রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকাগুলোও এখন আর বায়ুদূষণের ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। নির্মাণকাজের ধুলাবালি, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, বর্জ্য পোড়ানো এবং আশপাশের এলাকার দূষিত বাতাস মিলিয়ে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও ধানমন্ডির মতো এলাকাতেও বাতাসের মান অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দূষণের এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বসবাস ও ব্যবসার জন্য আকর্ষণীয় এসব এলাকার পরিবেশগত সুবিধা কমে যেতে পারে।
গতকাল সন্ধ্যায় সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের সূচকে ঢাকার বায়ুমান ছিল ১৬৪, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত। একই সময়ে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল তৃতীয়। তালিকার প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল কুয়েত সিটি ও কলকাতা।
আইকিউএয়ারের স্থানীয় পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষণ রেকর্ড করা হয় আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) সংলগ্ন এলাকায়। সেখানে বায়ুমান সূচক ছিল ১৮৬।
দূষণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বারিধারা পার্ক রোড, যেখানে সূচক ছিল ১৬৮। বাড্ডার প্রগতি সরণি ও বেচারাম দেউড়িতে ১৬৭, বারিধারা লেকসাইড ও ধানমন্ডিতে ১৬১, গুলশান লেক পার্কে ১৬০, বনানীর ইস্টার্ন হাউজিংয়ে ১৫৬ এবং গুলশান-২-এর গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এলাকায় ১৫১ স্কোর পাওয়া যায়। অর্থাৎ এসব এলাকার সব কটিই ‘অস্বাস্থ্যকর’ বায়ুমানের মধ্যে ছিল।
বায়ুমান সূচকে ০ থেকে ৫০ স্কোরকে ‘ভালো’, ৫১ থেকে ১০০ ‘মাঝারি’ এবং ১০১ থেকে ১৫০ ‘সংবেদনশীল মানুষের জন্য অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে ধরা হয়। ১৫১ থেকে ২০০ স্কোরকে ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১ থেকে ৩০০ ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০০-এর বেশি স্কোরকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বছরের বেশির ভাগ সময়ই নির্মাণকাজ, সড়কের ধুলাবালি, যানবাহনের ধোঁয়া এবং বিভিন্ন মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে ঢাকার বায়ু দূষিত থাকে। এ দূষণ শুধু ঘনবসতিপূর্ণ বা নিম্নআয়ের এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই। রাজধানীর পরিকল্পিত ও অভিজাত এলাকাগুলোও এর প্রভাবের বাইরে থাকতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডির দূষণের ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎসের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী এলাকার দূষণও ভূমিকা রাখে। কড়াইল বস্তিতে মাটির চুলায় রান্না ও বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া গুলশান-বনানী এলাকায় পৌঁছাতে পারে। একইভাবে কামরাঙ্গীরচরের দূষিত বাতাস ধানমন্ডি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর প্রগতি সরণিতে চলমান খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণকাজ থেকে উৎপন্ন ধুলাবালি বারিধারার বায়ুর মান খারাপ করতে পারে।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, লেকসংলগ্ন অভিজাত এলাকাগুলোতে বায়ুদূষণ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কারণ রয়েছে। জলাশয়ের ওপরের বাতাসে আর্দ্রতা ও জলীয় বাষ্প বেশি থাকায় ধূলিকণা ও ধোঁয়ার কণা সহজে ছড়িয়ে যেতে পারে না। এগুলো জলীয় বাষ্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভারী হয়ে বাতাসে আটকে থাকে।
তিনি বলেন, শীতকালে তাপমাত্রার বিপরীতমুখী অবস্থার কারণেও দূষণ আটকে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়। লেকপারের ঠান্ডা বাতাস নিচে এবং অপেক্ষাকৃত উষ্ণ বাতাস ওপরে অবস্থান করায় এক ধরনের আবরণ তৈরি হয়। এতে যানবাহনের ধোঁয়া ও ধুলাবালি ওপরের দিকে উঠে ছড়িয়ে যেতে না পেরে নিচের স্তরে জমা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন বলেন, গুলশান ও বনানীর মতো এলাকায় সুউচ্চ ভবনের ঘনত্ব বায়ুদূষণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তার মতে, পাশাপাশি নির্মিত উঁচু ভবনগুলো বাতাসের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। বিজ্ঞানের ভাষায় এ পরিস্থিতিকে ‘আরবান ক্যানিয়ন এফেক্ট’ বলা হয়। যানবাহন ও আশপাশের বস্তি এলাকা থেকে নির্গত ধোঁয়া যখন এসব ভবনের মধ্যে আটকে যায়, তখন বাতাস তা সহজে সরিয়ে নিতে পারে না। ফলে দূষিত কণাগুলো ভূমির কাছাকাছি আটকে থেকে স্থানীয় বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

গুলশান ও বনানীর বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যক্তিগত গাড়ির ধোঁয়াকে উল্লেখ করেছেন গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত। তিনি বলেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ফিটনেসবিহীন ও অতিরিক্ত কালো ধোঁয়া নির্গতকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তার মতে, ঢাকার সড়কে এখনো বিপুলসংখ্যক ফিটনেসবিহীন ও কালো ধোঁয়া ছাড়ে এমন যানবাহন চলাচল করছে। এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যক্রমে দুর্নীতি কমানো প্রয়োজন।
অন্যদিকে নির্মাণকাজ থেকেও ব্যাপকভাবে ধুলাবালি ছড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। আইন ও বিধিমালায় এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ দুর্বল।
বনানী সোসাইটির সভাপতি শওকত আলী ভূঁইয়া (দিলন) বলেন, গুলশান-বনানীতে ব্যাপক নির্মাণকাজ চলছে। উন্নত দেশগুলোতে নির্মাণকাজের সময় ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে একাধিক স্তরের সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়। বাংলাদেশেও আইন রয়েছে, কিন্তু এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার।
তিনি আরও বলেন, কড়াইল বস্তির দূষণও আশপাশের এলাকার পরিবেশে প্রভাব ফেলছে। বস্তিবাসীর জীবনমান উন্নয়নে হাসপাতাল ও পরিচ্ছন্ন বাজারসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বর্জ্য পোড়ানো বন্ধে দুই সিটি করপোরেশনকে কার্যকর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
তার মতে, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিসহ পুরো রাজধানীর বায়ুর মান উন্নত করা সম্ভব।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ-১) সিদ্ধার্থ শংকর কুণ্ডু বলেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। এ বিষয়ে একটি কমিটিও কাজ করছে। কমিটির আসন্ন সভায় বিষয়গুলো বিস্তারিত পর্যালোচনা করে পরবর্তী নীতি ও করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
বিশেষ প্রতিনিধি : 


















