ঢাকা ০৭:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদের শিরোনাম :
পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়? জেডএফসি-২: বাংলাদেশের কমব্যাট স্পোর্টসে নতুন দিগন্ত মোংলায়  জীবাশ্ম জ্বালানির নতুন প্রকল্প না করার দাবিতে মানববন্ধন রাজশাহীতে নারীসহ আলোচিত সাবেক ওসি মাহবুব আলম আটক  বাউফলে তিন লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে দোকানে তালা দেওয়ার অভিযোগ যুবদল কর্মীর বিরুদ্ধে ভোলায় ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে নারীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ মাদারীপুরে বেশি লাভের আশায় পচে গেল ৩ কোটি টাকার আলু পাথরঘাটায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাবিতে মানববন্ধন ভোলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ড্রেজার-বাল্কহেডসহ আটক ৭
নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রকল্প নিয়েছে এলজিইডি:

দেশের ১০৮টি উপজেলায় এলজিইডির ফরমায়েশী প্রকল্পে ৮ হাজার কোটি টাকার সেতু

  • মধুমতি ডেস্ক :
  • আপডেটের সময় : ১২:৫৪:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ১৭ সময়-দৃশ্য

# অনিয়ম ও প্রভাবশালী ব্যয়ের ছড়াছড়ি, # ৫০ কোটির বেশি হলে সমীক্ষা বাধ্যতামূলক কিন্তু এই প্রকল্পে কোনো সমীক্ষা করা হয়নি

# এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের র্অথয়ান অস্পষ্ট, # ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণে বরাদ্দ ৮০০ কোটি

দেশের ১০৮টি উপজেলা ও গ্রামীণ সড়কে সেতু নির্মাণের জন্য প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে এলজিইডি। কিন্তু বিশাল এই প্রকল্প প্রস্তাবে মৌলিক শর্তই মানা হয়নি। সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে সমীক্ষা ছাড়াই তৈরি করা হয়েছে প্রকল্প। নেওয়া হয়নি পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে এই প্রকল্পে পরামর্শক ফি, যানবাহনের বিশাল বহর এবং অপ্রাসঙ্গিক ভবন নির্মাণে জন্য রাখা হয়েছে বড় অঙ্কের বরাদ্দ। প্রকল্প প্রস্তাবনায় অপ্রাসঙ্গিক বিভিন্ন খাতকে সরিয়ে রাখা হয়েছে বিলাসী নৌযান এবং প্রকল্পে বাস্তবায়ন ব্যয় প্রস্তাব। অর্থাৎ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো ৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল এই প্রকল্প নিয়েছে এলজিইডি। খোদ পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনায় বিধিমালা লঙ্ঘনসহ নানা আপত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্প প্রস্তাবনা সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে ১০৮টি উপজেলায় সেতু নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়কে দীর্ঘ সেতু নির্মাণ প্রকল্প শীর্ষক প্রকল্পটি নিয়েছে এলজিইডি। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৫৫৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি বছর থেকে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। দেশের ৮টি বিভাগের ৪৭টি জেলার মোট ১০৮টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হওয়ার কথা।

প্রকল্প প্রস্তাবনায় যৌক্তিকতা হিসেবে গ্রামীণ জনপদের উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এলজিইডির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, নদীমাতৃক বাংলাদেশে হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং কৃষি ও অকৃষি পণ্য উৎপাদন কেন্দ্রের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা জরুরি। এতে করে একদিকে যেমন গ্রামীণ মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে, অন্যদিকে হাট-বাজারে কৃষি ও অকৃষি পণ্য সহজে সরবরাহের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন হবে এবং গ্রাম ও শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরি হবে।

