০৫:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
আজ ২৯জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস :

৪৩বছরে ৭৮বাঘ হত্যা, সুন্দরবনে আজও নিরাপদ হয়নি বাঘের আবাসস্থল

####

 

আজ ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস। বাঘ রয়েছে বিশ্বের এমন ১৩টি দেশ বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালেশিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম ও রাশিয়ায় প্রতি বছর এ দিনটি পালিত হয়ে আসছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রধান আবাসস্থল সুন্দরবন হলেও এদেরকে সুরক্ষা ও আবাসস্থল নিরাপদ করা আজও সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন দেশের বাঘ বাঁচাতে নানা উদ্যোগে নিলেও সুন্দরবনে বাঘের মৃত্যু আশংকাজনকহারে বেড়েছে। একই সাথে সুন্দরবন থেকে পাচারও থেমে নেই। ১৯৮০ সাল থেকে ২০২৩ জুলাই পর্যন্ত গত ৪৩’বছরে সুন্দরবন ও সংলগ্ন এলাকায় শিকারীদের হানা, গ্রামবাসীর পিটুনী ও প্রাকৃতিক দূর্যোগে ৭৯টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে।

প্রানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা প্রতিনিয়ত সুন্দরবনের এ মহামূল্যবান সম্পদ বাঘের মৃত্যুর জন্য ৫’কারনকে চিহ্নিত করেছেন। তারা বলছেন, শিকারীদের জালে আটকে, বনদস্যুদের গুলিতে, প্রাকৃতিক ঝড়-জলোচ্ছ¡াস, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষের মধ্যে অজ্ঞতা ও সচেনতার অভাবের কারনে বনত্যাগী এসব রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আর বনে ফেরা হয় না। বন সংলগ্ন লোকালয়েই ঘটছে তাদের মর্মান্তিক মৃত্যু। সুন্দরবন বিভাগের লোকবল ও প্রয়োজণীয় উপকরন সংকটের কারনে বাঘ সংরক্ষনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন ও নিরাপত্ত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রতিনিয়িত বাঘের মৃত্যু ঘটছে। ফলে সুন্দরবনের বাঘের স্বাভাবিক বংশ বৃদ্ধি,আবাসস্থলের নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব হুমকিতে রয়েছে।  

সুন্দরবন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের মোট ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দুটি র্পূব সুন্দরবন ও পশ্চিম সুন্দরবন নামে বিভাগে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে শরণখোলা ও চাঁদপাই এবং পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগে খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ অবস্থিত। এছাড়া ১৭টি ষ্টেশন ও ৭২টি টহল ফাঁড়ি রয়েছে। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বাগেরহাটে ও পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগের সদর দপ্তর খূলনায় অবস্থিত। এ দুই বিভাগে মোট ১’হাজার ১’শ ৭১জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। সুন্দরবনে ২০০৪ সালের জরিপ অনুসারে সুন্দরবনে বাঘ ছিল ৪৪০টি। ২০১৮ সালের জরিপে তা কমে হয়েছে ১১৪টি। প্রতিনিয়ত এই বাঘ মৃত্যুর শিকারে পরিনত হচ্ছে। তারপরেও বন বিভাগ ২০২২সাল থেকে চলমান জরিপে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রত্যাশা করছেন।

