আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু। সুন্দরবনের বাগেরহাট-খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলেই বেশী পর্যটকের আনোগোনা দেখা যায়। সুন্দরবন ‍সুরক্ষা করে পর্যটনকে উৎসাহ দিতে সরকারীভাবে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যার ফলে পর্যটকও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে আগে সুন্দরবনের হাড়বাড়িয়া, কচিখালী, কটকা, দুবরার চরসহ ট্যুরিজম স্পটগুলো কোর জোন বা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবস্থিত। সেকারনে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি না হয় বিবেচনায় নিয়ে পর্যটকদের জন্য অনেক বিধিনিষেধ ছিল। এবং ট্যুরিজম স্পটগুলো গভীরে থাকায়  ৩-৪দিন সময় লাগতো। একই সাথে অনেক সময় ব্যয় হওয়া এবং বিধিনিষেধের কারনে পর্যটকরা সুন্দবনে ভ্রমনে নিরুৎসাহিত হতেন। এ অবস্তার পরিবর্তনে সরকারীভাবে বাফার জোনে ৪টি নতুন ট্যুরিজম স্পট গড়ে তোলা হচ্ছে।এ ষ্পটগুলোর মধ্যে বাগেরহাটের শরনখোরার আলীবান্দা, মংলার আন্দারমানিক, খুলনার দাকোপের সুতরখালীর কালাবগী ও শেখেরটেক এলাকায়  গড়ে তোলা হচ্ছে। যা সহজ যোগযোগ ও কম গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্থাপন হওয়ায়  যে কোন দেশী-বিদেশী পর্যটকরা কোন বিধিনিষেধ ছাড়াই ভ্রমন করতে পারবেন। পর্যটকরা দিনে ভ্রমনে গিয়ে দিনেই ফিরতে পারবেন। ইতিমধ্যেই এ চারটি পর্যটন স্পট তৈরীর কাজ ৮০শতাংশ শেষ হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সবগুলোর কাজ শেষ হবে বলে তিনি আশা করেন। তিনি বলেন, সুন্দরবনের বাফার জোনে এ পর্যটন স্পটগুলো হওয়ায় সুন্দরবনের সুরক্ষায় ভুমিকা রাখবে। বিশেষ করে আগের পর্যটন স্পটগুলো কোর জোন বা সংরক্ষিত এলাকায় হওয়ায় বনের প্রানী, মৎস্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ হুমকির মুখে ছিল। যে কারনে সুন্দরবন সংরক্ষনে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতো। কিন্তু নির্মানাধীন চারটি পর্যটন স্পট বাফার জোন অর্থাৎ মানুষের চলাচলের এলাকায় অবস্থিত হওয়ায়  সুন্দরবন সুরক্ষা অনেক সহজ হবে। পর্যটকরাও স্বচ্ছন্দে ভ্রমনে যেতে পারবেন। এতে বাড়বে সরকারের রাজস্ব এবং নির্ভরশীল মানুষের কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে কয়েকগুন। ইতিমধ্যেই চারটি পর্যটন স্পটের মধ্যে সুতোরখালীর কালাবগী স্পট সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। বাকীগুলো ডিসেম্বরের পরে উন্মুক্ত করে দেয়া সম্ভব হবে বলেও তিনি আশা করেন।

তিনি আরও বলেন, খুলনাঞ্চলে বিশেষ করে সুন্দরবন কেন্দ্রীক পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি বেশকিছু বেসরকারী সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান পর্যটনে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে ‍উঠেছে। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএসএআইডি কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম উন্নয়নে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ সংস্তাটি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সুশীলন, রূপান্তরসহ কয়েকটি সংস্থাকে সাথে নিয়ে সুন্দরবন কেন্দ্রিক ইকো ট্যুরিজম প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ সংস্থা খুলনার দাকোপের বানীশান্তা এলাকা, কালাবগী, সুতোরখালী, পাইকগাছা ও কয়রার বিভিন্ন এলাকা এবং সাতক্ষীরার শ্যমনগর, কালীগঞ্জ ও বাগেরহাটের মোংলা-শরণখোলার অনেকগুলো এলাকায় এই কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় এলাকাবাসীর যেমন কর্মসংস্থান তৈরী হবে তেমনি সুন্দরবন সুরক্ষায়ও ভুমিকা রাখবে বলেও তিনি জানান।

