ঢাকা ০৮:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদের শিরোনাম :
পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়? জেডএফসি-২: বাংলাদেশের কমব্যাট স্পোর্টসে নতুন দিগন্ত মোংলায়  জীবাশ্ম জ্বালানির নতুন প্রকল্প না করার দাবিতে মানববন্ধন রাজশাহীতে নারীসহ আলোচিত সাবেক ওসি মাহবুব আলম আটক  বাউফলে তিন লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে দোকানে তালা দেওয়ার অভিযোগ যুবদল কর্মীর বিরুদ্ধে ভোলায় ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে নারীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ মাদারীপুরে বেশি লাভের আশায় পচে গেল ৩ কোটি টাকার আলু পাথরঘাটায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাবিতে মানববন্ধন ভোলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ড্রেজার-বাল্কহেডসহ আটক ৭

জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়ছে, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নতুন কৌশল

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামার কারণে গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলাকে উচ্চ ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপরও বাড়ছে চাপ।

বিপিসি-সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি তেল কিনে দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি করায় গত ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পরিমাণ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য ও দেশের অভ্যন্তরীণ বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধানই এ লোকসানের অন্যতম কারণ। একইভাবে এলএনজি আমদানিতেও ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। পেট্রোবাংলার হিসাবে, নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে গত ছয় মাসে এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির উচ্চমূল্যের কারণে এ অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতার পেছনে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কারণ কাজ করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব ফেলছে। তেলের পাশাপাশি গ্যাসের বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের এমন অস্থিরতা সরাসরি অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শিল্পকারখানা ও উৎপাদন কার্যক্রমেও পড়ছে। কোথাও কোথাও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের বাজারে কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন ব্যবস্থায় বিপিসির প্রধান ভূমিকা ছিল। এখন সেই ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে আরও বেশি যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সরকারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে জ্বালানি তেলের বাজার আংশিকভাবে উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিপিসির পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি বাজারে একক নির্ভরতা কমানো গেলে সরবরাহব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়লে আমদানি, মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাজার উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা এবং ভোক্তাস্বার্থ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতে সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চাপ কমানো। এ জন্য বাজার সংস্কার, বেসরকারি অংশগ্রহণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি বাজারের এই পরিবর্তন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নীতিমালার বাস্তবায়ন, বাজার তদারকি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির ওপর। তবে বর্তমান সংকট সামাল দিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার উদ্যোগকে জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

danik madhumati

জনপ্রিয় পোস্ট

পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা

জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়ছে, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নতুন কৌশল

আপডেটের সময় : ০৩:৫৮:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামার কারণে গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলাকে উচ্চ ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপরও বাড়ছে চাপ।

বিপিসি-সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি তেল কিনে দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি করায় গত ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পরিমাণ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য ও দেশের অভ্যন্তরীণ বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধানই এ লোকসানের অন্যতম কারণ। একইভাবে এলএনজি আমদানিতেও ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। পেট্রোবাংলার হিসাবে, নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে গত ছয় মাসে এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির উচ্চমূল্যের কারণে এ অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতার পেছনে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কারণ কাজ করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব ফেলছে। তেলের পাশাপাশি গ্যাসের বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের এমন অস্থিরতা সরাসরি অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শিল্পকারখানা ও উৎপাদন কার্যক্রমেও পড়ছে। কোথাও কোথাও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের বাজারে কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন ব্যবস্থায় বিপিসির প্রধান ভূমিকা ছিল। এখন সেই ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে আরও বেশি যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সরকারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে জ্বালানি তেলের বাজার আংশিকভাবে উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিপিসির পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি বাজারে একক নির্ভরতা কমানো গেলে সরবরাহব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়লে আমদানি, মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাজার উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা এবং ভোক্তাস্বার্থ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতে সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চাপ কমানো। এ জন্য বাজার সংস্কার, বেসরকারি অংশগ্রহণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি বাজারের এই পরিবর্তন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নীতিমালার বাস্তবায়ন, বাজার তদারকি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির ওপর। তবে বর্তমান সংকট সামাল দিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার উদ্যোগকে জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।