তবে এই প্রকল্প প্রস্তাবনায় মানা হয়নি প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারের বিধিমালা। এলজিইডির প্রস্তাবিত প্রকল্পের ওপর গত ৬ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হাসান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় আলোচ্য প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় এলজিইডি সংশ্লিষ্টদের। প্রকল্প প্রস্তাবনায় নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে খাতভিত্তিক ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অংশের ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্র্নিধারণ করতে বলা হয়েছে।পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা অনুযায়ী ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের যে কোনো প্রকল্পের জন্য একটি নিরপেক্ষ ও পেশাদার প্রতিষ্ঠান দিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে হয়। অথচ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে এলজিইডি মৌলিক ও আবশ্যক এই শর্তটি পূরণ করেনি। অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই গ্রামীণ জনপদের ৪৩ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন বলছে, ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে প্রাক্কলিত ব্যয়ের সব বিনিয়োগ প্রকল্প নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ, নিরপেক্ষ ও পেশাদারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি পরামর্শক কর্তৃক আবশ্যিকভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে হবে। তবে এলজিইডির প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়নি এবং ডিপিপিতে সমীক্ষা প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়নি, যা প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অপরিহার্য।

প্রকল্পের প্রস্তাবনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ১৯১টি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি সেতুর ডিজাইন রিভিউ, ৮৫টি সেতুর ডিজাইন প্রস্তুত এবং ৯৬টি সেতুর সম্পূর্ণ নতুন করে সমীক্ষা ও ডিজাইন করার জন্য পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছে, প্রকল্পের জন্য সমীক্ষা ছাড়াই ১৯১টি সেতুর জন্য ৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞমহলে প্রশ্ন উঠেছে।প্রকল্পটির আওতায় ৪৩ হাজার ৮২ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। নিয়মানুযায়ী, ১০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের যে কোনো সেতু নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং বিআইডব্লিউটিএর নেভিগেশনাল ক্লিয়ারেন্স বা নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার প্রত্যয়নপত্র আবশ্যক। কিন্তু ৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে কোনো পরিবেশগত প্রভাব যাচাই কিংবা নৌপথের ছাড়পত্র ডিপিপিতে যুক্ত করা হয়নি। এমনকি নদীপথে নৌযান চলাচলের পথ সুগম রাখতে বিআইডব্লিউটিএর নেভিগেশনাল ক্লিয়ারেন্স এবং হাইড্রোলজিক্যাল ও মরফোলজিক্যাল সমীক্ষার সুপারিশও ডিপিপিতে যুক্ত করা হয়নি।

সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা অনুযায়ী-সাধারণভাবে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ পরিহার করতে হবে। জমি অধিগ্রহণ অনিবার্য হলে জমির পরিমাণ নির্ধারণে রক্ষণশীলতা অবলম্বনসহ কৃষি বা আবাদি জমি অধিগ্রহণ নিরুৎসাহিত করতে হবে।কিন্তু আলোচ্য প্রকল্পের জন্য ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার জন্য ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা। এছাড়া জমি অধিগ্রহণের আগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট জমির বর্তমান ভিডিও চিত্র এবং ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করে ডিপিপিতে সংযুক্ত করার কথা থাকলেও এলজিইডি তা করেনি। অর্থাৎ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।এলজিইডির প্রকল্প প্রস্তাবনা পর্যালোচনায় শুধু বিধি লঙ্ঘন নয়, বিভিন্ন খাতে অত্যাধিক ব্যয় প্রস্তাবসহ নানা অসঙ্গতি দেখা গেছে। এলজিইডির প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে সবচেয়ে অপ্রাসঙ্গিক ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে আইআরটিসি ক্যাপাসিটি বিল্ডিং নির্মাণ। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের এই প্রকল্পের আওতায় গাজীপুর ও কক্সবাজারে দুটি ভবন নির্মাণের জন্য ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে গ্রামীণ সড়কের সেতু নির্মাণের প্রকল্পে কেন গাজীপুর বা কক্সবাজার এলাকায় ভবন নির্মাণ করা হবে, তার কোনো সদুত্তর এলজিইডির প্রস্তাবে নেই। কমিশন মনে করছে, এই ব্যয় প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।

