ঢাকা ০৮:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদের শিরোনাম :
পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়? জেডএফসি-২: বাংলাদেশের কমব্যাট স্পোর্টসে নতুন দিগন্ত মোংলায়  জীবাশ্ম জ্বালানির নতুন প্রকল্প না করার দাবিতে মানববন্ধন রাজশাহীতে নারীসহ আলোচিত সাবেক ওসি মাহবুব আলম আটক  বাউফলে তিন লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে দোকানে তালা দেওয়ার অভিযোগ যুবদল কর্মীর বিরুদ্ধে ভোলায় ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে নারীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ মাদারীপুরে বেশি লাভের আশায় পচে গেল ৩ কোটি টাকার আলু পাথরঘাটায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাবিতে মানববন্ধন ভোলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ড্রেজার-বাল্কহেডসহ আটক ৭

ফুলবাড়ী আন্দোলনের ২০ বছরেও চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি : ফুলবাড়ী অতীত নয়-ভবিষ্যতের প্রশ্ন?

১৬ আগস্ট আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের আয়োজনে ব্যবসায়ীদের সামনে দাঁড়িয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানালেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশকে এখন কয়লা উত্তোলনের দিকেই যেতে হচ্ছে এবং ফুলবাড়ীসহ কয়েকটি জায়গায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে এগোনো ছাড়া উপায় থাকছে না। তার যুক্তি—‘আমাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই।’বাক্যটি ছোট, কিন্তু এর ওজন বিরাট। কারণ গত সাড়ে তিন দশকে এই একটি বাক্য দিয়েই বাংলাদেশের জ্বালানি রাজনীতির প্রায় প্রতিটি বড় সিদ্ধান্ত ন্যায্যতা পেয়েছে। ‘বিকল্প নাই’ বলেই নব্বইয়ের দশকে রাষ্ট্র নিজেকে উৎপাদক থেকে ক্রেতায় নামিয়ে এনেছিল। ২০০৯ সালের পর কুইক রেন্টাল এসেছিল-অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে, যা পরে দেড় দশকের ক্যাপাসিটি পেমেন্টে পরিণত হলো। এলএনজি আমদানির দরজা খুলেছিল, একের পর এক ভাসমান টার্মিনালের চুক্তি হয়েছিল। তাই ‘বিকল্প নাই’ কথাটি শুনলে প্রথম প্রশ্নটি হওয়া উচিতবিকল্প ছিল না, নাকি বিকল্প নেওয়া হয়নি?

হিসাবের খাতা : গত ২১ জুলাই এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনার পর দেশের গ্যাস সরবরাহ এক পর্যায়ে দৈনিক ১৭৩ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে, যেখানে চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও হবিগঞ্জে একের পর এক উৎপাদনশীল কারখানা বন্ধ হয়েছে। মেঘনা গ্রুপের ৫৭টি কারখানার ৪০টিই থেমে গিয়েছিল; সিরামিক কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে; ঢাকার বাইরে দিনে ১০-১২ বার লোডশেডিং সয়ে কারখানা চলেছে ডিজেল জেনারেটরে। এসবই সত্য।আমদানি করা কয়লার পেছনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ১১৯ কোটি ডলারের বেশি, যা টাকার অঙ্কে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি। দেশের মাটির নিচে কয়লা পড়ে থাকবে আর প্রতি বছর দুই কোটি টন কয়লা কিনতে ডলার গুনতে হবে-এটুকু শুনলে যে কারই অস্বস্তি হবে।

দুই যুগে গ্যাস অনুসন্ধানে রাষ্ট্রের মোট বিনিয়োগ প্রায় আট হাজার কোটি টাকা। আর মাত্র আট বছরে এলএনজি আমদানিতে খরচ হয়েছে দুই লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকার বেশি, তার ওপর ভর্তুকি ৪৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ নিজের সম্পদ খুঁজে বের করার চেয়ে পরের সম্পদ কিনে আনার পেছনে রাষ্ট্র প্রায় ৩৫ গুণ বেশি অর্থ ঢেলেছে। দুটি ভাসমান টার্মিনালের প্রতিটির দৈনিক ভাড়াই প্রায় তিন লাখ ডলার-বসিয়ে রাখলেও।