বনবিভাগের তথ্যে জানা গেছে, ১৯৮০ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে শিকারীদের হানা, গ্রামবাসীর পিটুনী ও প্রাকৃতিক দূর্যোগসহ বিভিন্ন কারনে ৭৯টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে ১৯৮০ থেকে ২০০০সাল পর্যন্ত ২০বছরে ৩৩টি এবং ২০০১ সাল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ২৩’বছরে ৪৬টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। বনবিভাগ সূত্রে আরও জানা গেছে, ১৯৮২ সালে চাঁদপাই রেঞ্জের গেওয়া অপারেশন এলাকায় থেকে ১টি মৃত বাঘ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ১৯৮৩ সালে  ঢাংমারী এলাকা থেকে ১টি, কাশিয়াবাদ এলাকায় ১টি ও বুড়িগোয়ালীনি এলাকা থেকে ১টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করা হয়। ১৯৮৬ সালে কাশিয়াবাদ ষ্টেশন এলাকা থেকে ১টি ও কদমতলা এলাকা থেকে ১টি, ১৯৮৭ সালে বানিয়াখালি ষ্টেশন এলাকা থেকে ১টি মৃত বাঘ উদ্ধার করে বনকর্মীরা। ১৯৮৮ সালে ঢাংমারী ষ্টেশন এলাকায় ১টি, ১৯৮৯ সালে বানিয়াখালি ষ্টেশন এলাকা থেকে ১টি মৃত বাঘ উদ্ধার হয়। এ বাঘগুলো বিভিন্ন সময়ে শিকারীদের গুলিতে মারা পড়ে। সূত্র মতে, ১৯৯০  সালে চাঁদপাই এলাকায় ১টি ও কাটাখালি এলাকায় ১টি বাঘ জনতার বেপরোয়া পিটুনিতে নিহত হয়। গত ৩১ বছরের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম ঘটে। ১৯৯১ সালে গনপিটুনিতে ১টি ও শিকারীদের গুলিতে আরও ৩টি বাঘ প্রান হারায়। ১৯৯২ সালে একটি মৃত বাঘের চামড়া উদ্ধার করে বনরক্ষীরা। ১৯৯৪ সালে ২টি, ১৯৯৬ সালে ৫টি এবং ১৯৯৭ সালে ৬টি বাঘ সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় প্রবেশ করলে গ্রামবাসীর গনপিটুনিতে নিহত হয়। ১৯৯৮ সালে বনবিভাগের কর্মীরা ২টি বাঘের চামড়া উ্দ্ধার করে। ১৯৯৯ সালে শিকারীর পাতা ফাঁদে পড়ে ১টি, শিকারীর গুলিতে ১টি ও গনপিটুনিতে ১টি বাঘ মারা যায়। একই সালে বনরক্ষীরা আরও একটি বাঘের চামড়া উদ্ধার করে। ২০০০ সালে বার্ধক্যজনিত কারনে ১টি ও গনপিটুনিতে ১টি বাঘ মারা যায়। এ সময়ে বনবিভাগের কর্মীরা আরও একটি বাঘের চামড়া উদ্ধার করে। এছাড়া ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত সুন্দরবনে বাঘ মারা গেছে কমপক্ষে ৪৬টি। এর মধ্যে প্রাকৃতিক কারণে মরেছে ৮ বাঘ। বিভিন্ন সময় শিকারিদের হাতে বাঘ মরেছে ১৩টি। লোকালয়ে প্রবেশ করায় স্থানীয়দের হাতে মারা গেছে ৫ বাঘ। এ ছাড়া, ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরে মারা গেছে এক বাঘ। বিভিন্ন সময় দুর্বৃ্ত্তদের হাতে মারা যাওয়া ১৯টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করেছে বন বিভাগ। বন বিভাগ জানিয়েছে, গত ২০১৮সালের জরিপ থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৮টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সাল থেকে গত ১৩’বছরে পূর্ব সুন্দরবনে ১৬টি বাঘকে হত্যা করা হয়। এরমধ্যে ২০০১ সালের ২০ নভেম্বর শরনখোলার কচিখালিতে একটি মাদি বাঘের মৃতদেহ পাওয়া যায়, একই বছরের ২৬ ডিসেম্বর চাঁদপাই রেঞ্জে একটি পুরুষ বাঘের মৃত্যু হয়। ২০০২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর চাঁদপাই রেঞ্জের জোংড়া টহল ফাড়ির কাছে পাখিমারা খালের পাড়ে বনদস্যুদের সাথে বন্দুক যুদ্ধের সময় গুলিতে একটি বাঘের মৃত্যু হয়। ২০০৩ সালের ২৮ মে ধানসাগর এলাকায় গ্রামবাসীর পিটুনিতে নিহত হয় একটি পুরুষ বাঘ, একই সালের ১৯ অক্টোবর শরনখোলার চালিতাবুনিয়া গ্রামে গ্রামবাসী পিটিয়ে আরেকটি বাঘকে হত্যা করে এবং ২১ ডিসেম্বর আমুরবুনিয়া গ্রমে আরও একটি বাঘকে এলাকার লোকজন পিটিয়ে হত্যা করে। ২০০৪ সালের ২৫ আগষ্ট চরদোয়ানীর কাঠালতলা গ্রামের বেলায়েতের বাড়ী থেকে একটি বাঘের চামড়া উদ্ধার হয়। ২০০৪ সালে সুন্দরবনে বিজ্ঞান ভিত্তিক বাঘ শুমারী পরিচালনার অংশ হিসেবে পূর্ব সুন্দরবনে ‘জামতলার রাণী’ নাম দিয়ে একটি বাঘিনীর গলায় রেডিও কলার বেঁধে ছেড়ে দেয়া হয়। পরে ২০০৫ সালের ২৬ অক্টোবর বলেশ্বর নদীর পাড়ে গবেষনার কাজে ব্যবহৃত গলায় রেডিও কলার  পরিহিত জামতলার রানী নামের বাঘটির মৃত দেহ পাওয়া যায়। ২০০৬ সালের ২নভেম্বর শরনখোলার উত্তর সোনাতলা গ্রামের চোরা শিকারী নুরুজ্জামান শেখের বাড়ী থেকে একটি বাঘের চামড়া উদ্ধার হয়, ২০০৭ সালের ২’মে হাড়বাড়িয়া টহল ফাড়ির পুকুর পাড়ে একটি ও একই বছর ১৫ নভেম্বর ঘুর্নিঝড় সিডরে দুটি বাঘের মৃত্যু হয়। পরে ১৬ নভেম্বর ঢাংমারী ফরেষ্ট ষ্টেশনের খাগড়ামারী খালের পাশে একটি এবং করমজল এলাকায় বাঘ দুটির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০০৯ সালের ২জুলাই শরনখোলার দাসেরভারানী এলাকার দক্সিণ রাজাপুর গ্রামে এলাকাবাসী পিটিয়ে ১টি স্ত্রী বাঘকে হত্যা করে। সর্বশেষ ২০১১ সালের ১৬ ফেব্র“য়ারী শরনখোলা উপজেলার পশ্চিম খাদা গ্রামের একটি পরিত্যক্ত বাড়ী থেকে তিন পাচারকারীসহ তিনটি বাঘের চামড়াসহ হাড়গোড় উদ্ধার করে বনবিভাগের কর্মীরা।

