ঢাকা ০৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদের শিরোনাম :
এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপের শিরোপা উঠল ড্যাফোডিলের হাতে বাইন্যান্সের ইতিহাসে বড় সাইবার হামলা, জড়িত উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা? মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকারের কঠিন পরীক্ষা ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে হকারদের জীবিকা পুঠিয়ায় তিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস আইসিসিবিতে তিন দিনের কার এক্সপো, থাকছে আধুনিক হাইব্রিড গাড়িও যশোর শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসিতে খুলনার ৬টিসহ ১৬ প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেল নীলফামারীতে দাদীর এইচএসসি পাস, নাতনির চোখে অনুপ্রেরণা ক্রেতাশূন্য ঢাকার শপিংমল, লোকসানে দিশেহারা ব্যবসায়ীরা পূর্বাচলে অবৈধ আবাসন প্রকল্প চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি

ইউপি নির্বাচনে বদলে যাচ্ছে চিরচেনা রূপ, নজরদারিতে এআই থেকে ভোটারের তথ্য

  • বিশেষ প্রতিনিধি :
  • আপডেটের সময় : ০৫:৫৩:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫ সময়-দৃশ্য

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় এবার স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণার চিরচেনা রূপ বদলে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ২০১৬ সালের বিধিমালা রহিত করে ‘ইউনিয়ন পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সময়ের প্রয়োজনে নতুন এই বিধিমালায় কড়াকড়ি অনেক বাড়ানো হয়েছে। এবারের বিধিতে পোস্টার প্রদর্শন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মিছিল ও শোডাউনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। প্রচারে সব ধরনের যানবাহন ও আকাশযান ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রচারের ক্ষেত্রে শব্দের সীমা নির্ধারণ এবং নির্বাচনি ক্যাম্পের সংখ্যা সীমিত করা হয়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ গেজেটের মাধ্যমে নতুন আচরণবিধি জারি করা হয়। এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারে আধুনিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা; যা আর কেবল মাঠের প্রচারসামগ্রী বা জনসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল কনটেন্ট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) সরাসরি নতুন বিধিমালার আওতায় আনা হয়েছে। এতে সরকারি সুবিধা ব্যবহার, সরকারি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রচার, অনলাইন প্রচারণা, ভোটারের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি কনটেন্ট এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণকে কড়াকড়ি করা হয়েছে।

পোস্টার নিয়ন্ত্রণ নয়, পুরোপুরি নিষিদ্ধ: ২০১৬ সালের বিধিমালায় পোস্টার ব্যবহারের সুযোগ নির্দিষ্ট শর্তে নিয়ন্ত্রিত ছিল। নতুন বিধিমালায় পুরোনো পোস্টারনির্ভর প্রচারের সুযোগই রাখা হয়নি। ফলে কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক দল পোস্টার ব্যবহার করতে পারবে না। তবে ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রথমবারের মতো বিলবোর্ড ব্যবহারের পৃথক কাঠামো করা হয়েছে। নির্দিষ্ট মাপ ও ওয়ার্ডভিত্তিক সীমার মধ্যে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও তা জনসাধারণের চলাচল, যানবাহন বা পরিবেশের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে—সে ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে।

মিছিল-শোডাউনেও লাগাম: মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার সময় পাঁচজনের বেশি লোক নিয়ে যাওয়া এবং মিছিল বা শোডাউন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিলবোর্ড, প্রচারসামগ্রী, মাইক ও যানবাহনের ব্যবহারও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আনা হয়েছে। প্রচারের নামে ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, নৌযান, ট্রেন বা অন্য যানবাহন ব্যবহার করা যাবে না। প্রচারে আকাশযান ব্যবহার, দেয়াললিখন, যানবাহনে লিখন বা ছবি আঁকা, গেট-তোরণ ও আলোকসজ্জার মাধ্যমে প্রচারের পথও রুদ্ধ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান প্রার্থীর সর্বোচ্চ তিনটি এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য প্রার্থীর একটি করে নির্বাচনি ক্যাম্প বা কার্যালয় রাখার বিধান রয়েছে। তবে ক্যাম্পগুলোতে প্রচার বাড়াতে টেলিভিশন, এলইডি ডিসপ্লে, প্রজেক্টরসহ বিভিন্ন প্রদর্শন যন্ত্র ব্যবহারের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে।