আরও সরকারী উদ্যোগ :

পদ্মা সেতৃ উদ্বোধনের পর গত এক বছরে সরকারীভাবে খুলনায় বেশকিছু উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে। এ সকল প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহনসহ বাস্তবায়ন কাজ চলমান রয়েছে। আবার অনেকগুলো অবকাঠামোগত নির্মান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসকের রাজস্ব ও ভুমি শাখার তথ্য মতে, পদ্মা সেতু উদ্বোধন থেকে শুরু করে খুলনায় বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।এসব প্রকল্পের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বৃদ্ধি, উন্নয়ণ, স্বাস্থ্য, ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পরিরবেশ সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্নতা, খাদ্য সংরক্ষানাগার ও আইসিটির উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে। সরকারের এসব প্রকল্পের কোনটির জমি অধিগ্রহন শেষ হয়েছে। আবার কোনটির ভুমি অধিগ্রহনের কাজ চলছে। এরমধ্যে সড়ক বিভাগের খুলনা সিটি-দিঘলিয়া উপজেলার যোগাযোগ সহজ করতে ভৈরব নদীর উপর এক কিমি সেতু নির্মান প্রকল্পের জন্য ৪একর জমি অধিগ্রহন করা হয়েছে। কেসিসি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কেডিএ’র আওতায় তিনটি লিংক রোড নির্মান প্রকল্পের মধ্যে শেখ আবু নাসের হাসপাতাল থেকে আড়ংঘাটা পর্যন্ত লিংক রোড প্রকল্পের ১১.৮একর, খুলনা বিশ্ববিধ্যালয় থেকে রায়ের মহল পর্যন্ত লিংক রোড প্রকল্পের ১৩.৮৮একর এবং নিরালা আবাসিক এলাকা থেকে সিটি বাইপাস পর্যন্ত লিংক রোড প্রকল্পের ৭.০৩একর জমি অধিগ্রহন করা হয়েছে। এছাড়া কয়রা, পাইকগাছায় দুটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষনে স্মৃতি জাদুঘর নির্মান প্রকল্পের জন্য ১৯শতক জমি অধিগ্রহন সম্পন্ন হয়েছে। নগরীর বিল পাবলা এলাকায় ইন্ডাষ্ট্রিয়াল পুলিশের অফিস ভবন নির্মান প্রকল্পের জন্য ৫একর, খুলনা-কয়রা সড়কের বেতগ্রাম থেকে পাইকগাছা ভায়া কয়রা সড়কের বাঁক সরলীকরন প্রকল্পের জন্য ১৪একর, রূপসা উপজেলায় খাদ্যপন্য সংরক্ষনে গুদাম নির্মান প্রকল্পের জন্য ১.৮৩একর, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর সিটি নির্মানের জন্য কেসিসি এলাকায় বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কেসিসি এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন প্রকল্পের সেকেন্ডারী ডাম্পিং ষ্টেশনের জন্য বটিয়াঘাটার রাঁজবাধে ৩০একর, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের গ্যারেজ নির্মানে বটিয়াঘাটার খোলাবাড়িয়ায় ১০একর, কেসিসির ০৬টি এসটিএস নির্মানে মহেশ্বরপাশা, রায়েরমহল, দেয়ানা, টুটপাড়া, মীরেরডাঙ্গা ও ছোট বয়রা এলাকায় ৩০শতাংশ জমি এবং কেসিসির গ্যারেজ বর্ধিতকরন প্রকল্পের জন্য নগরীর পাওয়ার হাউজ মোড়ে ৪৭শতক জমি অধিগ্রহন করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাত :

খুলনাঞ্চলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে একই সাথে কয়েকটি প্রকল্পের কাজও এগিয়ে চলেছে। এরমধ্যে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মান প্রকল্পের জন্য ২০০একর জমি, খুলনা শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের জন্য এক হাজার একর ও খুলনা আধুনিক শিশু হাসপাতাল নির্মান প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহন কাজ চলমান রয়েছে। একই সময়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিসি ইউনিটের আধুনিকায়ন ও ক্যান্সার ইউনিট স্থাপন এবং শেখ আবু নাসের হাসপাতালের প্লাষ্টিক ও বার্ন ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া খুলনা জেনারেল হাসপাতালের ১০তলা নতুন ভবন, সিভিল সার্জনের নতুন অফিস ভবন, নূরনগরে ডায়াবেটিস হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মান করা হয়েছে। খুলনায় স্বাস্থ্যসেবা ‍বৃদ্ধির লক্ষ্যে সোনাডাঙ্গা এলাকায় র্সিং কলেজ নির্মানের কাজও এগিয়ে চলেছে।

খুলনার জেলা প্রশাসক খন্দকার ইয়াসির আরেফিন বলেন, পদ্মা সেতুর সুবিধা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে খুলনায় সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগে অনেকগুলো মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এসব প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহন ও ফিজিবিলিটি ষ্টাডিও হয়েছে। চলমান এ কাজ শেষ হলে খুলনার দ্যৃশমান উন্নয়নে বদলে যাবে সার্বিক পরিবেশ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প-কারখানা ও হোটেল-মোটেল এবং পর্যটন খাতেও অনেক উন্নয়ন কাজ হয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ শিল্পগুলোও চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে তথ্য প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে বন্ধকৃত দাদাম্যাচ ফ্যাক্টরীর অব্যবহৃত ৪১৫.২৪শতক জমিতে ১৬০কোটি টাকা ব্যয়ে হাইটেক পার্ক স্থাপনসহ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অন্যদিকে, দুটি অর্থনৈতিক জোনসহ আরও কয়েকটি প্রকল্প শুরু হতে যাচ্ছে। যেগুলো সম্পন্ন হলে খুলনা উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি একটি পর্যায়ে পৌছাবে বলেও তিনি জানান।

খুলনার বিনিয়োগের পরিমান কমেছে : 

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর গত এক বছরে খুলনাঞ্চলে বিনিয়োগের মাত্রা ও পরিমান কমেছে। বিভিন্ন সেক্টরে গত কয়েক বছরের তুলনায় বিনিয়োগ নিবন্ধন হ্রাস পেয়েছে। বিনিয়োগ নিবন্ধনের এ পরিস্থিতি খুলনাঞ্চলের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য হতাশাজনক। খুলনার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কতৃর্পক্ষের পরিচালক প্রনব ‍কুমার রায় বলেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগেই খুলনাঞ্চলে বেশকিছু বিনোয়গ সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি, শিল্প কারখানা, মৎস্য সংরক্ষন ও রপ্তানী, গ্যাস, সিমেন্ট কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে পদ্মা সেতুর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা খুলনাঞ্চলে বিনিয়োগে ঝুঁকছেন। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২১-২২ অর্থ বছরে বিনিয়োগের ৪৩টি নতুন প্রস্তাবনায় ৪হাজার ১৬১দশমিক ৮৪৯ মিলিয়ন এবং সংশোধনীর প্রস্তাবনায় অতিরিক্ত আরও ৫২টি প্রস্তাবনায় ৬হাজার ৩৩১দশমিক ৪৬১মিলিয়ন টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাবনা নিবন্ধিত হয়েছে। কিন্তু উদ্বোধনের পর গত এক বছরে ২০২২সালের জুলাই থেকে ২০২৩সালের ২০জুন পর্যন্ত মোট ১৬টি বিনিয়োগ প্রস্তাবনা রেজিষ্ট্রেশনভুক্ত হয়েছে। যা এর আগের বছরের তুলনায় কম। এসকল বিনিয়োগ প্রস্তাবনায় ২হাজার ৩৮৮ দশমিক ৮৩৩মিলিয়ন টাকার প্রস্তাব নিবন্ধন হয়েছে। এছাড়া আরও ৩১টি বিনিয়োগ প্রস্তাব সংশোধন করে নতুনভাবে অতিরিক্ত ৪হাজার ৮০৮ দশমিক ৩৪৮মিলিয়ন টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাবনা নিবন্ধ করা হয়েছে।এ বিনিয়োগের মাধ্যমে খুলনাঞ্চলে ৬হাজার ৩৫৩জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে বটিয়াঘাটায় বায়োএ্যাকোয়া ইন্ডাষ্ট্রিজ, দুবাই ম্যাক্স পাওয়ার কেমিক্যালস লিমিটেড, ডুমুরিয়ায় অটো ফ্লাওয়ার মিলস, খালিশপুরে সুতা তৈরীর সুমাইয়া পেট ফ্লেক্স রিসাইকেল লিমিটেড, চিংড়ী রপ্তানী খাতে রূপসায় বেঙ্গল প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং, সেনাডাঙ্গায় এনজিন মেটাল ইন্ডাষ্ট্রিজ, সাতক্ষীরা রংধনু শ্রিম্প প্যাকেজিং, রিপন এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড ও মালিহা জুট ইন্ডাষ্ট্রিজ, বাগেরহাটে লাফস গ্যাস লিমিটেড, দুবাই-বাংলা সিমেন্ট মিলস এবং খুলনায় ওয়েভ জুট মিলস লিমিটেড কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সর্বোচ্চ বেসরকারী বিনিয়োগের হোটেল :

