আগামী শিক্ষাবর্ষের সরকারি বিনামূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণে কাগজ কলগুলো থেকে ছাপাখানায় নিম্নমানের কাগজ সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাজার থেকে কেনা কাগজ মানোত্তীর্ণ না হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ছাপাখানার মালিকরা। কাগজের মান ঠিক না থাকায় মিলছে না বোর্ডের অনুমোদন। ফলে অনেক মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান এখনো বই ছাপার কাজই শুরু করতে পারেনি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে বেশ কিছু ঠিকাদার (ছাপাখানার মালিক) নিজ উদ্যোগে এলসির মাধ্যমে বিদেশ থেকে কাগজ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার এনসিটিবি ভবনে কাগজ কলের একাধিক ব্যক্তির আনাগোনা দেখা যায়। মানদণ্ড পূরণ করতে না পারায় ইন্সপেকশন কোম্পানির অনুমোদন পায়নি অনেক মিলের কাগজ। বোর্ডের বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিয়ে ‘অনুত্তীর্ণ’ কাগজ ছাড় করানোর চেষ্টা দেখা গেছে কাগজ কল মালিকদের পক্ষ থেকে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাদের অনেকেই সরকারের ‘ঊর্ধ্বতন’ ব্যক্তিদের দিয়ে নিম্নমানের কাগজকে ‘উত্তীর্ণ’ করার চেষ্টা করেছেন।
পাঠ্যবই ছাপানোর আগে বেসরকারি ইন্সপেকশন এজেন্ট কাগজের মান যাচাই করে অনুমোদন দিয়ে তা এনসিটিবিতে জমা দেয়। সেই কাগজ পুনরায় যাচাই করে এনসিটিবি। এর পরই কাগজ সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে আগে নিম্নমানের কাগজে ছাপা, পরে অনুমোদন দেওয়া, এমন ঘটনাও অহরহ ঘটতে দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এ ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়।
তৃতীয় পক্ষের ইন্সপেকশন কোম্পানি ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজিম মনির বলেন, এ বছর ‘টিকে পেপার মিল’ ও ‘ম্যাপ পেপার বোর্ড মিলস লিমিটেড’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের কাগজে গুরুতর সমস্যা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে টিকে পেপার মিলের কাগজের ওজন (জিএসএম) ও পুরুত্ব, কাগজের আলো প্রতিরোধক্ষমতা (অপাসিটি) ও কাগজের চাপ সহ্য করার ক্ষমতা (বার্স্টিং ফ্যাক্টর) নিম্নমানের পাওয়া গেছে। যে কারণে এই কোম্পানির কাগজের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। মো. সিরাজিম মনির আরও বলেন, ম্যাপ পেপার বোর্ড মিলস লিমিটেডের সরবরাহ করা কাগজের উজ্জ্বলতা নির্ধারিত মানের চেয়ে কম। কাগজও বেশি মোটা। এ কারণে এই কোম্পানির কাগজও গ্রহণ করা হয়নি।
অনুমোদিত বিভিন্ন কাগজ মিলের সরবরাহ করা কাগজ ব্যবহার করে ছাপার কাজ শেষ করেন ছাপাখানার মালিকরা। অনুপম প্রিন্টার্সকে কাগজ সরবরাহ করে ম্যাপ পেপার বোর্ড মিলস লিমিটেড। ইন্সপেকশন কোম্পানির অনুমোদন না মেলায় এনসিটিবিও এই ছাপাখানাকে বই ছাপানোর অনুমতি দেয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ম্যাপের কাগজ ব্যবহারের অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও এই ছাপাখানাটি ছাপার কাজ শুরু করেছে। অনুপম প্রিন্টার্সের স্বত্বাধিকারী আবুল কাশেম বলেন, ‘আমাদের অনুমোদন মিলেছে। কাগজে কোনো সমস্যা নেই।’ তবে এনসিটিবি সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) আবু নাসের টুকু বলেন, ‘এমন কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তারা (অনুপম) কীভাবে ছাপার কাজ শুরু করেছে, সে বিষয়ে খবর নেওয়া হবে।’
এনসিটিবি জানায়, মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের জন্য এবার উজ্জ্বলতা (ব্রাইটনেস) ৮৫ শতাংশ, বার্স্টিং ফ্যাক্টর ১৮ এবং অপাসিটি ৮৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাক্-প্রাথমিক পাঠ্যবইয়ে ব্রাইটনেস ৮৫ শতাংশ, বার্স্টিং ফ্যাক্টর ২০ ও অপাসিটি ৯০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবছর ছাপাখানার মালিকরা নিম্নমানের কাগজ পাঠ্যবইয়ে ব্যবহার করছেন। ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফায় শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিশক্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ছাপাখানার মালিক বলেন, দেশের অনেক কাগজ কল এবারও কাগজের কৃত্রিম সংকট তৈরিতে সক্রিয় হয়েছে। অনেকেই বাড়তি দাম চাইছেন। সে কারণে ব্যবসায়ী কাগজ আমদানির জন্য এলসি খুলেছেন। কাগজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু মান নয়, ওজনেও কম দিয়েছে। পরে অভিযোগ জমা দেওয়ার পর সেগুলো ঠিক করা হয়। এ বিষয়ে সরকারের কঠিন মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন ঠিকাদাররা।
সম্প্রতি শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে এই খাতের বিশাল আর্থিক ক্ষতি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বইয়ের কাগজের জিএসএম, ব্রাইটনেস (উজ্জ্বলতা) এবং বাঁধাইয়ের মান যাচাই-বাছাই না করে এবং ল্যাব টেস্ট ছাড়া তড়িঘড়ি করে ১ হাজার ৭৮৫ কোটি ৮ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে। ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও শিক্ষার্থীরা পেয়েছে নিম্নমানের কাগজের অনুজ্জ্বল বই। অনিয়মের এখানেই শেষ নয়, কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে অতিরিক্ত বই ছাপিয়ে সরকারের ৫১৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতিও করা হয়েছে। বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়ায় সরকারের আরও ক্ষতি হয়েছে ২১৬ কোটি টাকা।
মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, এনসিটিবির শর্ত একেবারেই সাধারণ। এটি মেনে চলা কঠিন কোনো ব্যাপার নয়। তবে অসৎ উদ্দেশ্য থেকে ছাপাখানার মালিক ও কাগজ কলগুলোর মধ্যে একধরনের ‘অসাধু’ বোঝাপড়া থেকেই এই সমস্যার তৈরি হয়েছে। এনসিটিবির উচিত হবে, অসৎ ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ না দিয়ে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের নীতিতে অটল থাকা।
মধুমতি ডেস্ক : 


















