ঢাকা ০৭:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদের শিরোনাম :
পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়? জেডএফসি-২: বাংলাদেশের কমব্যাট স্পোর্টসে নতুন দিগন্ত মোংলায়  জীবাশ্ম জ্বালানির নতুন প্রকল্প না করার দাবিতে মানববন্ধন রাজশাহীতে নারীসহ আলোচিত সাবেক ওসি মাহবুব আলম আটক  বাউফলে তিন লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে দোকানে তালা দেওয়ার অভিযোগ যুবদল কর্মীর বিরুদ্ধে ভোলায় ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে নারীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ মাদারীপুরে বেশি লাভের আশায় পচে গেল ৩ কোটি টাকার আলু পাথরঘাটায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাবিতে মানববন্ধন ভোলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ড্রেজার-বাল্কহেডসহ আটক ৭

কলেরার উচ্চ ঝুঁকিতে দেশের ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ 

  • মধুমতি ডেস্ক :
  • আপডেটের সময় : ০৬:৫০:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
  • ১৬ সময়-দৃশ্য

দেশে প্রতিবছর এক হাজার জনে ১ দশমিক ৬৪ জন কলেরায় সংক্রমিত হচ্ছেন। উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ও কলেরাপ্রবণ এলাকাগুলোতে এই হার প্রতি হাজারে দুজনের বেশি। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৯৫ হাজার ২০৯ জন মানুষ কলেরার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে দেশের ঝুকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’। এই কর্মসূচির আওতায় দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ১৪টি উপজেলা ও থানায় এক বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী গর্ভবতী নারী ব্যতীত সব নাগরিককে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ওরাল কলেরা টিকা দেওয়া হবে। দুই রাউন্ডে পরিচালিত এই ক্যাম্পেইনে সর্বমোট ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বুধবার সকালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নগর ভবন অডিটোরিয়ামে ‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’ অনুষ্ঠানে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের ডায়রিয়া ও কলেরাপ্রবণ দেশগুলোতে প্রতিবছর প্রায় ২৯ লাখ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হন। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশীদ মোহামেদ বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্বে অন্তত ১৩০ কোটি মানুষ কলেরার ঝুঁকিতে রয়েছেন, যার একটি বড় অংশই বাস করছেন আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায়।’ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ডা. মো. হালিমুর রশিদ কলেরা পরিস্থিতি নিয়ে নানা তথ্য উপস্থাপন করেছেন।

শুরুতে কলেরার প্রকোপের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে প্রতিবছর কলেরা রোগে প্রায় ১০ লাখের বেশি মানুষ সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের মধ্যে ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। তিনি জানান, সম্প্রতি ঢাকার লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী, কামরাঙ্গীরচর, শেরেবাংলা নগর, খিলক্ষেত ও তেজগাঁও ছাড়াও মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কলেরাসহ অন্য ডায়রিয়াজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব, ঘন ঘন বন্যা এবং যেসব এলাকায় নিরাপদ ও সহজপ্রাপ্য পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সেবায় অপর্যাপ্ততা রয়েছে, সেখানে কলেরাসহ বিভিন্ন ধরনের ডায়রিয়াজাত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এর পাশাপাশি স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সর্বসাধারণের জ্ঞান ও সচেতনতার অভাবও পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। উপকূলীয় এলাকায় পানির লবণাক্ততার পরিবর্তন, নিরাপদ পানি সরবরাহের ঘাটতি এবং তাপমাত্রার তারতম্যকে কলেরা প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

