ঢাকা ০৮:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদের শিরোনাম :
পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়? জেডএফসি-২: বাংলাদেশের কমব্যাট স্পোর্টসে নতুন দিগন্ত মোংলায়  জীবাশ্ম জ্বালানির নতুন প্রকল্প না করার দাবিতে মানববন্ধন রাজশাহীতে নারীসহ আলোচিত সাবেক ওসি মাহবুব আলম আটক  বাউফলে তিন লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে দোকানে তালা দেওয়ার অভিযোগ যুবদল কর্মীর বিরুদ্ধে ভোলায় ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে নারীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ মাদারীপুরে বেশি লাভের আশায় পচে গেল ৩ কোটি টাকার আলু পাথরঘাটায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাবিতে মানববন্ধন ভোলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ড্রেজার-বাল্কহেডসহ আটক ৭

ছাপাখানার সঙ্গে চুক্তি শেষ হলেও নতুন পাঠ্যবই ছাপা শুরু হয়নি, অর্ধশত লটের পুনঃদরপত্রে ছাপা ও সরবরাহে দেরির শঙ্কা

  • মধুমতি ডেস্ক :
  • আপডেটের সময় : ০৬:১৬:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ১২ সময়-দৃশ্য

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এবার প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপাতে দরপত্রও (টেন্ডার) আহ্বান করা হয়েছে আগেভাগে। তথ্যমতে, প্রাক-প্রাথমিকের বই ছাপাতে ছাপাখানার সঙ্গে চুক্তি শেষ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের কয়েকটি শ্রেণির বই ছাপার চুক্তি চলমান। আর অষ্টম-নবমের বইয়ের দরপত্র মূল্যায়নের কাজ শেষ পর্যায়ে। তবে চুক্তি করেও ছাপাখানাগুলো এখনো পাঠ্যবই ছাপানো শুরু করেনি। পাশাপাশি অর্ধশত লটের এক কোটিরও বেশি বইয়ের রি-টেন্ডার বা পুনঃদরপত্র আহ্বান করতে হচ্ছে। এতে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী- ডিসেম্বরের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই তুলে দেওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্মকর্তারা অবশ্য কোনো আশঙ্কা দেখছেন না। তাদের ভাষ্য, যে কোনোভাবেই নভেম্বরের মধ্যে পাঠ্যবই ছাপার কাজ শেষ করবেন তারা। ডিসেম্বরে স্কুলে স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরপরই নতুন শ্রেণির পাঠ্যবই পাবে শিক্ষার্থীরা। পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্মকর্তাদের ‘যে কোনোভাবে’ কাজ শেষ করার এ মানসিকতার সুযোগে ছাপাখানা মালিকরা নিম্নমানের কাগজে তড়িঘড়ি বই ছাপিয়ে পার পেয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, শেষ সময়ে তড়িঘড়ি ছাপানো বইয়ের ইন্সপেকশন তথা তদারকিতে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়। এ সুযোগ নিতে বই ছাপানোর কাজ শেষ সময় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান ছাপাখানা মালিকরা। তাতেই ঘটে বিপত্তি। নিম্নমানের কাগজ ও ছাপা বই যায় শিক্ষার্থীদের হাতে।

কোন শ্রেণিতে পাঠ্যবই কত: এবার প্রাক-প্রাথমিকে ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০ কপি পাঠ্যবই ছাপা হবে। প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ছাপা হবে ৭ কোটি ৬২ লাখ ৯৪ হাজার ৭৫৮ কপি বই। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের ভাষায় লেখা বই প্রয়োজন ১ লাখ ৪২ হাজার ৩৩২ কপি। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মিলিয়ে মোট বই ছাপানো হবে ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩০ কপি। এছাড়া ইবতেদায়ি প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের সংখ্যা ৩ কোটি ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৪০০ কপি। নিম্নমাধ্যমিকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪ কোটি ৩৪ লাখ ৬১ হাজার ৫৭৭ কপি, সপ্তম শ্রেণিতে ৪ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার ৬০১ কপি ও অষ্টমে ৩ কোটি ৯৩ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৫ কপি পাঠ্যবই ছাপানো হবে। মাধ্যমিকে নবম শ্রেণিতে সবচেয়ে বেশি বই। এ শ্রেণির জন্য ছাপা হবে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ২৭ হাজার ২৩৫ কপি পাঠ্যবই। এছাড়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল বই ছাপা হবে ৯ হাজার ৪ কপি।

পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের তথ্যমতে, চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবার নতুন চারটি বিষয় চালু হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণিতে নতুন যুক্ত হওয়া বিষয় দুটি হলো- খেলাধুলা ও আমাদের সংস্কৃতি। এ দুই বিষয়ের বই সংখ্যা ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ২৮ কপি। অন্যদিকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন দুই বিষয় হলো- আনন্দময় শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা। এ দুটি বইয়ের সংখ্যা ৭১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৯০ কপি। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য মোট ৩০ কোটি ৯২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩৯ কপি পাঠ্যবই ছাপানো হবে।

পাঠ্যবই ছাপাতে এবার সরকারের খরচ কত: আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য বই ছাপাতে মোট ১ হাজার ৮৯০ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৩২৮ টাকা ব্যয় হবে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য বই ছাপাতে খরচ হবে ৪৬৯ কোটি ৫৩ লাখ ৪৬ হাজার ৯৩৬ টাকা। নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ি মিলিয়ে ব্যয় হবে ১ হাজার ৪২০ কোটি ৬২ লাখ ৯২ হাজার ৩৯২ টাকা।

বই ছাপার কাজে অগ্রগতি কতটা: এবার বেশ আগেভাগেই পাঠ্যবই ছাপার কাজে হাত দিয়েছে এনসিটিবি। জুন থেকে পর্যায়ক্রমে টেন্ডার প্রকাশ করা হয়। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে কিছু শ্রেণির বইয়ের টেন্ডার ওপেন করা হয়। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বইয়ের সব কাজ শেষে এখন ছাপার অপেক্ষায়। এনসিটিবি সূত্র জানায়, প্রাক-প্রাথমিকের বই ছাপার কাজের চুক্তি শেষ। তবে বই কম হওয়ায় ছাপাখানাগুলো এখনই কাজ শুরু করছে না। তারা অন্য শ্রেণির বইয়ের চুক্তি শেষে একসঙ্গে ছাপাতে চান। এ কারণে চুক্তি শেষ হলেও বই ছাপার কাজ শুরু হয়নি।

পাঠ্যবই ছাপার কাজ পাওয়া একটি বড় ছাপাখানার মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা প্রাক-প্রাথমিকের মাত্র কয়েক লাখ বই পেয়েছি। দুই থেকে তিনদিনে এটা ছাপা শেষ হবে। এ বই এখন ছাপা শেষ করে মাঝে শ্রমিক ও মেশিন বন্ধ রাখলে লোকসান হবে। সেজন্য অন্য শ্রেণির বইয়ের কাজ পেতে অপেক্ষায় আছি। সব পেলে একসঙ্গে কাজ শুরু করবো।

অষ্টম-নবমের পাঠ্যবই নিয়ে যত শঙ্কা: প্রাক-প্রাথমিক থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবই সরকারি ক্রয় অনুমোদন পাওয়ায় ছাপার কাজ শুরু এখন সময়ের ব্যাপার। তবে অষ্টম ও নবম শ্রেণির বইয়ের এখনো ক্রয় অনুমোদন মেলেনি। ফলে এসব বইয়ের অনুমোদনের পর কয়েক ধাপে কিছু প্রক্রিয়া থাকে। সেগুলো সম্পন্ন করে নির্দিষ্ট সময়ে ছাপানো শেষ করা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেন, অন্য শ্রেণির সঙ্গে তুলনা করলে সংখ্যায় প্রায় কাছাকাছি হলে নবম শ্রেণির বইয়ের ফর্মা (১৬ পাতায় এক ফর্মা) বেশি। এ কারণে এ বই ছাপাতে সময়ও লাগবে বেশি, খরচও বেশি।