একই সময়ে পশ্চিম সূন্দরবন বিভাগে ১৮টি বাঘের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগরের লোকালয়ে এলে গ্রামবাসীর পিটুনিতে ৩টি বাঘের মৃত্যু হয়।২০০৯ সালের ২জুলাই সাতক্ষীরার শ্যামনগরের খলিসাবুনিয়া গ্রামে পিটিয়ে ১টি বাঘ হত্যার ঘটনা ঘটে। ২০০৮ সালের ২০ জুন রাতে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সুন্দরবন সংলগ্ন কদমতলা গ্রামে ঢুকে একটি বাঘ হামলা চালিয়ে তিন ব্যক্তিকে নিহত করে। জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে পুরুষ বাঘটিকে পিটিয়ে হত্যার পর গলায় ফাঁস লাগিয়ে গাছে ঝুলিযে রাখে। ২০০৭ সালের ১৯ডিসেম্বর সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান ফরেষ্ট অফিসের নিকটবর্তী লোকালয়ে এসে জনতার পিটুনিতে প্রাণ হারায় একটি বাঘিনী। একই বছরের ১০ নভেম্বর একই ফরেষ্ট অফিসের নিকটবর্তী ভ্রমরখোলা নামক স্থান থেকে বনকর্মীরা একটি বাঘের মৃতদেহ উদ্ধার করে।এ ছাড়া ২০০৫ সালের ২৮ আগস্ট সাতক্ষীরা রেঞ্জের সন্নাসীর চর নামক স্থান থেকে চামড়া ছোলা অবস্থায় একটি বাঘের মৃত দেহ উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ২৮ নবেম্বর খুলনা রেঞ্জের বানিয়াখালী এলাকা থেকে বন কর্মীরা প্রায় আড়াই ফুট উঁচু ও ৭ ফুট লম্বা একটি মৃত বাঘ উদ্ধার করে।২০০৩ সালের ২২মার্চ খুলনা রেঞ্জের কয়রা থানার জোড় শিং গ্রামে ঢুকে গণপ্রহারে একটি বাঘ মারা যায়।২০০২ সালের ১২ জুন সাতক্ষীরা রেঞ্জের হরিনগর এলাকার লোকলয়ে এসে একটি বাঘ বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে প্রাণ হারায়। ২০০২সালের ১১জানুয়ারী সাতক্ষীরা রেঞ্জের শ্যামনগর গ্রামে জনতার পিটুনি ও ধারালো অস্ত্রাঘাতে একটি বাঘের মৃত্যু হয়।বাঘ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এভাবে বাঘের মৃত্যু হওয়ায় প্রানী জগতের মধ্যে বাঘই সবচেয়ে অরক্ষিত। এর সংখ্যা ক্রমশ কমছে। এভাবে চলতে থাকলে অদুর ভবিষ্যতে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলে আশংকা করেছেন।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের ডিএফও আবু নাসের মোহাম্মদ মহসীণ জানান, বনবিভাগের প্রয়োজনীয় জনবল, উপকরনসহ আর্থিক বাজেটের ঘাটতির কারনে সুন্দরবনের বাঘসহ বন্য প্রানীকে সঠিকভাবে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এলাকাবাসীর মধ্যে সচেতনতা না থাকায় বাঘকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি দাতা সংস্থার অর্থায়নে সুন্দরবনের বাঘ, হরিনসহ মূল্যবান প্রানী রক্ষায় বিশেষ টিম গঠন করে সুন্দরবনে বনরক্ষীদের টহল বাড়ানো হয়েছেন। যে কারনে বর্তমানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বনে চোরাশিকারিদের আনাগোনা অনেক কমে গেছে। করোনার কারণেও অনেকদিন সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল।এর ফলে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি স্বাবাবিকভাবেই বেড়ে উঠেছে। ইতিমধ্যেই টহল টিম বেশ কয়েকবার বাঘ দেখেছে। আমাদের জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতি বছর ১জুলাই থেকে ৩১আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ নিষেধ থাকায় বন্যপ্রাণীর আশানুরূপ বিকাশ ঘটেছে। এসব নানা কারণে ২০২৫সালের জুলাইয়ে শেষ হওয়া এবারের জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করেন এই বন কর্মকর্তা। ##

