‘বাজারে সবকিছুর দাম বেশি। তার পরও সরকার রবিবার গভীর রাতে হঠাৎ করে এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে। এটি মোটেই ঠিক কাজ করেনি। কারণ এর প্রভাবে সস্তা আলুর দামও বেড়ে যাচ্ছে। প্রতি ট্রাকে পণ্য পরিবহনের ভাড়া ২-৩ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। তাহলে মানুষ খাবে কী? টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। দেশে হাহাকার পড়ে যাবে।’ রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি আলু ব্যবসায়ী মো. সবুজ ব্যাপারী এভাবেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় পরিবহন ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। ছয় মাসে তিনবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ট্রাকভাড়া ৫–৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে, যার প্রভাব সব পণ্যে পড়ছে। দাম বৃদ্ধিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু এই ব্যবসায়ীই নন, বিভিন্ন বাজারের আড়তদার, খুচরা ব্যবসায়ী, পরিবহন চালক, কৃষক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সবার একই অভিযোগ—সব পণ্যের বাজার এমনিতেই চড়া। এখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো। এতে বাজারে নৈরাজ্য তৈরি হবে। যে যার মতো দাম আদায় করবে। এপ্রিল থেকে তিনবার দাম বাড়ানো হলো। তাহলে আমরা খাব কী? তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বাধ্য হয়েই সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।
কারওয়ান বাজারে টিসিবি ভবনের কাছে কথা হয় প্রাইভেট কারের চালক আল-আমিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দেশে কী হলো যে এক লাফেই পেট্রল, অকটেন, ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়াল সরকার। এর আগেও গত জুনে দাম বাড়ায়। তার আগেও এপ্রিলে দাম বাড়ায়। এক বছর হয়নি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার। কিন্তু তিনবার তেলের দাম বাড়ানো হলো। এটা বেশি হয়ে গেছে। কী বলব! ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। কারণ আমাদের বেতন তো বাড়ে না। যারা কোটিপতি, শিল্পপতি, বড় বড় অফিসার তাদের কিছু যায় আসে না। তাদের বেতন বেশি। কিন্তু আমরা যারা ছোট চাকরি করি বা দিনমজুরির কাজ করি তাদের কী হবে? সরকারকে তা দেখা দরকার। তা না হলে দেশে হাহাকার পড়ে যাবে।’
বাংলাদেশ কাঁচামাল আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি মো. এমরান মাস্টার বলেন, অতিবৃষ্টি ও বর্ষার কারণে বর্তমানে সবজির দাম চড়া। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর দাম আরও বাড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি বলেন, ‘গত রবিবার গভীর রাতে তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। অনেকেই জানে না। কিন্তু গতকাল সোমবার থেকেই জানার পর ট্রাক ভাড়া বেড়ে গেছে। এর প্রভাব সবজির বাজারে পড়বে না? পড়াটাই স্বাভাবিক। কারণ তেলের দাম বাড়ানোর বাড়তি টাকা ট্রাক মালিক তো লোকসান করে পকেট থেকে দেবে না। এর প্রভাব ভোক্তাদের ঘাড়ে পড়বে। বাজারে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। যে যার মতো দাম আদায় করবে। তাই আমি একজন ভোক্তা হিসেবে বলব, সরকার মোটেই ঠিক কাজ করেনি। এখনো সময় আছে। তা বিবেচনা করা দরকার।’
যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিবহন খাতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। স্থানভেদে ট্রাকপ্রতি ভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা বলছেন। শুধু তা-ই নয়, গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা, কৃষি, মাছ ও পোলট্রি, শিল্প ও কারখানা, নির্মাণ খাত, খাদ্যপণ্য, বিদ্যুৎ ও জেনারেটর, কুরিয়ার ও ই-কমার্স, শিক্ষা ও চিকিৎসা, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বলে ভুক্তভোগীরা জানান।
উত্তরা এলাকার শেখ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সকালেই মোটরসাইকেলের তেল কিনতে যাই পেট্রলপাম্পে। লিটারে ২০ টাকা করে বেশি দিতে হলো। ১০ লিটারে বাড়তি ২০০ টাকা গেল। বাজারে গেলেও বিক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তেলের দাম সরকার বাড়িয়েছে। তাই কম দামে কোনো জিনিস পাবেন না।’
মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটের সয়াবিন তেল, আটা, ডালের পাইকারি ব্যবসায়ী মেসার্স সিদ্দিক এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘কোম্পানি থেকে আমাদের কাছে সব পণ্য পৌঁছে দেয়। গাড়ি ভাড়া আমাদের লাগে না। তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। তারা তো লোকসান করবে না। তাই বাড়তি দামের বোঝা ভোক্তাদের ঘাড়ে চড়বে।’
বিভিন্ন বাজারের খুচরা বিক্রেতারাও বলেন, সরকারের কারণেই দাম বাড়ে। আমাদের বদনাম শুনতে হয়। এ ব্যাপারে হাতিরপুল বাজারের মাসুদ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. মাসুদ বলেন, ‘কিছুদিন আগেই বিভিন্ন কোম্পানি আটা, সাবানসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। সরকার তা দেখে না। আবার তেলের দাম বাড়ানো হলো। আবার সব জিনিসের দাম বাড়ছে। তাতে সরকারের কী? আমাদের গালি শুনতে হবে। ভোক্তাদের পকেট থেকে টাকা যাবে।’ অন্যান্য বাজারের খুচরা বিক্রেতারাও একই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, আমরা সবাই ভোক্তা। বাড়তি দামের বোঝা আমাদের ঘাড়ে পড়ছে। শুধু বিক্রেতারা নয়, ভোক্তাদের মনেও ক্ষোভ দেখা গেছে।
সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বিএনপি সরকার ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এর পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকে। তার প্রভাবে দেশেও জ্বালানিসংকট দেখা দেয়। তাই বাধ্য হয়েই দেশে এই দাম বাড়ানো হয়েছে। এই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না।
৬ মাসে দাম বাড়ল তিনবার: জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ রবিবার রাতে জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, সোমবার থেকে এ দর কার্যকর হবে। নতুন দর অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, অকটেন ১৬৫ এবং পেট্রল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর আগেও এই সরকার দ্বিতীয়বারের মতো গত জুনে তিন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছিল। কেরোসিন ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৩৫ থেকে ১৪০ এবং অকটেন ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি করার ঘোষণা দেয়। তবে ডিজেল ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত ছিল।
তার আগেও সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাস পরই ১৮ এপ্রিল চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে অনেক বাড়ায়। তখন ভোক্তাপর্যায়ে ডিজেল ১০০ থেকে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রির ঘোষণা দেয়। নতুন দাম কার্যকর করায় ডিজেলের দাম লিটারে ৩৫ টাকা, অকটেন ৪৫, পেট্রল ৪৪ এবং কেরোসিন ৪৩ টাকা বেশি ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে। ছয় মাসে তিনবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো।
এভাবে দাম বাড়িয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান কত কমবে, তা জানতে জ্বালানি তেল ক্রয়-বিক্রয়কারী সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক সূত্রমতে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অনেক বেড়েছে। এ কারণে বেশি দামে তেল কিনে বিপিসিকে মাসে হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী শুধু ডিজেলেই বিপিসির লিটারপ্রতি প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছে। দৈনিক এ লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। তাই লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে।
সরকারের সামর্থ্যের সংকটের শিকার জ্বালানি খাত: ভোক্তাদের অধিকার রক্ষার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, সরকার এর আগে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। এরপর হয়তো গ্যাসের দামও বাড়াবে। এভাবে সবকিছুর দাম বাড়ানোয় মানুষের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। বিএনপি সরকার এই দাম হঠাৎ করে বাড়ায়নি। আগের সরকারের ধারাবাহিকতায় এর আগেও দুবার জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় ভোক্তাকে অভিঘাত থেকে রক্ষার নামে এভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে, যা আগেও হয়েছে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। এতে সংকট বেড়েছে। এ সরকারও ভর্তুকি কমাতে এ কাজ করছে। এতে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। সরকারের সামর্থ্যের সংকটের শিকার হচ্ছে জ্বালানি খাত।
বিশেষ প্রতিনিধি : 