পদ্মা সেতুর সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সরকারী প্রতিষ্টানের পাশাপাশি খুলনায় প্রাইভেট সেক্টরে বেশকিছু বিনিয়োগে হোটেল, শিল্প-কারখানা স্থাপিত হচ্ছে।এরমধ্যে খুলনা মহানগরীর বৈকালীতে ভূইয়া গ্রুপের ৩০তলা বিশিষ্ঠ ফাইভ ষ্টার মানের মোভেনপিক হোটেল এন্ড রিসোর্ট উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ। এ হোটেলটি খুলনার সর্বোচ্চ ভবন হিসেবে ইতিমধ্যেই খ্যাতি পেয়েছে। নগরীর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু শেখ আবু নাসের ষ্টেডিয়াম সংলগ্ন দৃষ্টি নন্দন এ হোটেল ভবনটির নির্মান কাজ প্রায় শেষের দিকে। এ হোটেল ও রিসোর্ট প্রকল্পের এক্সিকিউটিভ অফিসার মো: নাইমুল ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু শেখ আবু নাসের ষ্টেডিয়ামকে বিবেচনায় নিয়ে এ ফাইভ ষ্টার হোটেলটি নির্মান করা হচ্ছে। বিগত দিনে খুলনায় ক্রিকেট ম্যাচের সময় বিদেশী খেরোয়াড়দের আবাসন সমস্যায় খুলনাঞ্চল পিছিয়ে গেছে। মূলত আর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু, সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটন সম্ভাবনা এবং ষাটগম্বুজ মসজিদ ও সুন্দরবনের মত দুই বিশ্বঐতিহ্যের প্রতি দেশী-বিদেশীদের আকর্ষণকে বিবেচনায় নিয়েই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এজন্য এই হোটেলে আন্তর্জাতিক মানের ২১৭টি কক্ষ রাখা হয়েছে। এছাড়া এক হাজার আসন বিশিষ্ঠ সেমিনার হল, কনফারেন্স হল, ফুডকোট, সুইমিং পুলসহ সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ হোটেলটির নির্মান কাজ শেষ করার প্রস্তুতি রয়েছে। এটি খুলনার অবস্থান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হবে। একই সাথে বাড়বে খুলনাঞ্চলের পর্যটন, ব্যবসা-বানিজ্য ও কর্মসংস্থান। খুলনার এ সর্বোচ্চ ও বৃহৎ ফাইভস্টার হোটেল ২০২৫সালের মধ্যেই চালু করার উদ্যোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে, রূপসায় ওহাব জুট মিল, ফুড প্রসেসিং কারখানা, ওরিয়ন পাওয়ার প্লান্ট, শিরোমনিতে রহমান পেটফ্লেক্সসহ অর্ধশতাধিক কারখানা ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে।