অর্ধশত লটে রি-টেন্ডার, বই ছাপায় দেরির শঙ্কা: এবার সবমিলিয়ে প্রায় ৭শ লটে ভাগ করে পাঠ্যবই ছাপার কাজ করা হচ্ছে। এর মধ্যে অর্ধশত লটে এক কোটির বেশি বইয়ের রি-টেন্ডার বা পুনঃদরপত্র হচ্ছে। বইগুলো ছাপার কাজ অনেক পিছিয়ে যাবে বলে মনে করছেন খোদ পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্মকর্তারা। টেন্ডার মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকা এনসিটিবির দুজন সদস্য জানান, বই ছাপায় এবারও কিছু সিন্ডিকেট হয়েছে। কিছু লটে মাত্র একটি করে টেন্ডার জমা পড়েছে। যে একজন ছাপাখানা মালিক টেন্ডার জমা দিয়েছেন, তিনি কৌশলে প্রাক্কলিত দরের ৮-৯ শতাংশ বেশি দর দিয়েছেন। অন্য কেউ এসব লটে টেন্ডার জমা না দেওয়ায় তাকেই কাজ দিতে হবে। তবে দর বেশি ও সিন্ডিকেট করায় এসব লটে কাউকে যোগ্য বিবেচনা না করায় পুনরায় টেন্ডার ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এনসিটিবির তথ্যমতে, প্রাক-প্রাথমিকে দুটি লটে রি-টেন্ডার হবে। লট নম্বর হলো- ১২৫ ও ১২৯। প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের ৩১৮, ৩৪৪, ৩৯৪, ৩৯৬ নম্বর লটে পুনরায় টেন্ডার হবে। ইবতেদায়িতে রি-টেন্ডার হবে ২০১৭ নম্বর লটের বই। ষষ্ঠ ও সপ্তমে পাঁচটি করে ১০টি লটে রি-টেন্ডারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। লটগুলো হলো-৬০২, ৬১৯, ৬২৩, ৬৩৭, ৬৪৮, ৭১৩, ৭১৮, ৭৩১, ৭৪৫, ৭৫৭। অষ্টম শ্রেণির বইয়ের দুটি লটেও পুনরায় টেন্ডার প্রকাশ করবে এনসিটিবি।

তবে সবচেয়ে বেশি রি-টেন্ডার হচ্ছে নবম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে। এ শ্রেণির ১৮-২০টি লটের বইয়ের পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হবে। এ লটগুলোতে প্রায় ৬০ লাখ বই রয়েছে। সবমিলিয়ে এক কোটিরও বেশি পাঠ্যবই ছাপাতে পুনরায় টেন্ডারে যেতে হচ্ছে এনসিটিবিকে।

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, ‘প্রতি বছরই কিছু লটের রি-টেন্ডার হয়। এটাও এক ধরনের সিন্ডিকেট। কাউকে কাজ দিতে না চাইলে এনসিটিবির কর্মকর্তারা কিছু লটের রি-টেন্ডার করেন। সেই কাজও নিজেদের পছন্দের লোকের হাতে তুলে দেন। এ অপকৌশলের কারণে বই ছাপাতেও দেরি হয়, আবার সরকারের আর্থিক ক্ষতিও বাড়ে।

আশাবাদী বোর্ড কর্মকর্তারা: রি-টেন্ডার, ছাপা শুরু করতে দেরি ও তড়িঘড়ি বই ছাপাতে গিয়ে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার নিয়ে নানান সমালোচনা চললেও আশাবাদী পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার সার্বিক কাজে তারা এগিয়ে আছেন। এ কারণে তাদের প্রত্যাশা সঠিক সময় বই ছাপার কাজ শেষ হবে।