Tag :
লেখক তথ্য সম্পর্কে

Dainik adhumati

জনপ্রিয়

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক একীভূতকরণের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন, ষড়যন্ত্রমূলক অপতৎপরতা রুখে দাড়ানোর আহবান

আজ ২৯জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস :

৪৩বছরে ৭৮বাঘ হত্যা, সুন্দরবনে আজও নিরাপদ হয়নি বাঘের আবাসস্থল

প্রকাশিত সময় : ০৮:৪৬:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ জুলাই ২০২৩

####

 

আজ ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস। বাঘ রয়েছে বিশ্বের এমন ১৩টি দেশ বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালেশিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম ও রাশিয়ায় প্রতি বছর এ দিনটি পালিত হয়ে আসছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রধান আবাসস্থল সুন্দরবন হলেও এদেরকে সুরক্ষা ও আবাসস্থল নিরাপদ করা আজও সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন দেশের বাঘ বাঁচাতে নানা উদ্যোগে নিলেও সুন্দরবনে বাঘের মৃত্যু আশংকাজনকহারে বেড়েছে। একই সাথে সুন্দরবন থেকে পাচারও থেমে নেই। ১৯৮০ সাল থেকে ২০২৩ জুলাই পর্যন্ত গত ৪৩’বছরে সুন্দরবন ও সংলগ্ন এলাকায় শিকারীদের হানা, গ্রামবাসীর পিটুনী ও প্রাকৃতিক দূর্যোগে ৭৯টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে।

প্রানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা প্রতিনিয়ত সুন্দরবনের এ মহামূল্যবান সম্পদ বাঘের মৃত্যুর জন্য ৫’কারনকে চিহ্নিত করেছেন। তারা বলছেন, শিকারীদের জালে আটকে, বনদস্যুদের গুলিতে, প্রাকৃতিক ঝড়-জলোচ্ছ¡াস, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষের মধ্যে অজ্ঞতা ও সচেনতার অভাবের কারনে বনত্যাগী এসব রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আর বনে ফেরা হয় না। বন সংলগ্ন লোকালয়েই ঘটছে তাদের মর্মান্তিক মৃত্যু। সুন্দরবন বিভাগের লোকবল ও প্রয়োজণীয় উপকরন সংকটের কারনে বাঘ সংরক্ষনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন ও নিরাপত্ত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রতিনিয়িত বাঘের মৃত্যু ঘটছে। ফলে সুন্দরবনের বাঘের স্বাভাবিক বংশ বৃদ্ধি,আবাসস্থলের নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব হুমকিতে রয়েছে।  

