ঢাকা ০৪:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদের শিরোনাম :
আইসিসিবিতে তিন দিনের কার এক্সপো, থাকছে আধুনিক হাইব্রিড গাড়িও যশোর শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসিতে খুলনার ৬টিসহ ১৬ প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেল নীলফামারীতে দাদীর এইচএসসি পাস, নাতনির চোখে অনুপ্রেরণা ক্রেতাশূন্য ঢাকার শপিংমল, লোকসানে দিশেহারা ব্যবসায়ীরা পূর্বাচলে অবৈধ আবাসন প্রকল্প চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি আইসিসিবিতে গাড়ির বাজারে আট লাখ থেকে ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকার গাড়ি দুই বিভাগের ১৬ জেলায় ছড়িয়ে পড়ুক মানবতার বার্তা: ইমদাদুল হক মিলন আইসিসিবিতে আট সপ্তাহের সংগীত উৎসব, সঙ্গে মোগল খাবারের আয়োজন উলিপুরে এক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে ভাওয়াইয়া পরিষদের ভবন ঢাকার ফুটপাত ঘিরে দখল বাণিজ্যে বছরে ৩ হাজার কোটি টাকা, ভাগ পান কারা?

নীলফামারীতে দাদীর এইচএসসি পাস, নাতনির চোখে অনুপ্রেরণা

বয়স তো কেবলই একটা সংখ্যা মাত্র’—এই প্রবাদটিকে বাস্তব প্রমাণ করে ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন নীলফামারীর ডিমলার শেফালী বেগম। দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি, সংসারের হাজারো ব্যস্ততা আর প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে তাঁর এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প কেবল একটি পরীক্ষার সার্টিফিকেট অর্জনের নয়; এটি হার না মানা অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য ইতিহাস। আর দাদীর এই অভাবনীয় সাফল্য এখন অনুপ্রেরণার বড় উৎস হয়ে উঠেছে তাঁর চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া নাতনি শারাফি রাজের কাছেও।
দাদীর এই সাফল্যে গর্বিত চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাতনি শারাফি রাজ বলে, “আমার দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ৫২ বছর বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন—এতে আমি ভীষণ খুশি ও গর্বিত। দাদির এই সাফল্য দেখে আমিও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, মন দিয়ে চেষ্টা করলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।”
গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী শেফালী বেগমের শিক্ষাজীবনের শুরুটা বেশ সম্ভাবনাময় হলেও ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর নেমে আসে চরম পারিবারিক সংকট। ফলে বাধ্য হয়েই বই-খাতা রেখে কাঁধে তুলে নিতে হয় সংসারের জোয়াল। সময়ের স্রোতে স্বামী, সংসার ও তিন সন্তানের মা হয়ে জীবন যখন ব্যস্ততার আবর্তে বন্দি, তখন নিজের পড়াশোনার স্বপ্নটি চাপা পড়ে যায় পেছনের সারিতে।
তবে মনের গহীনে শিক্ষার প্রতি যে আগুন জ্বেলেছিল তা নেভেনি কখনো। পরবর্তী সময়ে ভাগ্নি ও নিজের সন্তানদের পড়াশোনা দেখে নিজের ভেতরের সুপ্ত বাসনা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। স্বামী ও তিন সন্তানের অকুণ্ঠ সমর্থন আর উৎসাহে দীর্ঘ বিরতির পর বই হাতে তুলে নেন তিনি। বয়সের ব্যবধান আর সংসারের কাজের ফাঁকে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে অবশেষে অর্জন করেন এই দারুণ সাফল্য।
শেফালী বেগমের এই অর্জনে সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত তাঁর পরিবার। তাঁর বড় ছেলে আব্দুর রাজ শাফি দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনফরমেশন টেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর করছেন এবং মেয়ে মাখসূরা খানম নাজমুন পড়াশোনা করছেন রংপুর সরকারি কলেজে। সন্তানদের সুশিক্ষিত করার নেপথ্যেও ছিল মায়ের এই শিক্ষানুরাগী মন।

গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রভাষক আব্দুল মান্নান বলেন, শেফালী বেগমের এই সাফল্য সমাজের জন্য একটি শক্তিশালী ইতিবাচক বার্তা। নিয়মিত অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল থাকলে জীবনের যেকোনো বয়সেই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত শেফালী বেগম জানান, “ছোটবেলায় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলেও নিজের ভেতরের জেদটা মরে যায়নি। স্বামী ও সন্তানদের সহযোগিতায় আজ এইচএসসি পাস করে মনে হচ্ছে জীবনের একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হলো। আমি এখানেই থেমে থাকতে চাই না, সুযোগ পেলে উচ্চশিক্ষাও চালিয়ে যেতে চাই।”
শেফালী বেগমের স্বামী মকছেদুল আলম বলেন, “শেফালী পরিবারের জন্য নিজের অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করেছে। দীর্ঘদিন পর সে নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। ভবিষ্যতেও তাঁর পড়ার পথে আমরা সবাই পাশে থাকব।”
শেফালী বেগমের এই জীবনযুদ্ধ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পরিস্থিতি হয়তো স্বপ্নের পথ সাময়িকভাবে থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু অদম্য ইচ্ছা আর দৃঢ় সংকল্প থাকলে সেই স্বপ্ন ঠিকই বাস্তবে রূপ নেয়। সমাজে যারা বয়সের অজুহাতে থমকে যান, শেফালী বেগম তাঁদের জন্য এক জ্বলন্ত দীপ্তিমান দৃষ্টান্ত।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

