মিথ্যা ঘোষণায় বিভিন্ন ধরনের যৌন উত্তেজক পণ্য দেশে আমদানি করা হয়েছে। রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরের অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়া করে এসব পণ্য মজুত রেখে সারা দেশে বিক্রি করা হচ্ছে। ধনী পরিবারের সন্তানরা কিনছেন বেশি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তদন্ত প্রতিবেদন থেকে এসব জানা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হাতের কাছে যৌন উত্তেজক পণ্য পাওয়ায় অনেকে কিনছেন। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অনেকে এসব পণ্য সম্পর্কে সহজে ধারণা পাচ্ছেন। এনবিআরের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওষুধ বানানোর কাঁচামাল, জরুরি ওষুধ, প্রসাধনী, জুতা, শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি, হাসপাতালে ব্যবহৃত চিকিৎসাসামগ্রী, বিদেশি ফলসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানির মিথ্যা তথ্য দিয়ে যৌন উত্তেজক পণ্য আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে–সিলডেনাফিল (ভায়াগ্রা), টাডালাফিল (সিয়ালিস), ডিলডো, পিনাইল রিং, টপিকাল ক্রিম ও স্প্রে, লুবসহ বিভিন্ন ধরনের যৌন উত্তেজক ক্যাপসুল ও সিরাপ। বিশেষ করে ভায়াগ্রার কাঁচামাল ‘সিলডেনাফিল সাইট্রেট’ ও যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট বেশি আমদানি করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভারত ও চীন থেকে যৌন উত্তেজক পণ্য মিথ্যা ঘোষণায় বেশি আমদানি করা হয়েছে। গত জুলাই ও আগস্ট মাসে বিভিন্ন বন্দর দিয়ে আমদানিকালে যৌন উত্তেজক পণ্যের ৩৭টি চালান আটক করা হয়েছে। আটক পণ্যের দাম প্রায় ৭৮৫ কোটি টাকা। লোকবলের অভাবে এসব পণ্যের অনেক চালান আটক করা সম্ভব হয় না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের পর বছর এ অপকর্ম করলেও এর হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই আছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভাড়া করা লোক দিয়ে বন্দর থেকে পণ্য ছাড় করানো, মজুত করা, বিক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো কাজ করানো হচ্ছে। বিনিময়ে একবার কাজ করার জন্য তাদের ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। টাকার লেনদেন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হয়। অনেক সময় এসব লোক ধরা পড়লেও পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের অভাবে পার পেয়ে যান। অনেকে আটক থাকলেও তারা মূল হোতার খোঁজ দিতে পারেন না। কারণ এসব ব্যক্তি মূল হোতাকে চেনেনই না। কারও না কারও মাধ্যমে নির্দেশ পেয়ে কাজ করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো পণ্যের কার্টন, প্যাকেজিং বা প্যাকেট সন্দেহজনক মনে হলে তা আটক করা হলেও কে বা কারা চালান নিতে আসছে তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
তদন্তে দেখা যায়, মিথ্যা ঘোষণায় আসা যৌন উত্তেজক পণ্য বন্দর থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার পর ভাড়া করা পরিবহনে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কার বা কী পণ্য তা না জেনেই পরিবহনের চালক অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিয়ে থাকেন। অনেক সময় চালককে আটক করা হলেও তেমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তদন্তে দেখা গেছে, বিভিন্ন সময়ে যে বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে তার কাছে বিভাগীয় শহরের অভিজাত এলাকায় বাসা বা ফ্ল্যাট ভাড়া করে গোপনে এসব রাখা হয়েছে। অনেক সময় এসব বাসা বা ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে পণ্য জব্দ করার পর সেখানে গৃহপরিচারক হিসেবে যাদের পাওয়া গেছে, দেখা গেছে তারা এ বিষয়ে কিছু জানেন না। কেবল পণ্য গ্রহণ এবং কেউ এলে তাকে সরবরাহ করার কাজে রাখা হয়েছে।