এখানেই শেষ নয়। দৈনিক প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে অবৈধ সংযোগে, যা ফুলবাড়ীর কয়লা তুলতে যত বছর লাগবে, তার চেয়ে অনেক কম সময়ে বন্ধ করা সম্ভব। এলপিজি আমদানির অবকাঠামো আছে ৩০ লাখ টনের, ব্যবহার হচ্ছে ১৫ লাখ টন, অর্ধেক সক্ষমতা অলস পড়ে আছে। ইনভার্টার প্রযুক্তির এসি আর রেফ্রিজারেটরে গেলে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। বড়পুকুরিয়ায় ৫২৫ মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকলেও কার্যত চলে ২২৫ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট; বাকিগুলো কারিগরি অব্যবস্থাপনায় অচল। পেট্রোবাংলার ৫০ অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্প কাক্সিক্ষত ফল দেয়নি, কারণ খনন হয়েছে পুরোনো দ্বিমাত্রিক জরিপের তথ্যের ওপর ভর করে; দেশে এ পর্যন্ত ত্রিমাত্রিক জরিপ হয়েছে মাত্র সাত হাজার ১৩৭ বর্গকিলোমিটার। রিগ আছে পাঁচটি।

তাই বিকল্প ছিল, আছে এবং তার প্রায় প্রতিটি ধাপ ফুলবাড়ীর কয়লা তোলার চেয়ে দ্রুত ও সস্তা। সবচেয়ে বড় কথা, উন্মুক্ত খনির প্রস্তাবটিকে যদি আমদানিনির্ভরতা থেকে মুক্তির ঘোষণা বলে ধরা হয়, তবে সেই দাবিও পরীক্ষায় টেকে না। ঠিক একই সময়ে মহেশখালীতে তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে চীনা প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে; পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরো তিনটি টার্মিনালের কথা বলছেন জ্বালানিমন্ত্রী। অর্থাৎ রাষ্ট্র একদিকে দেশীয় কয়লার নামে জনগণের জমি চাইছে, অন্যদিকে আমদানির অবকাঠামোকে আরো কয়েক দশকের জন্য পাকা করছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই বলছেন, নতুন টার্মিনাল নয়-কূপ খনন, রিগ ও ত্রিমাত্রিক জরিপে বিনিয়োগই এই মুহূর্তে অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। দুটি পথ একসঙ্গে নেওয়ার নাম কৌশল নয়; সেটিকে বলে দিশাহীনতা।

মন্ত্রীর উন্মুক্ত খনির আর্তনাদপূর্ণ এই প্রস্তাব এমন এক মাসে এলো, যে মাসটি বাংলাদেশের জ্বালানি রাজনীতির সবচেয়ে ভারী স্মৃতি বহন করে। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে নামা মিছিলে গুলি চলেছিল।তরিকুল, আমিন ও সালেকিন সেদিন শহীদ হন; আহত হন দুই শতাধিক। চার দিন পর, ৩০ আগস্ট, আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিয়ে সরকার যে সমঝোতায় সই করে, তা-ই ফুলবাড়ী চুক্তি। সেই চুক্তির কেন্দ্রীয় ধারাটি ছিল স্পষ্ট, ফুলবাড়ীসহ বাংলাদেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলা হবে না, এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল হবে, কোম্পানিকে এলাকা ছাড়তে হবে। ২৬ আগস্ট সেই ঘটনার ২০ বছর পূর্ণ হবে।

ফুলবাড়ীকে কেবল ‘স্থানীয় প্রতিরোধ’ বলে ছোট করে দেখলে ইতিহাস বোঝা যাবে না। এশিয়া এনার্জি আজ যার নাম জিসিএম রিসোর্সেস-তারা  চেয়েছিল প্রায় ৬৭ বর্গকিলোমিটার জমি অধিগ্রহণ করে বিরাট গর্ত কেটে কয়লা তুলবে, তার বড় অংশ রপ্তানি করবে, আর বাংলাদেশ পাবে মাত্র ৬ শতাংশ রয়্যালটি। অর্থাৎ প্রস্তাবটি কেবল প্রযুক্তির ছিল না, ছিল একটি সামাজিক সম্পর্ক বদলের প্রস্তাব। কৃষিজমি হবে খনি এলাকা, মানুষ হবে ‘পুনর্বাসনযোগ্য জনসংখ্যা’, পানি হবে নিষ্কাশন ব্যয়ের খাত, কয়লা হবে কোম্পানির সম্পদ, আর রাষ্ট্র দেবে করপোরেটদের নিরাপত্তা। কৃষক, শ্রমজীবী, নাগরিক, বামপন্থি ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা সেদিন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে সেই রূপান্তর প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফুলবাড়ী তাই উন্নয়ন বনাম অনুন্নয়নের বিতর্ক ছিল না; ছিল ‘উন্নয়ন কাকে বলে’ এই প্রশ্নের ওপর জনগণের সরাসরি হস্তক্ষেপ।