ডিজিটাল প্রচারবিধির আওতায়: ২০১৬ সালের বিধিমালার সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্বাচনি প্রচারের এত বড় ক্ষেত্র ছিল না। ২০২৬ সালের বিধিমালায় সেই বাস্তবতাকে সরাসরি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রার্থী, নির্বাচনি এজেন্ট বা প্রচারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নির্বাচনি প্রচারের আগে ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্টের পরিচিতি, ই-মেইলসহ প্রয়োজনীয় তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে দিতে হবে। ফলে অনলাইন প্রচারের পরিচয় ও উৎস সম্পর্কে ইসির কাছে তথ্য থাকার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও যুক্ত হয়েছে নতুন বিধিনিষেধ। ভোটারকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে এআই দিয়ে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, অশ্লীল বা মানহানিকর বিষয়বস্তু তৈরি, প্রকাশ বা প্রচার করা যাবে না। কোনো ব্যক্তি বা প্রার্থীর ছবি বিকৃত করে চরিত্রহনন বা সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ভোটারের তথ্য সুরক্ষায় দেয়াল: নতুন আচরণবিধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—ভোটার বা তার পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এই নির্বাচনে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ভোটারকে লক্ষ্যভিত্তিকভাবে প্রভাবিত করার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, নতুন বিধিমালায় সেই জায়গাটিও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। ডিজিটাল প্রচারের সঙ্গে ভোটারের তথ্য সুরক্ষাকে একই আচরণবিধির আওতায় আনা হয়েছে।

শব্দদূষণ রোধে নতুন সীমা: স্থানীয় নির্বাচনের বহুল ব্যবহৃত মাইকিং সংস্কৃতিতেও এবার লাগাম টানা হয়েছে। প্রতি ওয়ার্ডে একটি মাইক্রোফোন বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। দুপুর ১২টার আগে এবং সূর্যাস্তের পর মাইক ব্যবহার করা যাবে না। শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে প্রচারের সময়, পরিমাণ এবং শব্দের মাত্রা, তিন ক্ষেত্রেই সীমা আরোপ করা হয়েছে। উপঢৌকন, প্রাতিষ্ঠানিক প্রচার—সবখানে বিধিনিষেধ: নির্বাচনি ক্যাম্পে ভোটারদের খাবার বা পানীয় পরিবেশন, উপহার বা বকশিশ দেওয়ার সুযোগ নেই। ব্যক্তিগত কুৎসা, আক্রমণাত্মক বক্তব্য এবং ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ ধর্মীয় উপাসনালয়, সরকারি কার্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচার চালানো যাবে না। সরকারি যানবাহন বা সরকারি প্রচারযন্ত্র ব্যবহার করেও নির্বাচনি প্রচার নিষিদ্ধ। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন, ঘোষণা, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বা ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে নির্বাচনি সুবিধা নেওয়ার সুযোগও সীমিত করা হয়েছে।

বিধি ভাঙলে প্রার্থিতা বাতিলের ঝুঁকি: নতুন বিধিমালায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তির কাঠামোতে কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের পাশাপাশি প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রাখা হয়েছে। কমিশনের কাছে কারও বিরুদ্ধে বিধি লঙ্ঘনের প্রতিবেদন আসার পর অভিযুক্ত প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট ওই ঘটনার ব্যাখ্যা করে কমিশনকে সন্তুষ্ট করতে না পারলে লিখিত আদেশে ওই ব্যক্তির প্রার্থিতা বাতিল হবে। ফলে এবারের আচরণবিধি শুধু নির্দেশনামূলক নথি নয়; প্রার্থীর নির্বাচনি অবস্থান সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলার মতো একটি প্রয়োগযোগ্য কাঠামোও তৈরি করেছে।

বড় চ্যালেঞ্জ: বিধি প্রয়োগ নিশ্চিত করা: নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলীর মতে, পোস্টারবিহীন নির্বাচনে পরিবেশদূষণ কমবে ঠিকই, কিন্তু অনলাইনে গুজব ও অপতথ্য ঠেকানো কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তিনি বলেন, ‘আচরণবিধি কাগজে থাকলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এমন বাস্তবতায় নতুন বিধিমালার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হতে পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি, ভিডিও ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করা। মাঠের পোস্টার বা মিছিল দৃশ্যমান হওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক সহজ; কিন্তু অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একটি কৃত্রিম ছবি বা ভিডিও দ্রুত বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।’