প্রকল্পের ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রকল্পের আওতায় শুধু পরামর্শকদের পেছনে ১৫৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা খরচের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তি পরামর্শকের পেছনে ৯৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং পরামর্শক ফার্মের মাধ্যমে সেতুর ডিজাইন রিভিউ, ভেটিং, মাটি পরীক্ষা, নকশা প্রস্তুত এবং সমীক্ষার জন্য আরও ৫৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হবে পরামর্শকদের পেছনে।

বর্তমানে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সরকারের কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতি থাকলেও এলজিইডির এই প্রকল্পে বিলাসিতার কোনো কমতি নেই। প্রস্তাবিত বাজেটে মাঠ পর্যায়ে যাতায়াতের জন্য ১১০টি মোটরসাইকেল, ১টি জিপ এবং ১টি ডাবল কেবিন পিকআপ ভ্যান কেনার কথা বলা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক যানবাহনের জন্য জ্বালানি বাবদ বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, পেট্রোল ও লুব্রিকেন্ট বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা। গ্যাস ও জ্বালানি বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে আরও ২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, প্রকল্পের আওতায় তেল ও গ্যাস খরচ বাবদই ব্যয় হবে ৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। ১১০টি মোটরবাইকের প্রয়োজনীয়তা এবং এই বিশাল জ্বালানি ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। জিপিএসের নামে বিআরটিএর নতুন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের গাড়ি বহরের সক্ষমতা যাচাই না করেই কেন এই বিশাল কেনাকাটার আয়োজন, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।বর্তমানে বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আলোচ্য প্রকল্পে বৈদেশিক প্রশিক্ষণের নামে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। উপজেলায় এলজিইডির অফিস এবং আবাসনের ব্যবস্থা থাকলে বাড়ি ভাড়ার জন্য ২ কোটি, অনিয়মিত শ্রমিক মজুরি ২ কোটি ৬০ লাখ, অফিস ভবন ভাড়া ১ কোটি ৮০ লাখ, গ্যাস ও জ্বালানি বাবদ ২ কোটি টাকা প্রস্তাবের প্রয়োজনীয়তা জানতে চাওয়া হয়েছে। সরঞ্জাম কেনাকাটাতেও একই ধরনের বিলাসিতা দেখা গেছে। প্রকল্পের আওতায় ২০টি রোড রোলার (১০ টন) এবং ৬টি লিফট কেনার জন্য ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া ৫৫টি কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম এবং ই-মেইল সিকিউরিটি সফটওয়্যারের জন্য ১১ কোটি ১৫ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা প্রকল্পের মোট বাজেটকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি বজ্র নিরোধক যন্ত্রের (লাইটনিং স্পার্ক) জন্য ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে, যা প্রকল্পের মোট বাজেটকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলেছে। আসবাবপত্র ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সমীক্ষা ছাড়া শুধু অনুমানের ভিত্তিতে প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা হলেও বিশাল এই অবকাঠামো নির্মাণের পর সেতুগুলো কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা এক্সিট প্ল্যান ডিপিপিতে নেই। এছাড়া বর্তমানের জনবল কাঠামোর অতিরিক্ত জনবলের বেতন ও ভাতার জন্য প্রায় ১৯.৬৯ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এলজিইডি বর্তমানে যে জনবল ব্যবহার করছে তাদের সাথে সামঞ্জস্য না রেখে কেন এই অতিরিক্ত জনবল এবং তাদের বেতন-ভাতা চাওয়া হলো, তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা কমিশন খুঁজে পায়নি।