তদন্তে দেখা যায়, এসব বাসা বা ফ্ল্যাট থেকে কাছাকাছি নামিদামি বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয় যৌন উত্তেজক পণ্য গোপনে বিক্রি করা হচ্ছে। যেখানে ধনী পরিবারের সদস্যদের আসা-যাওয়া আছে। হোটেল-রেস্তোরাঁর অনেক কর্মচারী এ কাজে জড়িত বলেও প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশের দোকানে, যেখানে বয়সে তরুণদের আসা-যাওয়া বেশি, সেখানে রেখেও বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক ফার্মেসিতে রেখেও এসব বিক্রি করা হচ্ছে। শহরের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়েও এসব বিক্রি হচ্ছে। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যৌন উত্তেজক পণ্যের অনেক চালান কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করেও পাঠানো হয়েছে। বেশ কয়েকবার কুরিয়ার সার্ভিসে অভিযান চালিয়ে এসব পণ্য আটক করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দেশি-বিদেশি চক্র এসব কাজে জড়িত। এরা সমাজের প্রভাবশালী। এদের ধরতে সরকারের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সমন্বয় করে কাজ করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধে দেশের তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর–হযরত শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী বিমানবন্দর; তিন সমুদ্রবন্দর–চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরে এনবিআর নজরদারি বাড়িয়েছে। শুল্ক শাখার নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি অতিরিক্ত শুল্ক গোয়েন্দারাও এ বিষয়ে কাজ করছেন। মোট আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে আনা-নেওয়া হয়। এই বন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানিকালে গত জুলাই-আগস্ট মাসে যৌন উত্তেজক পণ্যের ১৯ চালান আটক করা হয়। এনবিআরের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব দায়িত্ব গ্রহণের পর এ অপকর্ম বন্ধে নজরদারি বাড়িয়েছেন। তিনি এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা, তদন্ত অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন স্থলবন্দরের কর্মকর্তাদের যৌন উত্তেজক পণ্যসহ মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। এই কমিটি বিভিন্ন বন্দরের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি বন্ধে করণীয় নির্ধারণ করছে। এনবিআরের চেয়ারম্যান আহসান হাবিব সব বন্দরে চিঠি পাঠিয়ে সন্দেহজনক কার্টন, প্যাকেট বা প্যাকিং খুলে যাচাই করে দেখতে বলেছেন। বন্দরে জমা দেওয়া কাগজপত্রে ঘোষিত পণ্য আমদানি করা হচ্ছে কি না, তা বিশেষভাবে মিলিয়ে ছাড়করণে নির্দেশ দিয়েছেন। বছরখানেক আগে যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল স্থলবন্দরে ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের আড়ালে ৩ হাজার ৬৭৫ কেজি ভায়াগ্রার চালান আটক করা হলে এনবিআর নড়েচড়ে বসে। গত দুই বছরেও মিথ্যা ঘোষণায় আমদানিকালে যৌন উত্তেজক পণ্যের একাধিক চালান আটক করা হয়েছে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এভার গ্রিন ওষুধ কোম্পানি লিমিটেড, সাফমা-সায়কা সোয়েটার লিমিটেড, জোহান কসমেটিকস্ লিমিটেড, নিবেদিতা ক্লিনিক, অ্যাপারেল গার্মেন্টস লিমিটেড, সিলভার হারভেস্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, জয়িতা প্রসাধনীসহ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে মিথ্যা ঘোষণায় যৌন উত্তেজক পণ্য আমদানি করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের একটিরও বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। শুধু কাগজে-কলমে নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবহার করা সব কাগজপত্রই জাল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিথ্যা ঘোষণায় যৌন উত্তেজক পণ্য আমদানি বাংলাদেশের আমদানি নীতিমালার পরিপন্থি, যা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এ কাজে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, বহুদিন ধরে মিথ্যা ঘোষণায় মাদক, যৌন উত্তেজক পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করা হচ্ছে। এর হোতারা ধরা পড়েন না। তিনি আরও বলেন, মিথ্যা ঘোষণায় আমদানির ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এনবিআর এ বিষয়ে কঠোর হলে তা সবার জন্য ভালো হবে। রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকার কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. দিপু সিদ্দিকী বলেন, চাহিদা আছে বলেই যৌন উত্তেজক পণ্য আমদানি ও বিক্রি হচ্ছে। এটা অবৈধ কাজ। এখন হাতে হাতে মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও এসব পণ্য বিক্রি বাড়ছে। এতে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিশেষ প্রতিনিধি: 


