আরো লক্ষণীয়, সিদ্ধান্তের ইঙ্গিতটি এলো কোথা থেকে। সংসদে নয়, গণশুনানিতে নয়, ফুলবাড়ীর মাঠে দাঁড়িয়ে নয়, বিদেশি বাণিজ্য সংগঠনের আয়োজনে ব্যবসায়ীদের সামনে। যাদের জমি, পানি ও কবরস্থান এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে, তারা জানছে সবার শেষে। এটাই জ্বালানি খাতে গণসার্বভৌমত্বের অনুপস্থিতির সবচেয়ে নিখুঁত ছবি। নিজের যুক্তিতেই যেখানে প্রস্তাবটি ভেঙে পড়ে ফুলবাড়ীতে আনুমানিক ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদ, উত্তোলনযোগ্য ধরা হয় ৪৭২ মিলিয়ন টন; বছরে ১৫ মিলিয়ন টন তোলা গেলে আমদানির বড় অংশ সাশ্রয় সম্ভব, হিসাবটি কাগজে-কলমে চমৎকার। কিন্তু কয়লার স্তর ভূপৃষ্ঠের প্রায় ২৪০ মিটার নিচে।

উন্মুক্ত পদ্ধতিতে সেখানে পৌঁছাতে ওপরের পুরো মাটি সরাতে হবে। আর সেই মাটির ভেতরেই আছে ৮০ থেকে ১২০ মিটার পুরু ডুপিটিলা জলস্তর, উত্তরবঙ্গের কৃষির প্রাণভোমরা। খনি চালু রাখতে হলে বছরের পর বছর পাম্প চালিয়ে সেই স্তরকে পানিশূন্য রাখতে হবে। এর অর্থ কেবল ৬৭ বর্গকিলোমিটারের গর্ত নয়; তার সঙ্গে জড়িত চারপাশে বহু গুণ বড় এলাকাজুড়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, সেচ ভেঙে পড়া, ধানের মৌসুম বদলে যাওয়া। যে অঞ্চল দেশের খাদ্যভান্ডার, সেখানে জ্বালানির জন্য পানি বিসর্জন দেওয়ার হিসাব কোনো প্রকল্প-প্রস্তাবে সম্পূর্ণভাবে ধরা পড়ে না।

সময়ের হিসাবটিও নিজের বিরুদ্ধে যায়। মন্ত্রী নিজেই বলেছেন, সংকট কাটতে অন্তত দুই বছর লাগবে। অথচ সরকারি সূত্র বলছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর ফুলবাড়ী খনিকে পূর্ণ সক্ষমতায় নিতে সময় লাগবে প্রায় পাঁচ বছর, আর তা-ও নির্বিঘণণ হলে।অর্থাৎ যে সংকটের জরুরি সমাধান হিসেবে উন্মুক্ত খনির কথা তোলা হচ্ছে, সেই সংকট মেটার অনেক পরে খনিটি উৎপাদনে আসবে। জরুরি অবস্থার যুক্তি দিয়ে অজরুরি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া-বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে পুরোনো কৌশল।

আর ‘পুনর্বাসন’ শব্দটি আসে সেই মেয়াদোত্তীর্ণ কৌশলের সারপ্লাস হিসেবে। ফুলবাড়ী আমাদের শিখিয়েছে, ক্ষতিপূরণের প্যাকেজ জীবনের বদলি হতে পারে না। কোম্পানির খাতায় যা ‘পুনর্বাসন ব্যয়’, মানুষের জীবনে তা জীবনভাঙন। এখানে একটি বিতর্ক বহু বছর ধরে দুই প্রান্তে আটকে আছে। ‘কয়লা তুলতেই হবে’—এটি যেমন হঠকারী অবস্থান; তেমনি ‘কয়লা কোনো অবস্থায়ই ছোঁয়া যাবে না’—এটিও উন্নাসিকতা। বাংলাদেশের কয়লা প্রশ্নের উত্তর বাজার দেবে না, বহুজাতিক কোম্পানি দেবে না, আবার কেবল স্লোগানও দেবে না।

