পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সশস্ত্র তৎপরতা ও সহিংসতার টেকসই সমাধানে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান নয়, শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, কৃষি, পর্যটন ও অবকাঠামো উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে চায় সরকার। এ জন্য পাহাড়ের সমস্যা সমাধানে হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ বা সামগ্রিক পদ্ধতিতে এগোনোর কথা জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন।
তিনি বলেছেন, অপারেশন চালিয়ে কিংবা সেনাবাহিনী-পুলিশ পাঠিয়ে কোনো সমস্যার টেকসই সমাধান হবে না। যেখানে অন্ধকার আছে, সেখানে শিক্ষার আলো, সামাজিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আলো দিতে হবে। যত আলো বাড়বে, অন্ধকার তত কমে আসবে।’
বুধবার রাতে রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা এবং জনকল্যাণমূলক উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রতিমন্ত্রী।
এর আগে রাত সাড়ে ৮টা থেকে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, পার্বত্য রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্য, জেলা প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা ওই বৈঠকে জেলার সার্বিক পরিস্থিতি ও স্থানীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধানের বিষয়ে আলোচনা হয়।
পাহাড়ের সশস্ত্র তৎপরতা ও সহিংসতা বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের ওপর জোর দিয়ে মীর হেলাল বলেন, কোনো পরিবর্তনই ওয়ান নাইটে হবে না। আমরা পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নিচ্ছি। অস্ত্র ও সহিংসতা ধীরে ধীরে কমে আসবে। এটি একটি প্রক্রিয়া।
তিনি বলেন, আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন, পর্যটন ও কর্মসংস্থানকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলে এবং স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হলে বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও কমবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমি গোলাবারুদ নিয়ে আর্মি পাঠিয়ে দিলাম, র্যাব পাঠিয়ে দিলাম, পুলিশ পাঠিয়ে দিলাম—এটা কোনো টেকসই সমাধান নয়। আমরা যেখানে অন্ধকার, সেখানে আলো দিতে চাই। কৃষক যেন তাঁর ফসলের সর্বোচ্চ মূল্য পান, মানুষ যেন স্বাবলম্বী হয়; সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
রাঙামাটির শিক্ষার মানোন্নয়নকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছে সরকার। বিশেষ করে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের আধুনিক শিক্ষার আওতায় আনতে ই-লার্নিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
মীর হেলাল বলেন, রাঙামাটিতে সাম্প্রতিক এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। দুর্গম অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা যাতে আধুনিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য প্রত্যন্ত এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে ই-লার্নিং চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ছাত্রীদের আবাসন ও যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
পাহাড়ের মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ওপরও জোর দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। কৃষক যাতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন, সে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
তাঁর মতে, মানুষের সামনে বৈধ আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ যত বাড়বে, অপরাধ ও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা তত কমবে।
পাহাড়ের পর্যটন সম্ভাবনাকে স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার সঙ্গে যুক্ত করার কথাও বলেন তিনি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে মীর হেলাল বলেন, পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন অনুমোদন করবে না সরকার।
তিনি বলেন, আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে উন্নয়ন করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন হোক, পর্যটন বিকাশ হোক কিংবা অন্য কোনো স্থাপনা—সবকিছুই পরিবেশ অক্ষত রেখে করতে হবে।
বৈঠকে দুর্নীতির বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানের কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা সবাই জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। যেখানে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেখানে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে অনুমানভিত্তিক মামলা বা অভিযোগের মাধ্যমে কাউকে হয়রানি করা হবে না বলেও জানান তিনি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত করবে এবং যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
বৈঠকে রাঙামাটির স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ও উঠে আসে। এর মধ্যে ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স, ট্রাফিক পুলিশ ও ওয়াটার ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনা হয়।
জেলার ভৌগোলিক বাস্তবতা ও মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান মীর হেলাল।
এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ডের পাইলটিং, কৃষকদের সহায়তা, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রণয়ন এবং অসচ্ছল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়।
পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে বন্দোবস্ত প্রদান বন্ধ থাকা এবং বাজার ফান্ডভুক্ত এলাকায় ঋণ প্রদান বন্ধ থাকার বিষয়টি তুলে ধরলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
তিনি বলেন, আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করে ইনশাআল্লাহ এই অঞ্চলকে উন্নত, সমৃদ্ধ ও সম্প্রীতির জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
পাহাড়ে উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রশাসন, জেলা পরিষদ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী।
বৈঠকে রাঙামাটির সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দ্বীপন তালুকদার দীপুসহ জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রাঙামাটি প্রতিনিধি।। 


