জামানত ফিরে পেতে শর্তের বেড়াজাল: নির্বাচনি ব্যয়সীমা ও জামানত বাড়ানো হয়েছে। তবে এটি আচরণবিধির অংশ নয়, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালার সংশোধন প্রক্রিয়া। নতুন বিধি অনুযায়ী, চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীর জামানত ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনি ব্যয়সীমা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া প্রার্থীকে জামানত ফেরত পেতে প্রদত্ত ভোটের অন্তত ১৫ শতাংশ পাওয়ার শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এগুলো আচরণবিধির ৭ সেপ্টেম্বরের গেজেটের অংশ নয়; আলাদা নির্বাচন বিধিমালার সংশোধন প্রক্রিয়ার বিষয়।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলীম বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে অর্থের মূল্যমান কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর যুক্তি রয়েছে। এ ছাড়া ‘ডামি’ প্রার্থীর প্রবণতা কমানোর সম্ভাব্য সুবিধা এতে রয়েছে। তবে বেশি জামানতের কারণে যোগ্য ও জনপ্রিয় অনেকের প্রার্থী হওয়া কঠিন হবে এবং নাগরিকের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ তাঁর মতে, নতুন কাঠামোর লক্ষ্য শুধু প্রার্থীর সংখ্যা কমানো নয়; একই সঙ্গে যোগ্য নাগরিকের অংশগ্রহণ, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশও বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ আচরণবিধির কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বিধি ভাঙার পর দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রমাণ সংগ্রহ, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর।

ইউপি নির্বাচনের নতুন আচরণবিধিতে শুধু প্রচারের উপকরণ বদলায়নি; প্রচারের ভাষা, মাধ্যম, পরিসর, ভোটারের তথ্যের ব্যবহার এবং প্রার্থীর দায়বদ্ধতার ধারণাকেও নতুন কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বিধির কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে এর মাঠপর্যায়ের প্রয়োগের ওপর। কারণ বিধি করলেই নির্বাচন পরিচালনার সমস্যা সমাধান হয় না; মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগ ও রাজনৈতিক অংশীজনদের আইন মানার সংস্কৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এআইনির্ভর অপতথ্য, গোপনে ভোটারের তথ্য সংগ্রহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ব্যয় এবং পরোক্ষভাবে সরকারি সুবিধা ব্যবহারের মতো বিষয় শনাক্ত করতে কমিশনের মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা কতটা বাড়ানো যায়-সেটিই হবে বড় পরীক্ষা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

danik madhumati

এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপের শিরোপা উঠল ড্যাফোডিলের হাতে

ইউপি নির্বাচনে বদলে যাচ্ছে চিরচেনা রূপ, নজরদারিতে এআই থেকে ভোটারের তথ্য

আপডেটের সময় : ০৫:৫৩:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় এবার স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণার চিরচেনা রূপ বদলে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ২০১৬ সালের বিধিমালা রহিত করে ‘ইউনিয়ন পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সময়ের প্রয়োজনে নতুন এই বিধিমালায় কড়াকড়ি অনেক বাড়ানো হয়েছে। এবারের বিধিতে পোস্টার প্রদর্শন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মিছিল ও শোডাউনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। প্রচারে সব ধরনের যানবাহন ও আকাশযান ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রচারের ক্ষেত্রে শব্দের সীমা নির্ধারণ এবং নির্বাচনি ক্যাম্পের সংখ্যা সীমিত করা হয়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ গেজেটের মাধ্যমে নতুন আচরণবিধি জারি করা হয়। এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারে আধুনিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা; যা আর কেবল মাঠের প্রচারসামগ্রী বা জনসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল কনটেন্ট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) সরাসরি নতুন বিধিমালার আওতায় আনা হয়েছে। এতে সরকারি সুবিধা ব্যবহার, সরকারি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রচার, অনলাইন প্রচারণা, ভোটারের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি কনটেন্ট এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণকে কড়াকড়ি করা হয়েছে।