সুন্দরবন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের মোট ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দুটি র্পূব সুন্দরবন ও পশ্চিম সুন্দরবন নামে বিভাগে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে শরণখোলা ও চাঁদপাই এবং পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগে খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ অবস্থিত। এছাড়া ১৭টি ষ্টেশন ও ৭২টি টহল ফাঁড়ি রয়েছে। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বাগেরহাটে ও পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগের সদর দপ্তর খূলনায় অবস্থিত। এ দুই বিভাগে মোট ১’হাজার ১’শ ৭১জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। সুন্দরবনে ২০০৪ সালের জরিপ অনুসারে সুন্দরবনে বাঘ ছিল ৪৪০টি। ২০১৮ সালের জরিপে তা কমে হয়েছে ১১৪টি। প্রতিনিয়ত এই বাঘ মৃত্যুর শিকারে পরিনত হচ্ছে। তারপরেও বন বিভাগ ২০২২সাল থেকে চলমান জরিপে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রত্যাশা করছেন।

বনবিভাগের তথ্যে জানা গেছে, ১৯৮০ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে শিকারীদের হানা, গ্রামবাসীর পিটুনী ও প্রাকৃতিক দূর্যোগসহ বিভিন্ন কারনে ৭৯টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে ১৯৮০ থেকে ২০০০সাল পর্যন্ত ২০বছরে ৩৩টি এবং ২০০১ সাল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ২৩’বছরে ৪৬টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। বনবিভাগ সূত্রে আরও জানা গেছে, ১৯৮২ সালে চাঁদপাই রেঞ্জের গেওয়া অপারেশন এলাকায় থেকে ১টি মৃত বাঘ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ১৯৮৩ সালে  ঢাংমারী এলাকা থেকে ১টি, কাশিয়াবাদ এলাকায় ১টি ও বুড়িগোয়ালীনি এলাকা থেকে ১টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করা হয়। ১৯৮৬ সালে কাশিয়াবাদ ষ্টেশন এলাকা থেকে ১টি ও কদমতলা এলাকা থেকে ১টি, ১৯৮৭ সালে বানিয়াখালি ষ্টেশন এলাকা থেকে ১টি মৃত বাঘ উদ্ধার করে বনকর্মীরা। ১৯৮৮ সালে ঢাংমারী ষ্টেশন এলাকায় ১টি, ১৯৮৯ সালে বানিয়াখালি ষ্টেশন এলাকা থেকে ১টি মৃত বাঘ উদ্ধার হয়। এ বাঘগুলো বিভিন্ন সময়ে শিকারীদের গুলিতে মারা পড়ে। সূত্র মতে, ১৯৯০  সালে চাঁদপাই এলাকায় ১টি ও কাটাখালি এলাকায় ১টি বাঘ জনতার বেপরোয়া পিটুনিতে নিহত হয়। গত ৩১ বছরের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম ঘটে। ১৯৯১ সালে গনপিটুনিতে ১টি ও শিকারীদের গুলিতে আরও ৩টি বাঘ প্রান হারায়। ১৯৯২ সালে একটি মৃত বাঘের চামড়া উদ্ধার করে বনরক্ষীরা। ১৯৯৪ সালে ২টি, ১৯৯৬ সালে ৫টি এবং ১৯৯৭ সালে ৬টি বাঘ সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় প্রবেশ করলে গ্রামবাসীর গনপিটুনিতে নিহত হয়। ১৯৯৮ সালে বনবিভাগের কর্মীরা ২টি বাঘের চামড়া উ্দ্ধার করে। ১৯৯৯ সালে শিকারীর পাতা ফাঁদে পড়ে ১টি, শিকারীর গুলিতে ১টি ও গনপিটুনিতে ১টি বাঘ মারা যায়। একই