উত্তরটি আসতে হবে স্বাধীন ভূতাত্ত্বিক গবেষণা, নিরপেক্ষ পরিবেশগত মূল্যায়ন, কৃষি ও পানিবিজ্ঞানের সমন্বিত বিশ্লেষণ, স্থানীয় জনগণের স্বাধীন ও আগাম সম্মতি এবং জনগণের সামনে উন্মুক্ত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। কোন ক্ষেত্র উত্তোলনযোগ্য, কোনটি নয়; কোথায় ভূগর্ভস্থ পদ্ধতি সম্ভব, কোথায় কোনো পদ্ধতিই নয়-এই বিচার জনসমক্ষে হতে হবে। এই শর্তগুলো পূরণ না করে কয়লা তোলা উন্নয়ন নয়, লুট।

যা এখনই করা যায় : সংকট থেকে বেরোনোর পথ আছে এবং তার কোনোটির জন্যই ফুলবাড়ীর মাটি খুঁড়তে হয় না।

স্বল্প মেয়াদে : অবৈধ সংযোগ বন্ধ করে চুরি যাওয়া গ্যাস উদ্ধার; বন্ধ ও কম উৎপাদনশীল কূপের তালিকা প্রকাশ করে দ্রুত ওয়ার্কওভার; ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জের গ্যাস জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করা; অলস এলপিজি অবকাঠামো কাজে লাগানো; বড়পুকুরিয়ার অচল ইউনিট দুটি সচল করা; জ্বালানি দক্ষতাকে জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত করা।

মধ্যমেয়াদে : ত্রিমাত্রিক জরিপের এলাকা বহু গুণ বাড়ানো, রিগ ও গভীর খননে বিনিয়োগ, বাপেক্সকে প্রকৃত রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান শক্তিতে রূপান্তর, সমুদ্রভাগে দ্রুত ও স্বচ্ছ অনুসন্ধান, ছাদ-সৌরশক্তি ও ইউনিয়নভিত্তিক সৌরশক্তিকে করপোরেট প্রকল্প নয়, সামাজিক মালিকানায় বিস্তার।

আর সবকিছুর ওপরে : সব বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্টের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অংশ প্রকাশ, প্রকাশ্য নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে অলস কেন্দ্রগুলোর দায় নির্ধারণ এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে আনুষ্ঠানিকতার প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকৃত জননিয়ন্ত্রকে রূপান্তর। জনগণ জানবে না, অথচ টাকা দেবে-এই ব্যবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না।

যেহেতু আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন জ্বালানি নীতি ও ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা আসছে, দাবিটি এখনই তোলা দরকার, খসড়া প্রকাশ করে জনমত নেওয়া হোক, সংসদে বিতর্ক হোক, বিভাগীয় শহরগুলোতে উন্মুক্ত শুনানি হোক এবং গ্যাস, কয়লা, পারমাণবিকসহ প্রতিটি অধ্যায়ের জন্য প্রকৌশলী, ভূতাত্ত্বিক, কৃষি ও পানিবিজ্ঞানী, স্থানীয় প্রতিনিধি ও নাগরিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্বাধীন মূল্যায়ন কমিটি গঠিত হোক।

একটি জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনা কমিশনের কথাও ভাবা যায়, যা মন্ত্রণালয়ের দপ্তর নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, চুক্তি মূল্যায়ন ও জ্বালানি মিশ্রণ নির্ধারণের একটি জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান। নীতি যদি ঘোষণার আগে জনগণের সামনে না আসে, তবে সেটি জাতীয় নীতি নয়, কেবল একটি দপ্তরের সিদ্ধান্ত, যা পরের সরকার এসে আবার বদলে দেবে।

ফুলবাড়ী ২০ বছর আগে একটি প্রশ্ন রেখে গিয়েছিল উন্নয়ন কার? প্রশ্নটির উত্তর রাষ্ট্র আজও দেয়নি। বরং প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য নতুন করে সেই একই প্রকল্পের কাছে ফিরে যাওয়া হচ্ছে, কেবল কোম্পানির নাম বদলে।

ফুলবাড়ী তাই এখনো অতীত নয়, ফুলবাড়ী ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আর প্রশ্নটি খুব সরল-বাংলাদেশ কি নিজের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণ করবে, নাকি করবে বাজার, ঋণদাতা আর পাঁচতারা হোটেলের সভাকক্ষ? আর এখানেই নিহিত জ্বালানি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

dainik madhumati

জনপ্রিয় পোস্ট

পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা

ফুলবাড়ী আন্দোলনের ২০ বছরেও চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি : ফুলবাড়ী অতীত নয়-ভবিষ্যতের প্রশ্ন?