বই ছাপায় এবার দেরি হবে না বলে দাবি করেছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা। তিনি বলেন, ‘এবার পাঠ্যবই ছাপার কাজ নভেম্বরের মধ্যেই শেষ হবে। ডিসেম্বরে সরকারঘোষিত সময়ে আমরা দেশের উপজেলাগুলোতে বই পৌঁছে দেবো। সেখান থেকে সব বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যাবে। রি-টেন্ডার ইস্যুতে করা এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ফখরুল মাওলা বলেন, কিছু লটে একক টেন্ডার জমা পড়েছে। আবার কিছু লটে সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটেছে। নিয়মের বলয়ে থাকায় কোনো ত্রুটিতে আমরা ছাড় দিইনি। এ কারণে সেগুলোর রি-টেন্ডার হবে। এটাতে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হবে না।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

dainik madhumati

জনপ্রিয় পোস্ট

পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা

ছাপাখানার সঙ্গে চুক্তি শেষ হলেও নতুন পাঠ্যবই ছাপা শুরু হয়নি, অর্ধশত লটের পুনঃদরপত্রে ছাপা ও সরবরাহে দেরির শঙ্কা

আপডেটের সময় : ০৬:১৬:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এবার প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপাতে দরপত্রও (টেন্ডার) আহ্বান করা হয়েছে আগেভাগে। তথ্যমতে, প্রাক-প্রাথমিকের বই ছাপাতে ছাপাখানার সঙ্গে চুক্তি শেষ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের কয়েকটি শ্রেণির বই ছাপার চুক্তি চলমান। আর অষ্টম-নবমের বইয়ের দরপত্র মূল্যায়নের কাজ শেষ পর্যায়ে। তবে চুক্তি করেও ছাপাখানাগুলো এখনো পাঠ্যবই ছাপানো শুরু করেনি। পাশাপাশি অর্ধশত লটের এক কোটিরও বেশি বইয়ের রি-টেন্ডার বা পুনঃদরপত্র আহ্বান করতে হচ্ছে। এতে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী- ডিসেম্বরের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই তুলে দেওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্মকর্তারা অবশ্য কোনো আশঙ্কা দেখছেন না। তাদের ভাষ্য, যে কোনোভাবেই নভেম্বরের মধ্যে পাঠ্যবই ছাপার কাজ শেষ করবেন তারা। ডিসেম্বরে স্কুলে স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরপরই নতুন শ্রেণির পাঠ্যবই পাবে শিক্ষার্থীরা। পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্মকর্তাদের ‘যে কোনোভাবে’ কাজ শেষ করার এ মানসিকতার সুযোগে ছাপাখানা মালিকরা নিম্নমানের কাগজে তড়িঘড়ি বই ছাপিয়ে পার পেয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, শেষ সময়ে তড়িঘড়ি ছাপানো বইয়ের ইন্সপেকশন তথা তদারকিতে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়। এ সুযোগ নিতে বই ছাপানোর কাজ শেষ সময় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান ছাপাখানা মালিকরা। তাতেই ঘটে বিপত্তি। নিম্নমানের কাগজ ও ছাপা বই যায় শিক্ষার্থীদের হাতে।

কোন শ্রেণিতে পাঠ্যবই কত: এবার প্রাক-প্রাথমিকে ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০ কপি পাঠ্যবই ছাপা হবে। প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ছাপা হবে ৭ কোটি ৬২ লাখ ৯৪ হাজার ৭৫৮ কপি বই। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের ভাষায় লেখা বই প্রয়োজন ১ লাখ ৪২ হাজার ৩৩২ কপি। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মিলিয়ে মোট বই ছাপানো হবে ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩০ কপি। এছাড়া ইবতেদায়ি প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের সংখ্যা ৩ কোটি ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৪০০ কপি। নিম্নমাধ্যমিকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৪ কোটি ৩৪ লাখ ৬১ হাজার ৫৭৭ কপি, সপ্তম শ্রেণিতে ৪ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার ৬০১ কপি ও অষ্টমে ৩ কোটি ৯৩ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৫ কপি পাঠ্যবই ছাপানো হবে। মাধ্যমিকে নবম শ্রেণিতে সবচেয়ে বেশি বই। এ শ্রেণির জন্য ছাপা হবে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ২৭ হাজার ২৩৫ কপি পাঠ্যবই। এছাড়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল বই ছাপা হবে ৯ হাজার ৪ কপি।

পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের তথ্যমতে, চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবার নতুন চারটি বিষয় চালু হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণিতে নতুন যুক্ত হওয়া বিষয় দুটি হলো- খেলাধুলা ও আমাদের সংস্কৃতি। এ দুই বিষয়ের বই সংখ্যা ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ২৮ কপি। অন্যদিকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন দুই বিষয় হলো- আনন্দময় শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা। এ দুটি বইয়ের সংখ্যা ৭১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৯০ কপি। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য মোট ৩০ কোটি ৯২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩৯ কপি পাঠ্যবই ছাপানো হবে।

পাঠ্যবই ছাপাতে এবার সরকারের খরচ কত: আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য বই ছাপাতে মোট ১ হাজার ৮৯০ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৩২৮ টাকা ব্যয় হবে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য বই ছাপাতে খরচ হবে ৪৬৯ কোটি ৫৩ লাখ ৪৬ হাজার ৯৩৬ টাকা। নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ি মিলিয়ে ব্যয় হবে ১ হাজার ৪২০ কোটি ৬২ লাখ ৯২ হাজার ৩৯২ টাকা।

বই ছাপার কাজে অগ্রগতি কতটা: এবার বেশ আগেভাগেই পাঠ্যবই ছাপার কাজে হাত দিয়েছে এনসিটিবি। জুন থেকে পর্যায়ক্রমে টেন্ডার প্রকাশ করা হয়। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে কিছু শ্রেণির বইয়ের টেন্ডার ওপেন করা হয়। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বইয়ের সব কাজ শেষে এখন ছাপার অপেক্ষায়। এনসিটিবি সূত্র জানায়, প্রাক-প্রাথমিকের বই ছাপার কাজের চুক্তি শেষ। তবে বই কম হওয়ায় ছাপাখানাগুলো এখনই কাজ শুরু করছে না। তারা অন্য শ্রেণির বইয়ের চুক্তি শেষে একসঙ্গে ছাপাতে চান। এ কারণে চুক্তি শেষ হলেও বই ছাপার কাজ শুরু হয়নি।

পাঠ্যবই ছাপার কাজ পাওয়া একটি বড় ছাপাখানার মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা প্রাক-প্রাথমিকের মাত্র কয়েক লাখ বই পেয়েছি। দুই থেকে তিনদিনে এটা ছাপা শেষ হবে। এ বই এখন ছাপা শেষ করে মাঝে শ্রমিক ও মেশিন বন্ধ রাখলে লোকসান হবে। সেজন্য অন্য শ্রেণির বইয়ের কাজ পেতে অপেক্ষায় আছি। সব পেলে একসঙ্গে কাজ শুরু করবো।

অষ্টম-নবমের পাঠ্যবই নিয়ে যত শঙ্কা: প্রাক-প্রাথমিক থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবই সরকারি ক্রয় অনুমোদন পাওয়ায় ছাপার কাজ শুরু এখন সময়ের ব্যাপার। তবে অষ্টম ও নবম শ্রেণির বইয়ের এখনো ক্রয় অনুমোদন মেলেনি। ফলে এসব বইয়ের অনুমোদনের পর কয়েক ধাপে কিছু প্রক্রিয়া থাকে। সেগুলো সম্পন্ন করে নির্দিষ্ট সময়ে ছাপানো শেষ করা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেন, অন্য শ্রেণির সঙ্গে তুলনা করলে সংখ্যায় প্রায় কাছাকাছি হলে নবম শ্রেণির বইয়ের ফর্মা (১৬ পাতায় এক ফর্মা) বেশি। এ কারণে এ বই ছাপাতে সময়ও লাগবে বেশি, খরচও বেশি।