সালে বনরক্ষীরা আরও একটি বাঘের চামড়া উদ্ধার করে। ২০০০ সালে বার্ধক্যজনিত কারনে ১টি ও গনপিটুনিতে ১টি বাঘ মারা যায়। এ সময়ে বনবিভাগের কর্মীরা আরও একটি বাঘের চামড়া উদ্ধার করে। এছাড়া ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত সুন্দরবনে বাঘ মারা গেছে কমপক্ষে ৪৬টি। এর মধ্যে প্রাকৃতিক কারণে মরেছে ৮ বাঘ। বিভিন্ন সময় শিকারিদের হাতে বাঘ মরেছে ১৩টি। লোকালয়ে প্রবেশ করায় স্থানীয়দের হাতে মারা গেছে ৫ বাঘ। এ ছাড়া, ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরে মারা গেছে এক বাঘ। বিভিন্ন সময় দুর্বৃ্ত্তদের হাতে মারা যাওয়া ১৯টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করেছে বন বিভাগ। বন বিভাগ জানিয়েছে, গত ২০১৮সালের জরিপ থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৮টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সাল থেকে গত ১৩’বছরে পূর্ব সুন্দরবনে ১৬টি বাঘকে হত্যা করা হয়। এরমধ্যে ২০০১ সালের ২০ নভেম্বর শরনখোলার কচিখালিতে একটি মাদি বাঘের মৃতদেহ পাওয়া যায়, একই বছরের ২৬ ডিসেম্বর চাঁদপাই রেঞ্জে একটি পুরুষ বাঘের মৃত্যু হয়। ২০০২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর চাঁদপাই রেঞ্জের জোংড়া টহল ফাড়ির কাছে পাখিমারা খালের পাড়ে বনদস্যুদের সাথে বন্দুক যুদ্ধের সময় গুলিতে একটি বাঘের মৃত্যু হয়। ২০০৩ সালের ২৮ মে ধানসাগর এলাকায় গ্রামবাসীর পিটুনিতে নিহত হয় একটি পুরুষ বাঘ, একই সালের ১৯ অক্টোবর শরনখোলার চালিতাবুনিয়া গ্রামে গ্রামবাসী পিটিয়ে আরেকটি বাঘকে হত্যা করে এবং ২১ ডিসেম্বর আমুরবুনিয়া গ্রমে আরও একটি বাঘকে এলাকার লোকজন পিটিয়ে হত্যা করে। ২০০৪ সালের ২৫ আগষ্ট চরদোয়ানীর কাঠালতলা গ্রামের বেলায়েতের বাড়ী থেকে একটি বাঘের চামড়া উদ্ধার হয়। ২০০৪ সালে সুন্দরবনে বিজ্ঞান ভিত্তিক বাঘ শুমারী পরিচালনার অংশ হিসেবে পূর্ব সুন্দরবনে ‘জামতলার রাণী’ নাম দিয়ে একটি বাঘিনীর গলায় রেডিও কলার বেঁধে ছেড়ে দেয়া হয়। পরে ২০০৫ সালের ২৬ অক্টোবর বলেশ্বর নদীর পাড়ে গবেষনার কাজে ব্যবহৃত গলায় রেডিও কলার  পরিহিত জামতলার রানী নামের বাঘটির মৃত দেহ পাওয়া যায়। ২০০৬ সালের ২নভেম্বর শরনখোলার উত্তর সোনাতলা গ্রামের চোরা শিকারী নুরুজ্জামান শেখের বাড়ী থেকে একটি বাঘের চামড়া উদ্ধার হয়, ২০০৭ সালের ২’মে হাড়বাড়িয়া টহল ফাড়ির পুকুর পাড়ে একটি ও একই বছর ১৫ নভেম্বর ঘুর্নিঝড় সিডরে দুটি বাঘের মৃত্যু হয়। পরে ১৬ নভেম্বর ঢাংমারী ফরেষ্ট ষ্টেশনের খাগড়ামারী খালের পাশে একটি এবং করমজল এলাকায় বাঘ দুটির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০০৯ সালের ২জুলাই শরনখোলার দাসেরভারানী এলাকার দক্সিণ রাজাপুর গ্রামে এলাকাবাসী পিটিয়ে ১টি স্ত্রী বাঘকে হত্যা করে। সর্বশেষ ২০১১ সালের ১৬ ফেব্র“য়ারী শরনখোলা উপজেলার পশ্চিম খাদা গ্রামের একটি পরিত্যক্ত বাড়ী থেকে তিন পাচারকারীসহ তিনটি বাঘের চামড়াসহ হাড়গোড় উদ্ধার করে বনবিভাগের কর্মীরা।