খুলনা চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক মো: মফিদুল ইসলাম টুটুল বলেন,  দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন ছিল পদ্মা সেতু। সেটির উদ্বোধনের পরে সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলের সম্ভাবনার অনেকটাই পুরন হয়েছে। বিশেস করে কৃষি, মৎস্য ও ক্ষদ্র শিল্পের মালামাল খুবই সহজেই রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের পরিবহন ও বিক্রি করতে পারছে। চিংড়ী, পাট, আমসহ উৎপাদিত পন্য সহজেই রপ্তানী করা সম্ভব হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ন থেকে রেহাই পেয়েছে। শিক্সা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রেও উন্নয়ন ঘটেছে। তবে খুলনাঞ্চলের মানুষ যতটা আমা করেছিল তা হয়নি। বিশেষ করে শিল্পের ক্সেত্রে অনেকটাই মন্থর গতি। খুলনায় গ্যাস সরবরাহ না থাকায় শিল্প কারখানার অগ্রগতি ও গতিশীলতা পাচ্ছে না। শিল্পের উন্নয়ণ হচ্ছে না জ্বালানী গ্যাস না থাকায়। সরকার গ্যাস সরবরাহ করলে শিল্পের শতভাগ সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হবে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে অর্থনৈতিক জোন হলেও খুলনায় প্রস্তাবিত তেরখাদা ও বটিয়াঘাটায় দুটি অর্থনৈতিক জোন স্থাপনের কোন অগ্রগতি হয়নি। গ্যাস সরবরাহ ও অর্থনৈতিক জোন বাস্তবায়িত হলেই ব্যবসা-বানিজ্য সম্প্রসারিত হবে। একই সাথে ঢাকা-ভাংগা এক্সপ্রেসওয়ে মোংলা বন্দর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হলে মোংরা বন্দরের পাশাপাশি শিল্প, ব্যবসা-বানিজ্য ও পর্যটনসহ সকল সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হবে বলেও তিনি মনে করেন।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ-জামান বলেন, খুলনাঞ্চলের মানুষের শত আন্দোলন-সংগ্রামের পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ পদ্মা সেতুর জন্য চেয়ে ছিল। ২০২২সালে পদ্মা সেতুর ‍উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সে স্বপ্ন পুরন হয়েছে। পদ্মার সুবিধা কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক উন্নয়ণ ঘটেছে। আগে রাজধানীর সাথে যে কানেকটিভিটির ঘাটতি ছিল তা পুরন হয়েছে।  কিন্তু মোংলা বন্দর, বিনিয়োগ, শিল্প-কারখানা, কর্শসংস্থানসহ অর্থনৈতিক উন্নয়ণ কাঙ্খিত হারে হয়নি। গড়ে ওঠেনি পর্যটন হাব। শিল্পাঞ্চল খ্যাত খালিশপুর-দৌলতপুরের বন্ধ পাটকল চালু করা হয়নি। দীর্ঘ কয়েক দশকেও খুলনাকে ব্যান্ডিং করার মত কিছুই গড়ে ওঠেনি। খুলনার চিংড়ী যেটা ছিল তাও আজকে ধ্বংসের পথে। যা খুবই হতাশাজনক। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি অর্থনৈতিক জোন হলেও খুলনায় প্রস্তাবিত তেরখাদা ও বটিয়াঘাটায় দুটি অর্থনৈতিক জোন স্থাপনের কোন অগ্রগতি হয়নি। সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটন ও ট্যুর অপারেটরদের উন্নয়নে কোন পদক্ষেপ নেই। সুতরাং অর্থনৈতিক সুবিধা কাজে লাগাতে হলে গ্যাস সরবরাহ, অর্থনৈতিক জোনসহ শিল্পের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। শিল্পের স্থান নির্ধারণ ও জ্বালানী গ্যাস সরবরাহ না হলে পদ্মা সেতুর টোটাল প্যাকেজ  সুবিধা ও সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। এ জন্য তিনি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহবান জানান। ##