আপডেটের সময় : ০৮:১৯:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

১৬ আগস্ট আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের আয়োজনে ব্যবসায়ীদের সামনে দাঁড়িয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানালেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশকে এখন কয়লা উত্তোলনের দিকেই যেতে হচ্ছে এবং ফুলবাড়ীসহ কয়েকটি জায়গায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে এগোনো ছাড়া উপায় থাকছে না। তার যুক্তি—‘আমাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই।’বাক্যটি ছোট, কিন্তু এর ওজন বিরাট। কারণ গত সাড়ে তিন দশকে এই একটি বাক্য দিয়েই বাংলাদেশের জ্বালানি রাজনীতির প্রায় প্রতিটি বড় সিদ্ধান্ত ন্যায্যতা পেয়েছে। ‘বিকল্প নাই’ বলেই নব্বইয়ের দশকে রাষ্ট্র নিজেকে উৎপাদক থেকে ক্রেতায় নামিয়ে এনেছিল। ২০০৯ সালের পর কুইক রেন্টাল এসেছিল-অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে, যা পরে দেড় দশকের ক্যাপাসিটি পেমেন্টে পরিণত হলো। এলএনজি আমদানির দরজা খুলেছিল, একের পর এক ভাসমান টার্মিনালের চুক্তি হয়েছিল। তাই ‘বিকল্প নাই’ কথাটি শুনলে প্রথম প্রশ্নটি হওয়া উচিতবিকল্প ছিল না, নাকি বিকল্প নেওয়া হয়নি?

হিসাবের খাতা : গত ২১ জুলাই এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনার পর দেশের গ্যাস সরবরাহ এক পর্যায়ে দৈনিক ১৭৩ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে, যেখানে চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও হবিগঞ্জে একের পর এক উৎপাদনশীল কারখানা বন্ধ হয়েছে। মেঘনা গ্রুপের ৫৭টি কারখানার ৪০টিই থেমে গিয়েছিল; সিরামিক কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে; ঢাকার বাইরে দিনে ১০-১২ বার লোডশেডিং সয়ে কারখানা চলেছে ডিজেল জেনারেটরে। এসবই সত্য।আমদানি করা কয়লার পেছনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ১১৯ কোটি ডলারের বেশি, যা টাকার অঙ্কে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি। দেশের মাটির নিচে কয়লা পড়ে থাকবে আর প্রতি বছর দুই কোটি টন কয়লা কিনতে ডলার গুনতে হবে-এটুকু শুনলে যে কারই অস্বস্তি হবে।

দুই যুগে গ্যাস অনুসন্ধানে রাষ্ট্রের মোট বিনিয়োগ প্রায় আট হাজার কোটি টাকা। আর মাত্র আট বছরে এলএনজি আমদানিতে খরচ হয়েছে দুই লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকার বেশি, তার ওপর ভর্তুকি ৪৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ নিজের সম্পদ খুঁজে বের করার চেয়ে পরের সম্পদ কিনে আনার পেছনে রাষ্ট্র প্রায় ৩৫ গুণ বেশি অর্থ ঢেলেছে। দুটি ভাসমান টার্মিনালের প্রতিটির দৈনিক ভাড়াই প্রায় তিন লাখ ডলার-বসিয়ে রাখলেও।