পোস্টার নিয়ন্ত্রণ নয়, পুরোপুরি নিষিদ্ধ: ২০১৬ সালের বিধিমালায় পোস্টার ব্যবহারের সুযোগ নির্দিষ্ট শর্তে নিয়ন্ত্রিত ছিল। নতুন বিধিমালায় পুরোনো পোস্টারনির্ভর প্রচারের সুযোগই রাখা হয়নি। ফলে কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক দল পোস্টার ব্যবহার করতে পারবে না। তবে ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রথমবারের মতো বিলবোর্ড ব্যবহারের পৃথক কাঠামো করা হয়েছে। নির্দিষ্ট মাপ ও ওয়ার্ডভিত্তিক সীমার মধ্যে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও তা জনসাধারণের চলাচল, যানবাহন বা পরিবেশের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে—সে ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে।

মিছিল-শোডাউনেও লাগাম: মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার সময় পাঁচজনের বেশি লোক নিয়ে যাওয়া এবং মিছিল বা শোডাউন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিলবোর্ড, প্রচারসামগ্রী, মাইক ও যানবাহনের ব্যবহারও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আনা হয়েছে। প্রচারের নামে ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, নৌযান, ট্রেন বা অন্য যানবাহন ব্যবহার করা যাবে না। প্রচারে আকাশযান ব্যবহার, দেয়াললিখন, যানবাহনে লিখন বা ছবি আঁকা, গেট-তোরণ ও আলোকসজ্জার মাধ্যমে প্রচারের পথও রুদ্ধ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান প্রার্থীর সর্বোচ্চ তিনটি এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য প্রার্থীর একটি করে নির্বাচনি ক্যাম্প বা কার্যালয় রাখার বিধান রয়েছে। তবে ক্যাম্পগুলোতে প্রচার বাড়াতে টেলিভিশন, এলইডি ডিসপ্লে, প্রজেক্টরসহ বিভিন্ন প্রদর্শন যন্ত্র ব্যবহারের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে।

ডিজিটাল প্রচারবিধির আওতায়: ২০১৬ সালের বিধিমালার সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্বাচনি প্রচারের এত বড় ক্ষেত্র ছিল না। ২০২৬ সালের বিধিমালায় সেই বাস্তবতাকে সরাসরি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রার্থী, নির্বাচনি এজেন্ট বা প্রচারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নির্বাচনি প্রচারের আগে ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্টের পরিচিতি, ই-মেইলসহ প্রয়োজনীয় তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে দিতে হবে। ফলে অনলাইন প্রচারের পরিচয় ও উৎস সম্পর্কে ইসির কাছে তথ্য থাকার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও যুক্ত হয়েছে নতুন বিধিনিষেধ। ভোটারকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে এআই দিয়ে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, অশ্লীল বা মানহানিকর বিষয়বস্তু তৈরি, প্রকাশ বা প্রচার করা যাবে না। কোনো ব্যক্তি বা প্রার্থীর ছবি বিকৃত করে চরিত্রহনন বা সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ভোটারের তথ্য সুরক্ষায় দেয়াল: নতুন আচরণবিধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—ভোটার বা তার পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এই নির্বাচনে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ভোটারকে লক্ষ্যভিত্তিকভাবে প্রভাবিত করার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, নতুন বিধিমালায় সেই জায়গাটিও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। ডিজিটাল প্রচারের সঙ্গে ভোটারের তথ্য সুরক্ষাকে একই আচরণবিধির আওতায় আনা হয়েছে।

শব্দদূষণ রোধে নতুন সীমা: স্থানীয় নির্বাচনের বহুল ব্যবহৃত মাইকিং সংস্কৃতিতেও এবার লাগাম টানা হয়েছে। প্রতি ওয়ার্ডে একটি মাইক্রোফোন বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। দুপুর ১২টার আগে এবং সূর্যাস্তের পর মাইক ব্যবহার করা যাবে না। শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে প্রচারের সময়, পরিমাণ এবং শব্দের মাত্রা, তিন ক্ষেত্রেই সীমা আরোপ করা হয়েছে। উপঢৌকন, প্রাতিষ্ঠানিক প্রচার—সবখানে বিধিনিষেধ: নির্বাচনি ক্যাম্পে ভোটারদের খাবার বা পানীয় পরিবেশন, উপহার বা বকশিশ দেওয়ার সুযোগ নেই। ব্যক্তিগত কুৎসা, আক্রমণাত্মক বক্তব্য এবং ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ ধর্মীয় উপাসনালয়, সরকারি কার্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচার চালানো যাবে না। সরকারি যানবাহন বা সরকারি প্রচারযন্ত্র ব্যবহার করেও নির্বাচনি প্রচার নিষিদ্ধ। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন, ঘোষণা, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বা ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে নির্বাচনি সুবিধা নেওয়ার সুযোগও সীমিত করা হয়েছে।

