টানা বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। মহাসড়ক থেকে শুরু করে আঞ্চলিক, জেলা ও গ্রামীণ সড়ক—সবখানেই দেখা দিয়েছে ক্ষতচিহ্ন। কোথাও পিচ উঠে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত, কোথাও আবার পানির তোড়ে সড়কের মাটি ধসে গেছে। এতে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে যানবাহন ও পথচারীদের। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বর্ষা মৌসুমে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ৩ হাজার ১১৯ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামীণ কাঁচা সড়ক। বৃষ্টি ও পানি না কমায় অনেক এলাকায় এখনই সংস্কারকাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও সড়ক জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের এলজিইডির আওতাধীন ১ হাজার ৩৪৪টি সড়কের প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার পাকা ও ২ হাজার ১০০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক রয়েছে। এলজিইডি বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রহমত-ই-খুদা বলেন, ‘কাঁচা সড়কগুলোর অবস্থা সবচেয়ে বেশি নাজুক। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় এখনই সেগুলোর সংস্কারকাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। বৃষ্টি কমে পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া গেলে সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।
এদিকে বর্ষায় সড়কগুলোর বেহাল দশায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু প্রধান সড়ক নয়, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ের সড়কগুলোতেই দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। পানি জমে থাকায় অনেক স্থানে সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দেখা যাচ্ছে না। আবার কোথাও সড়কের দুই পাশ ভেঙে সরু হয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচলও সীমিত হয়ে পড়েছে।
বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ইউনিয়নের লামছড়ি গ্রামের বাসিন্দা রাসেল হোসেন জানান, তালতলী থেকে লামছড়ি যাওয়ার প্রায় ৮ কিলোমিটার সড়ক এখন চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জোয়ারের পানি সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও সড়কের অংশ ভেঙে পাশের খালে চলে যাচ্ছে। ওই এলাকার স্থানীয়রা বলছেন, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে পানি বাড়লে সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। বরগুনার তালতলী উপজেলার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, নদীর তীরবর্তী সড়কে জোয়ারের সময় পানি বৃদ্ধি পেয়ে আশপাশের বাড়িঘরেও ঢুকে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টানা বৃষ্টি। ফলে সড়কের পিচ উঠে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। গর্তগুলো পানিতে ডুবে থাকায় যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে। পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার ব্যবসায়ী বাদল খন্দকার বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে মানুষের স্বাভাবিক চলাচলই ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে বাড়ির সামনের ইটের হেরিংবোন সড়কও কয়েক জায়গায় ভেঙে গেছে। আগে ভ্যানগাড়ি বাড়ির সামনে পর্যন্ত আসতে পারলেও বর্তমানে সড়কের ভাঙা অংশের কারণে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে বরিশাল নগরীর বিভিন্ন সড়কও টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে নগরীর বর্ধিত এলাকার সড়কগুলোতে পানি জমে থাকায় ক্ষতির মাত্রা বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বরিশাল নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জুয়েল রানা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি হওয়ায় অনেক সড়কের পিচ ওঠে গেছে। অবস্থা এমন যে রিকশা ও মোটরসাইকেল নিয়ে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া অনেক জায়গায় রাস্তার নিচের স্তর দেবে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন সড়কে একই অবস্থা দেখা গেছে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল বাশার বলেন, ‘বর্ষা ও জোয়ারের পানিতে নগরীর প্রায় ৩৫ কিলোমিটার সড়ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্ধিত এলাকার সড়কগুলোতে ক্ষতির পরিমাণ বেশি। এসব এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকার পাশাপাশি জোয়ারের পানি দ্রুত নিষ্কাশনেরও সুযোগ নেই। বৃষ্টি কমে পানি নেমে যাওয়ার পর পর্যায়ক্রমে সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সড়ক বিভাগের আওতাধীন বরিশাল বিভাগে মোট ৩৫৩ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে ৯৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চারটি জাতীয় মহাসড়ক, ২৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দুটি আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ২৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ১২টি জেলা সড়ক রয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম বলেন, চলতি বর্ষা মৌসুমে এসব সড়কের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৯ কিলোমিটার। এসব সড়কে সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। তবে বর্ষার কারণে চাইলেও দ্রুত সংস্কার করা সম্ভব হয় না। তিনি আরও বলেন, বর্ষাকালে সড়ক সংস্কার করলে অনেক ক্ষেত্রে তা স্থায়ী হয় না। বিশেষ করে যেসব সড়কের নিচের মাটি পানিতে নরম হয়ে গেছে, সেসব জায়গায় পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার আগে কাজ শুরু করা কঠিন। তাই আবহাওয়া ও পানি পরিস্থিতির উন্নতির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।##
বরিশাল প্রতিনিধি: 


