টিকার লক্ষ্যমাত্রায় ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ: ২০৩০ সালের মধ্যে কলেরাজনিত মৃত্যু ৯০ শতাংশ কমানোর বৈশ্বিক লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ জাতীয় কলেরা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া, সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। দুই রাউন্ডে পরিচালিত ওরাল টিকা ক্যাম্পেইনে সর্বমোট ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্যানুযায়ী, আগামী ২২ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম ডোজ এবং ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেওয়া হবে। সম্পূর্ণ সুরক্ষার জন্য ১৪ দিনের ব্যবধানে দুটি ডোজই গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। দুই রাউন্ডের এই কার্যক্রমে মোট ১ কোটি ৩ লাখ ৫০ হাজার ডোজ টিকার প্রয়োজন হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী ও কামরাঙ্গীরচর থানার ১৭টি ওয়ার্ডের ১৯২টি কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে এই টিকা দেওয়া হবে। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের শেরেবাংলা নগর-খিলক্ষেত-তেজগাঁও এলাকায় এবং মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নির্দিষ্ট কিছু উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এ কর্মসূচি পরিচালিত হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকর্তারা জানান, এই কার্যক্রমে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ ‘ঠধীঊচও’ প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধনের মাধ্যমে নিজস্ব ই-হেলথ কার্ড পাবেন। বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের পর গ্যাভি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সহযোগিতায় এই টিকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ‘ভিব্রিও কলেরি’ নামক মুখে খাওয়ার এই টিকা তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়।

কেন মুখে খাওয়ার টিকা: ২০২২ সালে ঢাকায় কলেরার বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে পাঁচটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দুই দফায় মুখে খাওয়ার কলেরা টিকা দেওয়া হয়। এবার সেই টিকা বদলে নিয়ে আসা হয়েছে প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন ‘ভিব্রিও’ কলেরি। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর, বি) সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ডা. ফিরদৌস কাদরী জানান, অতীতে যে টিকা ব্যবহার করা হতো তা মুখে খাওয়ার ছিল না, বরং ইনজেকশন আকারে দিতে হতো। সেই ইনজেকশনে হাতে তীব্র ব্যথা হতো; কিন্তু কোনো কার্যকর সুরক্ষা মিলত না। পরবর্তী সময়ে ব্যাপক গবেষণার পর দেখা যায় যে ওই টিকার কোনো প্রয়োজন বা কার্যকারিতা নেই। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডব্লিউএইচও তা বন্ধ করে দেয়। এরপর মুখে খাওয়ার টিকার ওপর গবেষণা শুরু হয়। গবেষকরা এমন একটি সাশ্রয়ী টিকা নিয়ে কাজ শুরু করেন, যেটি সহজে কেনা যায়, যা কিনা গ্যাভি বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়। ২০২২ সালে ঢাকা শহরে কলেরার বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে মিনিটে একজন করে রোগী আইসিডিডিআরবিতে ভর্তি হন। তাদের সবাই ডিহাইড্রেশনে ভুগছিলেন। তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইপিআই কর্মসূচির কর্মকর্তারা গ্যাভির সহায়তায় দেশের ঝুঁকিপূর্ণ পাঁচটি থানায় ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন পাঠায়। পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে যে ওরাল ভ্যাকসিন নেওয়া এলাকাগুলোতে এখনো কলেরার হার বেশ কমে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল টাস্কফোর্স ফর কলেরার স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ফিরদৌস কাদরীর ধারণা, জাতীয় কলেরা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রথম বছরে কলেরার প্রাদুর্ভাব ৯০ শতাংশ কমে আসতে পারে। তিনি বলেন, ‘অচিরেই দেশে প্রস্তুতকৃত কলেরার টিকার প্রয়োগ শুরু করা সম্ভব হবে।’