এখানেই শেষ নয়। দৈনিক প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে অবৈধ সংযোগে, যা ফুলবাড়ীর কয়লা তুলতে যত বছর লাগবে, তার চেয়ে অনেক কম সময়ে বন্ধ করা সম্ভব। এলপিজি আমদানির অবকাঠামো আছে ৩০ লাখ টনের, ব্যবহার হচ্ছে ১৫ লাখ টন, অর্ধেক সক্ষমতা অলস পড়ে আছে। ইনভার্টার প্রযুক্তির এসি আর রেফ্রিজারেটরে গেলে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। বড়পুকুরিয়ায় ৫২৫ মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকলেও কার্যত চলে ২২৫ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট; বাকিগুলো কারিগরি অব্যবস্থাপনায় অচল। পেট্রোবাংলার ৫০ অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্প কাক্সিক্ষত ফল দেয়নি, কারণ খনন হয়েছে পুরোনো দ্বিমাত্রিক জরিপের তথ্যের ওপর ভর করে; দেশে এ পর্যন্ত ত্রিমাত্রিক জরিপ হয়েছে মাত্র সাত হাজার ১৩৭ বর্গকিলোমিটার। রিগ আছে পাঁচটি।

তাই বিকল্প ছিল, আছে এবং তার প্রায় প্রতিটি ধাপ ফুলবাড়ীর কয়লা তোলার চেয়ে দ্রুত ও সস্তা। সবচেয়ে বড় কথা, উন্মুক্ত খনির প্রস্তাবটিকে যদি আমদানিনির্ভরতা থেকে মুক্তির ঘোষণা বলে ধরা হয়, তবে সেই দাবিও পরীক্ষায় টেকে না। ঠিক একই সময়ে মহেশখালীতে তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে চীনা প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে; পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরো তিনটি টার্মিনালের কথা বলছেন জ্বালানিমন্ত্রী। অর্থাৎ রাষ্ট্র একদিকে দেশীয় কয়লার নামে জনগণের জমি চাইছে, অন্যদিকে আমদানির অবকাঠামোকে আরো কয়েক দশকের জন্য পাকা করছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই বলছেন, নতুন টার্মিনাল নয়-কূপ খনন, রিগ ও ত্রিমাত্রিক জরিপে বিনিয়োগই এই মুহূর্তে অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। দুটি পথ একসঙ্গে নেওয়ার নাম কৌশল নয়; সেটিকে বলে দিশাহীনতা।

মন্ত্রীর উন্মুক্ত খনির আর্তনাদপূর্ণ এই প্রস্তাব এমন এক মাসে এলো, যে মাসটি বাংলাদেশের জ্বালানি রাজনীতির সবচেয়ে ভারী স্মৃতি বহন করে। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে নামা মিছিলে গুলি চলেছিল।তরিকুল, আমিন ও সালেকিন সেদিন শহীদ হন; আহত হন দুই শতাধিক। চার দিন পর, ৩০ আগস্ট, আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিয়ে সরকার যে সমঝোতায় সই করে, তা-ই ফুলবাড়ী চুক্তি। সেই চুক্তির কেন্দ্রীয় ধারাটি ছিল স্পষ্ট, ফুলবাড়ীসহ বাংলাদেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলা হবে না, এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল হবে, কোম্পানিকে এলাকা ছাড়তে হবে। ২৬ আগস্ট সেই ঘটনার ২০ বছর পূর্ণ হবে।

ফুলবাড়ীকে কেবল ‘স্থানীয় প্রতিরোধ’ বলে ছোট করে দেখলে ইতিহাস বোঝা যাবে না। এশিয়া এনার্জি আজ যার নাম জিসিএম রিসোর্সেস-তারা  চেয়েছিল প্রায় ৬৭ বর্গকিলোমিটার জমি অধিগ্রহণ করে বিরাট গর্ত কেটে কয়লা তুলবে, তার বড় অংশ রপ্তানি করবে, আর বাংলাদেশ পাবে মাত্র ৬ শতাংশ রয়্যালটি। অর্থাৎ প্রস্তাবটি কেবল প্রযুক্তির ছিল না, ছিল একটি সামাজিক সম্পর্ক বদলের প্রস্তাব। কৃষিজমি হবে খনি এলাকা, মানুষ হবে ‘পুনর্বাসনযোগ্য জনসংখ্যা’, পানি হবে নিষ্কাশন ব্যয়ের খাত, কয়লা হবে কোম্পানির সম্পদ, আর রাষ্ট্র দেবে করপোরেটদের নিরাপত্তা। কৃষক, শ্রমজীবী, নাগরিক, বামপন্থি ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা সেদিন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে সেই রূপান্তর প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফুলবাড়ী তাই উন্নয়ন বনাম অনুন্নয়নের বিতর্ক ছিল না; ছিল ‘উন্নয়ন কাকে বলে’ এই প্রশ্নের ওপর জনগণের সরাসরি হস্তক্ষেপ।