বিধি ভাঙলে প্রার্থিতা বাতিলের ঝুঁকি: নতুন বিধিমালায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তির কাঠামোতে কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের পাশাপাশি প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রাখা হয়েছে। কমিশনের কাছে কারও বিরুদ্ধে বিধি লঙ্ঘনের প্রতিবেদন আসার পর অভিযুক্ত প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট ওই ঘটনার ব্যাখ্যা করে কমিশনকে সন্তুষ্ট করতে না পারলে লিখিত আদেশে ওই ব্যক্তির প্রার্থিতা বাতিল হবে। ফলে এবারের আচরণবিধি শুধু নির্দেশনামূলক নথি নয়; প্রার্থীর নির্বাচনি অবস্থান সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলার মতো একটি প্রয়োগযোগ্য কাঠামোও তৈরি করেছে।

বড় চ্যালেঞ্জ: বিধি প্রয়োগ নিশ্চিত করা: নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলীর মতে, পোস্টারবিহীন নির্বাচনে পরিবেশদূষণ কমবে ঠিকই, কিন্তু অনলাইনে গুজব ও অপতথ্য ঠেকানো কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তিনি বলেন, ‘আচরণবিধি কাগজে থাকলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এমন বাস্তবতায় নতুন বিধিমালার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হতে পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি, ভিডিও ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করা। মাঠের পোস্টার বা মিছিল দৃশ্যমান হওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক সহজ; কিন্তু অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একটি কৃত্রিম ছবি বা ভিডিও দ্রুত বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।’

জামানত ফিরে পেতে শর্তের বেড়াজাল: নির্বাচনি ব্যয়সীমা ও জামানত বাড়ানো হয়েছে। তবে এটি আচরণবিধির অংশ নয়, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালার সংশোধন প্রক্রিয়া। নতুন বিধি অনুযায়ী, চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীর জামানত ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনি ব্যয়সীমা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া প্রার্থীকে জামানত ফেরত পেতে প্রদত্ত ভোটের অন্তত ১৫ শতাংশ পাওয়ার শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এগুলো আচরণবিধির ৭ সেপ্টেম্বরের গেজেটের অংশ নয়; আলাদা নির্বাচন বিধিমালার সংশোধন প্রক্রিয়ার বিষয়।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলীম বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে অর্থের মূল্যমান কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর যুক্তি রয়েছে। এ ছাড়া ‘ডামি’ প্রার্থীর প্রবণতা কমানোর সম্ভাব্য সুবিধা এতে রয়েছে। তবে বেশি জামানতের কারণে যোগ্য ও জনপ্রিয় অনেকের প্রার্থী হওয়া কঠিন হবে এবং নাগরিকের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ তাঁর মতে, নতুন কাঠামোর লক্ষ্য শুধু প্রার্থীর সংখ্যা কমানো নয়; একই সঙ্গে যোগ্য নাগরিকের অংশগ্রহণ, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশও বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ আচরণবিধির কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বিধি ভাঙার পর দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রমাণ সংগ্রহ, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর।

ইউপি নির্বাচনের নতুন আচরণবিধিতে শুধু প্রচারের উপকরণ বদলায়নি; প্রচারের ভাষা, মাধ্যম, পরিসর, ভোটারের তথ্যের ব্যবহার এবং প্রার্থীর দায়বদ্ধতার ধারণাকেও নতুন কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বিধির কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে এর মাঠপর্যায়ের প্রয়োগের ওপর। কারণ বিধি করলেই নির্বাচন পরিচালনার সমস্যা সমাধান হয় না; মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগ ও রাজনৈতিক অংশীজনদের আইন মানার সংস্কৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এআইনির্ভর অপতথ্য, গোপনে ভোটারের তথ্য সংগ্রহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ব্যয় এবং পরোক্ষভাবে সরকারি সুবিধা ব্যবহারের মতো বিষয় শনাক্ত করতে কমিশনের মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা কতটা বাড়ানো যায়-সেটিই হবে বড় পরীক্ষা।