একই সময়ে পশ্চিম সূন্দরবন বিভাগে ১৮টি বাঘের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগরের লোকালয়ে এলে গ্রামবাসীর পিটুনিতে ৩টি বাঘের মৃত্যু হয়।২০০৯ সালের ২জুলাই সাতক্ষীরার শ্যামনগরের খলিসাবুনিয়া গ্রামে পিটিয়ে ১টি বাঘ হত্যার ঘটনা ঘটে। ২০০৮ সালের ২০ জুন রাতে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সুন্দরবন সংলগ্ন কদমতলা গ্রামে ঢুকে একটি বাঘ হামলা চালিয়ে তিন ব্যক্তিকে নিহত করে। জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে পুরুষ বাঘটিকে পিটিয়ে হত্যার পর গলায় ফাঁস লাগিয়ে গাছে ঝুলিযে রাখে। ২০০৭ সালের ১৯ডিসেম্বর সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান ফরেষ্ট অফিসের নিকটবর্তী লোকালয়ে এসে জনতার পিটুনিতে প্রাণ হারায় একটি বাঘিনী। একই বছরের ১০ নভেম্বর একই ফরেষ্ট অফিসের নিকটবর্তী ভ্রমরখোলা নামক স্থান থেকে বনকর্মীরা একটি বাঘের মৃতদেহ উদ্ধার করে।এ ছাড়া ২০০৫ সালের ২৮ আগস্ট সাতক্ষীরা রেঞ্জের সন্নাসীর চর নামক স্থান থেকে চামড়া ছোলা অবস্থায় একটি বাঘের মৃত দেহ উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ২৮ নবেম্বর খুলনা রেঞ্জের বানিয়াখালী এলাকা থেকে বন কর্মীরা প্রায় আড়াই ফুট উঁচু ও ৭ ফুট লম্বা একটি মৃত বাঘ উদ্ধার করে।২০০৩ সালের ২২মার্চ খুলনা রেঞ্জের কয়রা থানার জোড় শিং গ্রামে ঢুকে গণপ্রহারে একটি বাঘ মারা যায়।২০০২ সালের ১২ জুন সাতক্ষীরা রেঞ্জের হরিনগর এলাকার লোকলয়ে এসে একটি বাঘ বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে প্রাণ হারায়। ২০০২সালের ১১জানুয়ারী সাতক্ষীরা রেঞ্জের শ্যামনগর গ্রামে জনতার পিটুনি ও ধারালো অস্ত্রাঘাতে একটি বাঘের মৃত্যু হয়।বাঘ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এভাবে বাঘের মৃত্যু হওয়ায় প্রানী জগতের মধ্যে বাঘই সবচেয়ে অরক্ষিত। এর সংখ্যা ক্রমশ কমছে। এভাবে চলতে থাকলে অদুর ভবিষ্যতে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলে আশংকা করেছেন।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের ডিএফও আবু নাসের মোহাম্মদ মহসীণ জানান, বনবিভাগের প্রয়োজনীয় জনবল, উপকরনসহ আর্থিক বাজেটের ঘাটতির কারনে সুন্দরবনের বাঘসহ বন্য প্রানীকে সঠিকভাবে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এলাকাবাসীর মধ্যে সচেতনতা না থাকায় বাঘকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি দাতা সংস্থার অর্থায়নে সুন্দরবনের বাঘ, হরিনসহ মূল্যবান প্রানী রক্ষায় বিশেষ টিম গঠন করে সুন্দরবনে বনরক্ষীদের টহল বাড়ানো হয়েছেন। যে কারনে বর্তমানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বনে চোরাশিকারিদের আনাগোনা অনেক কমে গেছে। করোনার কারণেও অনেকদিন সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল।এর ফলে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি স্বাবাবিকভাবেই বেড়ে উঠেছে। ইতিমধ্যেই টহল টিম বেশ কয়েকবার বাঘ দেখেছে। আমাদের জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতি বছর ১জুলাই থেকে ৩১আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ নিষেধ থাকায় বন্যপ্রাণীর আশানুরূপ বিকাশ ঘটেছে। এসব নানা কারণে ২০২৫সালের জুলাইয়ে শেষ হওয়া এবারের জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করেন এই বন কর্মকর্তা। ##