আরো লক্ষণীয়, সিদ্ধান্তের ইঙ্গিতটি এলো কোথা থেকে। সংসদে নয়, গণশুনানিতে নয়, ফুলবাড়ীর মাঠে দাঁড়িয়ে নয়, বিদেশি বাণিজ্য সংগঠনের আয়োজনে ব্যবসায়ীদের সামনে। যাদের জমি, পানি ও কবরস্থান এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে, তারা জানছে সবার শেষে। এটাই জ্বালানি খাতে গণসার্বভৌমত্বের অনুপস্থিতির সবচেয়ে নিখুঁত ছবি। নিজের যুক্তিতেই যেখানে প্রস্তাবটি ভেঙে পড়ে ফুলবাড়ীতে আনুমানিক ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদ, উত্তোলনযোগ্য ধরা হয় ৪৭২ মিলিয়ন টন; বছরে ১৫ মিলিয়ন টন তোলা গেলে আমদানির বড় অংশ সাশ্রয় সম্ভব, হিসাবটি কাগজে-কলমে চমৎকার। কিন্তু কয়লার স্তর ভূপৃষ্ঠের প্রায় ২৪০ মিটার নিচে।

উন্মুক্ত পদ্ধতিতে সেখানে পৌঁছাতে ওপরের পুরো মাটি সরাতে হবে। আর সেই মাটির ভেতরেই আছে ৮০ থেকে ১২০ মিটার পুরু ডুপিটিলা জলস্তর, উত্তরবঙ্গের কৃষির প্রাণভোমরা। খনি চালু রাখতে হলে বছরের পর বছর পাম্প চালিয়ে সেই স্তরকে পানিশূন্য রাখতে হবে। এর অর্থ কেবল ৬৭ বর্গকিলোমিটারের গর্ত নয়; তার সঙ্গে জড়িত চারপাশে বহু গুণ বড় এলাকাজুড়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, সেচ ভেঙে পড়া, ধানের মৌসুম বদলে যাওয়া। যে অঞ্চল দেশের খাদ্যভান্ডার, সেখানে জ্বালানির জন্য পানি বিসর্জন দেওয়ার হিসাব কোনো প্রকল্প-প্রস্তাবে সম্পূর্ণভাবে ধরা পড়ে না।

সময়ের হিসাবটিও নিজের বিরুদ্ধে যায়। মন্ত্রী নিজেই বলেছেন, সংকট কাটতে অন্তত দুই বছর লাগবে। অথচ সরকারি সূত্র বলছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর ফুলবাড়ী খনিকে পূর্ণ সক্ষমতায় নিতে সময় লাগবে প্রায় পাঁচ বছর, আর তা-ও নির্বিঘণণ হলে।অর্থাৎ যে সংকটের জরুরি সমাধান হিসেবে উন্মুক্ত খনির কথা তোলা হচ্ছে, সেই সংকট মেটার অনেক পরে খনিটি উৎপাদনে আসবে। জরুরি অবস্থার যুক্তি দিয়ে অজরুরি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া-বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে পুরোনো কৌশল।

আর ‘পুনর্বাসন’ শব্দটি আসে সেই মেয়াদোত্তীর্ণ কৌশলের সারপ্লাস হিসেবে। ফুলবাড়ী আমাদের শিখিয়েছে, ক্ষতিপূরণের প্যাকেজ জীবনের বদলি হতে পারে না। কোম্পানির খাতায় যা ‘পুনর্বাসন ব্যয়’, মানুষের জীবনে তা জীবনভাঙন। এখানে একটি বিতর্ক বহু বছর ধরে দুই প্রান্তে আটকে আছে। ‘কয়লা তুলতেই হবে’—এটি যেমন হঠকারী অবস্থান; তেমনি ‘কয়লা কোনো অবস্থায়ই ছোঁয়া যাবে না’—এটিও উন্নাসিকতা। বাংলাদেশের কয়লা প্রশ্নের উত্তর বাজার দেবে না, বহুজাতিক কোম্পানি দেবে না, আবার কেবল স্লোগানও দেবে না।