সুপেয় পানি, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থায় গুরুত্বারোপ: কলেরা প্রতিরোধে কেবল ভ্যাকসিন-নির্ভরতার ওপর না দাঁড়িয়ে সুপেয় পানি, উন্নত স্যানিটেশনব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রতিনিধিরা। ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশীদ মোহামেদ বলেন, ‘কলেরা প্রতিরোধে কেবল ভ্যাকসিন-নির্ভরতার ওপর না দাঁড়িয়ে সুপেয় পানি, উন্নত স্যানিটেশনব্যবস্থায় জোর দিতে হবে। যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের সুরক্ষা দেওয়াই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।’ ডা. হালিমুর রশীদ জানান, টিকার পাশাপাশি ডায়রিয়া ও পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে পান করা ও রান্নায় শতভাগ নিরাপদ পানির ব্যবহার, সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া এবং খোলা স্থানে মলত্যাগ বর্জনের আহ্বান জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

dainik madhumati

জনপ্রিয় পোস্ট

পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা

কলেরার উচ্চ ঝুঁকিতে দেশের ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ 

আপডেটের সময় : ০৬:৫০:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

দেশে প্রতিবছর এক হাজার জনে ১ দশমিক ৬৪ জন কলেরায় সংক্রমিত হচ্ছেন। উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ও কলেরাপ্রবণ এলাকাগুলোতে এই হার প্রতি হাজারে দুজনের বেশি। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৯৫ হাজার ২০৯ জন মানুষ কলেরার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে দেশের ঝুকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’। এই কর্মসূচির আওতায় দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ১৪টি উপজেলা ও থানায় এক বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী গর্ভবতী নারী ব্যতীত সব নাগরিককে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ওরাল কলেরা টিকা দেওয়া হবে। দুই রাউন্ডে পরিচালিত এই ক্যাম্পেইনে সর্বমোট ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বুধবার সকালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নগর ভবন অডিটোরিয়ামে ‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’ অনুষ্ঠানে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের ডায়রিয়া ও কলেরাপ্রবণ দেশগুলোতে প্রতিবছর প্রায় ২৯ লাখ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হন। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশীদ মোহামেদ বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্বে অন্তত ১৩০ কোটি মানুষ কলেরার ঝুঁকিতে রয়েছেন, যার একটি বড় অংশই বাস করছেন আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায়।’ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ডা. মো. হালিমুর রশিদ কলেরা পরিস্থিতি নিয়ে নানা তথ্য উপস্থাপন করেছেন।

শুরুতে কলেরার প্রকোপের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে প্রতিবছর কলেরা রোগে প্রায় ১০ লাখের বেশি মানুষ সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের মধ্যে ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। তিনি জানান, সম্প্রতি ঢাকার লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী, কামরাঙ্গীরচর, শেরেবাংলা নগর, খিলক্ষেত ও তেজগাঁও ছাড়াও মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কলেরাসহ অন্য ডায়রিয়াজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব, ঘন ঘন বন্যা এবং যেসব এলাকায় নিরাপদ ও সহজপ্রাপ্য পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সেবায় অপর্যাপ্ততা রয়েছে, সেখানে কলেরাসহ বিভিন্ন ধরনের ডায়রিয়াজাত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এর পাশাপাশি স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সর্বসাধারণের জ্ঞান ও সচেতনতার অভাবও পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। উপকূলীয় এলাকায় পানির লবণাক্ততার পরিবর্তন, নিরাপদ পানি সরবরাহের ঘাটতি এবং তাপমাত্রার তারতম্যকে কলেরা প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

টিকার লক্ষ্যমাত্রায় ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ: ২০৩০ সালের মধ্যে কলেরাজনিত মৃত্যু ৯০ শতাংশ কমানোর বৈশ্বিক লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ জাতীয় কলেরা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া, সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। দুই রাউন্ডে পরিচালিত ওরাল টিকা ক্যাম্পেইনে সর্বমোট ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্যানুযায়ী, আগামী ২২ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম ডোজ এবং ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেওয়া হবে। সম্পূর্ণ সুরক্ষার জন্য ১৪ দিনের ব্যবধানে দুটি ডোজই গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। দুই রাউন্ডের এই কার্যক্রমে মোট ১ কোটি ৩ লাখ ৫০ হাজার ডোজ টিকার প্রয়োজন হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী ও কামরাঙ্গীরচর থানার ১৭টি ওয়ার্ডের ১৯২টি কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে এই টিকা দেওয়া হবে। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের শেরেবাংলা নগর-খিলক্ষেত-তেজগাঁও এলাকায় এবং মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নির্দিষ্ট কিছু উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এ কর্মসূচি পরিচালিত হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকর্তারা জানান, এই কার্যক্রমে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ ‘ঠধীঊচও’ প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধনের মাধ্যমে নিজস্ব ই-হেলথ কার্ড পাবেন। বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের পর গ্যাভি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সহযোগিতায় এই টিকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ‘ভিব্রিও কলেরি’ নামক মুখে খাওয়ার এই টিকা তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়।