danik madhumati

আইসিসিবিতে তিন দিনের কার এক্সপো, থাকছে আধুনিক হাইব্রিড গাড়িও

নীলফামারীতে দাদীর এইচএসসি পাস, নাতনির চোখে অনুপ্রেরণা

আপডেটের সময় : ০৩:৪৪:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

বয়স তো কেবলই একটা সংখ্যা মাত্র’—এই প্রবাদটিকে বাস্তব প্রমাণ করে ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন নীলফামারীর ডিমলার শেফালী বেগম। দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি, সংসারের হাজারো ব্যস্ততা আর প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে তাঁর এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প কেবল একটি পরীক্ষার সার্টিফিকেট অর্জনের নয়; এটি হার না মানা অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য ইতিহাস। আর দাদীর এই অভাবনীয় সাফল্য এখন অনুপ্রেরণার বড় উৎস হয়ে উঠেছে তাঁর চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া নাতনি শারাফি রাজের কাছেও।
দাদীর এই সাফল্যে গর্বিত চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাতনি শারাফি রাজ বলে, “আমার দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ৫২ বছর বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন—এতে আমি ভীষণ খুশি ও গর্বিত। দাদির এই সাফল্য দেখে আমিও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, মন দিয়ে চেষ্টা করলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।”
গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী শেফালী বেগমের শিক্ষাজীবনের শুরুটা বেশ সম্ভাবনাময় হলেও ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর নেমে আসে চরম পারিবারিক সংকট। ফলে বাধ্য হয়েই বই-খাতা রেখে কাঁধে তুলে নিতে হয় সংসারের জোয়াল। সময়ের স্রোতে স্বামী, সংসার ও তিন সন্তানের মা হয়ে জীবন যখন ব্যস্ততার আবর্তে বন্দি, তখন নিজের পড়াশোনার স্বপ্নটি চাপা পড়ে যায় পেছনের সারিতে।
তবে মনের গহীনে শিক্ষার প্রতি যে আগুন জ্বেলেছিল তা নেভেনি কখনো। পরবর্তী সময়ে ভাগ্নি ও নিজের সন্তানদের পড়াশোনা দেখে নিজের ভেতরের সুপ্ত বাসনা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। স্বামী ও তিন সন্তানের অকুণ্ঠ সমর্থন আর উৎসাহে দীর্ঘ বিরতির পর বই হাতে তুলে নেন তিনি। বয়সের ব্যবধান আর সংসারের কাজের ফাঁকে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে অবশেষে অর্জন করেন এই দারুণ সাফল্য।
শেফালী বেগমের এই অর্জনে সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত তাঁর পরিবার। তাঁর বড় ছেলে আব্দুর রাজ শাফি দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনফরমেশন টেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর করছেন এবং মেয়ে মাখসূরা খানম নাজমুন পড়াশোনা করছেন রংপুর সরকারি কলেজে। সন্তানদের সুশিক্ষিত করার নেপথ্যেও ছিল মায়ের এই শিক্ষানুরাগী মন।

গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রভাষক আব্দুল মান্নান বলেন, শেফালী বেগমের এই সাফল্য সমাজের জন্য একটি শক্তিশালী ইতিবাচক বার্তা। নিয়মিত অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল থাকলে জীবনের যেকোনো বয়সেই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত শেফালী বেগম জানান, “ছোটবেলায় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলেও নিজের ভেতরের জেদটা মরে যায়নি। স্বামী ও সন্তানদের সহযোগিতায় আজ এইচএসসি পাস করে মনে হচ্ছে জীবনের একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হলো। আমি এখানেই থেমে থাকতে চাই না, সুযোগ পেলে উচ্চশিক্ষাও চালিয়ে যেতে চাই।”
শেফালী বেগমের স্বামী মকছেদুল আলম বলেন, “শেফালী পরিবারের জন্য নিজের অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করেছে। দীর্ঘদিন পর সে নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। ভবিষ্যতেও তাঁর পড়ার পথে আমরা সবাই পাশে থাকব।”
শেফালী বেগমের এই জীবনযুদ্ধ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পরিস্থিতি হয়তো স্বপ্নের পথ সাময়িকভাবে থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু অদম্য ইচ্ছা আর দৃঢ় সংকল্প থাকলে সেই স্বপ্ন ঠিকই বাস্তবে রূপ নেয়। সমাজে যারা বয়সের অজুহাতে থমকে যান, শেফালী বেগম তাঁদের জন্য এক জ্বলন্ত দীপ্তিমান দৃষ্টান্ত।