উত্তরটি আসতে হবে স্বাধীন ভূতাত্ত্বিক গবেষণা, নিরপেক্ষ পরিবেশগত মূল্যায়ন, কৃষি ও পানিবিজ্ঞানের সমন্বিত বিশ্লেষণ, স্থানীয় জনগণের স্বাধীন ও আগাম সম্মতি এবং জনগণের সামনে উন্মুক্ত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। কোন ক্ষেত্র উত্তোলনযোগ্য, কোনটি নয়; কোথায় ভূগর্ভস্থ পদ্ধতি সম্ভব, কোথায় কোনো পদ্ধতিই নয়-এই বিচার জনসমক্ষে হতে হবে। এই শর্তগুলো পূরণ না করে কয়লা তোলা উন্নয়ন নয়, লুট।

যা এখনই করা যায় : সংকট থেকে বেরোনোর পথ আছে এবং তার কোনোটির জন্যই ফুলবাড়ীর মাটি খুঁড়তে হয় না।

স্বল্প মেয়াদে : অবৈধ সংযোগ বন্ধ করে চুরি যাওয়া গ্যাস উদ্ধার; বন্ধ ও কম উৎপাদনশীল কূপের তালিকা প্রকাশ করে দ্রুত ওয়ার্কওভার; ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জের গ্যাস জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করা; অলস এলপিজি অবকাঠামো কাজে লাগানো; বড়পুকুরিয়ার অচল ইউনিট দুটি সচল করা; জ্বালানি দক্ষতাকে জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত করা।

মধ্যমেয়াদে : ত্রিমাত্রিক জরিপের এলাকা বহু গুণ বাড়ানো, রিগ ও গভীর খননে বিনিয়োগ, বাপেক্সকে প্রকৃত রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান শক্তিতে রূপান্তর, সমুদ্রভাগে দ্রুত ও স্বচ্ছ অনুসন্ধান, ছাদ-সৌরশক্তি ও ইউনিয়নভিত্তিক সৌরশক্তিকে করপোরেট প্রকল্প নয়, সামাজিক মালিকানায় বিস্তার।

আর সবকিছুর ওপরে : সব বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্টের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অংশ প্রকাশ, প্রকাশ্য নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে অলস কেন্দ্রগুলোর দায় নির্ধারণ এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে আনুষ্ঠানিকতার প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকৃত জননিয়ন্ত্রকে রূপান্তর। জনগণ জানবে না, অথচ টাকা দেবে-এই ব্যবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না।

যেহেতু আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন জ্বালানি নীতি ও ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা আসছে, দাবিটি এখনই তোলা দরকার, খসড়া প্রকাশ করে জনমত নেওয়া হোক, সংসদে বিতর্ক হোক, বিভাগীয় শহরগুলোতে উন্মুক্ত শুনানি হোক এবং গ্যাস, কয়লা, পারমাণবিকসহ প্রতিটি অধ্যায়ের জন্য প্রকৌশলী, ভূতাত্ত্বিক, কৃষি ও পানিবিজ্ঞানী, স্থানীয় প্রতিনিধি ও নাগরিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্বাধীন মূল্যায়ন কমিটি গঠিত হোক।

একটি জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনা কমিশনের কথাও ভাবা যায়, যা মন্ত্রণালয়ের দপ্তর নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, চুক্তি মূল্যায়ন ও জ্বালানি মিশ্রণ নির্ধারণের একটি জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান। নীতি যদি ঘোষণার আগে জনগণের সামনে না আসে, তবে সেটি জাতীয় নীতি নয়, কেবল একটি দপ্তরের সিদ্ধান্ত, যা পরের সরকার এসে আবার বদলে দেবে।

ফুলবাড়ী ২০ বছর আগে একটি প্রশ্ন রেখে গিয়েছিল উন্নয়ন কার? প্রশ্নটির উত্তর রাষ্ট্র আজও দেয়নি। বরং প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য নতুন করে সেই একই প্রকল্পের কাছে ফিরে যাওয়া হচ্ছে, কেবল কোম্পানির নাম বদলে।

ফুলবাড়ী তাই এখনো অতীত নয়, ফুলবাড়ী ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আর প্রশ্নটি খুব সরল-বাংলাদেশ কি নিজের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণ করবে, নাকি করবে বাজার, ঋণদাতা আর পাঁচতারা হোটেলের সভাকক্ষ? আর এখানেই নিহিত জ্বালানি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।