কেন মুখে খাওয়ার টিকা: ২০২২ সালে ঢাকায় কলেরার বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে পাঁচটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দুই দফায় মুখে খাওয়ার কলেরা টিকা দেওয়া হয়। এবার সেই টিকা বদলে নিয়ে আসা হয়েছে প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন ‘ভিব্রিও’ কলেরি। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর, বি) সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ডা. ফিরদৌস কাদরী জানান, অতীতে যে টিকা ব্যবহার করা হতো তা মুখে খাওয়ার ছিল না, বরং ইনজেকশন আকারে দিতে হতো। সেই ইনজেকশনে হাতে তীব্র ব্যথা হতো; কিন্তু কোনো কার্যকর সুরক্ষা মিলত না। পরবর্তী সময়ে ব্যাপক গবেষণার পর দেখা যায় যে ওই টিকার কোনো প্রয়োজন বা কার্যকারিতা নেই। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডব্লিউএইচও তা বন্ধ করে দেয়। এরপর মুখে খাওয়ার টিকার ওপর গবেষণা শুরু হয়। গবেষকরা এমন একটি সাশ্রয়ী টিকা নিয়ে কাজ শুরু করেন, যেটি সহজে কেনা যায়, যা কিনা গ্যাভি বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়। ২০২২ সালে ঢাকা শহরে কলেরার বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে মিনিটে একজন করে রোগী আইসিডিডিআরবিতে ভর্তি হন। তাদের সবাই ডিহাইড্রেশনে ভুগছিলেন। তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইপিআই কর্মসূচির কর্মকর্তারা গ্যাভির সহায়তায় দেশের ঝুঁকিপূর্ণ পাঁচটি থানায় ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন পাঠায়। পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে যে ওরাল ভ্যাকসিন নেওয়া এলাকাগুলোতে এখনো কলেরার হার বেশ কমে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল টাস্কফোর্স ফর কলেরার স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ফিরদৌস কাদরীর ধারণা, জাতীয় কলেরা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রথম বছরে কলেরার প্রাদুর্ভাব ৯০ শতাংশ কমে আসতে পারে। তিনি বলেন, ‘অচিরেই দেশে প্রস্তুতকৃত কলেরার টিকার প্রয়োগ শুরু করা সম্ভব হবে।’

সুপেয় পানি, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থায় গুরুত্বারোপ: কলেরা প্রতিরোধে কেবল ভ্যাকসিন-নির্ভরতার ওপর না দাঁড়িয়ে সুপেয় পানি, উন্নত স্যানিটেশনব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রতিনিধিরা। ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশীদ মোহামেদ বলেন, ‘কলেরা প্রতিরোধে কেবল ভ্যাকসিন-নির্ভরতার ওপর না দাঁড়িয়ে সুপেয় পানি, উন্নত স্যানিটেশনব্যবস্থায় জোর দিতে হবে। যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের সুরক্ষা দেওয়াই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।’ ডা. হালিমুর রশীদ জানান, টিকার পাশাপাশি ডায়রিয়া ও পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে পান করা ও রান্নায় শতভাগ নিরাপদ পানির ব্যবহার, সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া এবং খোলা স্থানে মলত্যাগ বর্জনের আহ্বান জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।