অর্ধশত লটে রি-টেন্ডার, বই ছাপায় দেরির শঙ্কা: এবার সবমিলিয়ে প্রায় ৭শ লটে ভাগ করে পাঠ্যবই ছাপার কাজ করা হচ্ছে। এর মধ্যে অর্ধশত লটে এক কোটির বেশি বইয়ের রি-টেন্ডার বা পুনঃদরপত্র হচ্ছে। বইগুলো ছাপার কাজ অনেক পিছিয়ে যাবে বলে মনে করছেন খোদ পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্মকর্তারা। টেন্ডার মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকা এনসিটিবির দুজন সদস্য জানান, বই ছাপায় এবারও কিছু সিন্ডিকেট হয়েছে। কিছু লটে মাত্র একটি করে টেন্ডার জমা পড়েছে। যে একজন ছাপাখানা মালিক টেন্ডার জমা দিয়েছেন, তিনি কৌশলে প্রাক্কলিত দরের ৮-৯ শতাংশ বেশি দর দিয়েছেন। অন্য কেউ এসব লটে টেন্ডার জমা না দেওয়ায় তাকেই কাজ দিতে হবে। তবে দর বেশি ও সিন্ডিকেট করায় এসব লটে কাউকে যোগ্য বিবেচনা না করায় পুনরায় টেন্ডার ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এনসিটিবির তথ্যমতে, প্রাক-প্রাথমিকে দুটি লটে রি-টেন্ডার হবে। লট নম্বর হলো- ১২৫ ও ১২৯। প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের ৩১৮, ৩৪৪, ৩৯৪, ৩৯৬ নম্বর লটে পুনরায় টেন্ডার হবে। ইবতেদায়িতে রি-টেন্ডার হবে ২০১৭ নম্বর লটের বই। ষষ্ঠ ও সপ্তমে পাঁচটি করে ১০টি লটে রি-টেন্ডারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। লটগুলো হলো-৬০২, ৬১৯, ৬২৩, ৬৩৭, ৬৪৮, ৭১৩, ৭১৮, ৭৩১, ৭৪৫, ৭৫৭। অষ্টম শ্রেণির বইয়ের দুটি লটেও পুনরায় টেন্ডার প্রকাশ করবে এনসিটিবি।

তবে সবচেয়ে বেশি রি-টেন্ডার হচ্ছে নবম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে। এ শ্রেণির ১৮-২০টি লটের বইয়ের পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হবে। এ লটগুলোতে প্রায় ৬০ লাখ বই রয়েছে। সবমিলিয়ে এক কোটিরও বেশি পাঠ্যবই ছাপাতে পুনরায় টেন্ডারে যেতে হচ্ছে এনসিটিবিকে।

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, ‘প্রতি বছরই কিছু লটের রি-টেন্ডার হয়। এটাও এক ধরনের সিন্ডিকেট। কাউকে কাজ দিতে না চাইলে এনসিটিবির কর্মকর্তারা কিছু লটের রি-টেন্ডার করেন। সেই কাজও নিজেদের পছন্দের লোকের হাতে তুলে দেন। এ অপকৌশলের কারণে বই ছাপাতেও দেরি হয়, আবার সরকারের আর্থিক ক্ষতিও বাড়ে।

আশাবাদী বোর্ড কর্মকর্তারা: রি-টেন্ডার, ছাপা শুরু করতে দেরি ও তড়িঘড়ি বই ছাপাতে গিয়ে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার নিয়ে নানান সমালোচনা চললেও আশাবাদী পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার সার্বিক কাজে তারা এগিয়ে আছেন। এ কারণে তাদের প্রত্যাশা সঠিক সময় বই ছাপার কাজ শেষ হবে।

বই ছাপায় এবার দেরি হবে না বলে দাবি করেছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা। তিনি বলেন, ‘এবার পাঠ্যবই ছাপার কাজ নভেম্বরের মধ্যেই শেষ হবে। ডিসেম্বরে সরকারঘোষিত সময়ে আমরা দেশের উপজেলাগুলোতে বই পৌঁছে দেবো। সেখান থেকে সব বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যাবে। রি-টেন্ডার ইস্যুতে করা এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ফখরুল মাওলা বলেন, কিছু লটে একক টেন্ডার জমা পড়েছে। আবার কিছু লটে সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটেছে। নিয়মের বলয়ে থাকায় কোনো ত্রুটিতে আমরা ছাড় দিইনি। এ কারণে সেগুলোর রি-টেন্ডার হবে। এটাতে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হবে না।