ডিপিপি সভায় উপস্থিত থাকা পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, এলজিইডির প্রস্তাবনার প্রকল্প তৈরি এবং অনুমোদন নিয়মনীতি তোয়াক্কা করা হয়নি। ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পে সমীক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও এক্ষেত্রে সেটা করা হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রও নেওয়া হয়নি। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে এত বড় একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া অপ্রাসঙ্গিক ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে অত্যাধিক ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব বিষয়ে পিইসি সভায় জানতে চাওয়া হলে তারা কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। এ কারণে প্রকল্প সংশোধন করে পাঠাতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের দোহাই দিয়ে এলজিইডি যে ৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সাজিয়েছে, তার অধিকাংশ ব্যয়ই যৌক্তিক নয়। প্রয়োজনের তুলনায় ২ গুণের বেশি ব্যয়ে যন্ত্রপাতি কেনা এবং ১ হাজার ৫০০ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সমীক্ষা ছাড়াই কেন এই প্রকল্প অনুমোদনের চেষ্টা চলছে, তা এখন প্রশ্ন। ব্যয়ের পরিকল্পনা সঠিক মূল্যায়ন না করে প্রকল্প প্রস্তাব করা উচিত নয়; এক বাক্যে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। জিওটেকনিক্যাল স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া এসব প্রকল্প নিয়ে অর্থ অপচয় হবে এবং অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন স্থানে ব্রিজ নির্মাণ করা হবে। এরপর গ্যাসের ওপর ব্যবহারের একটি মনিটরিং পরিস্থিতিও তৈরি হবে।

তিনি বলেন, বিদেশ ভ্রমণের মতো বিষয়গুলোতে বর্তমান সরকারের সুস্পষ্ট নীতিগত নির্দেশনা রয়েছে। সেই নির্দেশনা না মানলে এসব প্রকল্পে একেবারেই বিবেচনা বা প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। সাধারণত স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) জমি অধিগ্রহণ করে কাজ করার কথা নয়। যেসব প্রকল্প জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলোতে আগে ডিসি (জেলা প্রশাসক) অফিস থেকে মতামত নিয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত যে, জমিটা আদৌ অধিগ্রহণযোগ্য কি না। তা না হলে প্রকল্পের বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হবে এবং প্রকল্পের মেয়াদ বাড়বে। সেটিও আমাদের সরকারের ব্যয় কমানোর নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। একেবারে প্রকল্প বেলাতেই বিবেচনা করা উচিত নয়।

এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা, ডিজাইন ও গবেষণা ইউনিট) আব্দুর রাজ্জাক টেলিফোনে জানান, প্রকল্পের প্রায় সবকিছুতেই সংশোধন আনা হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ, মনিটরিং ও জিওটেকনিক্যালের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রসহ আরও কিছু বিষয় যোগ করার জন্য বলা হয়েছে। আমরা এখন প্রয়োজনীয় সমীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করছি।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, ২০২৩ সালে প্রকল্পটির ডিপিপি প্রণয়নের সময় কিছু বিষয় বাদ পড়ে থাকতে পারে। এ জন্য ডিপিপি ফেরত দেওয়া হয়েছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্পটি ২০২৩ সালে উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়কে দীর্ঘ সেতু নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পে ৯৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এরপর ডিপিপি সংশোধন করে ৫৮ কোটি টাকা থেকে তা বাড়িয়ে ৯৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২৪ সালে প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে ও জনস্বার্থে ফিজ সংখ্যা পর্যালোচনা করে ২ বছর পর চলতি বছরের ১৩ জুলাই ২ হাজার ৯৫৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ডিপিপি পুনর্গঠন করে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

dainik madhumati

জনপ্রিয় পোস্ট

পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা

নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রকল্প নিয়েছে এলজিইডি:

দেশের ১০৮টি উপজেলায় এলজিইডির ফরমায়েশী প্রকল্পে ৮ হাজার কোটি টাকার সেতু

আপডেটের সময় : ১২:৫৪:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

# অনিয়ম ও প্রভাবশালী ব্যয়ের ছড়াছড়ি, # ৫০ কোটির বেশি হলে সমীক্ষা বাধ্যতামূলক কিন্তু এই প্রকল্পে কোনো সমীক্ষা করা হয়নি

# এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের র্অথয়ান অস্পষ্ট, # ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণে বরাদ্দ ৮০০ কোটি

দেশের ১০৮টি উপজেলা ও গ্রামীণ সড়কে সেতু নির্মাণের জন্য প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে এলজিইডি। কিন্তু বিশাল এই প্রকল্প প্রস্তাবে মৌলিক শর্তই মানা হয়নি। সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে সমীক্ষা ছাড়াই তৈরি করা হয়েছে প্রকল্প। নেওয়া হয়নি পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে এই প্রকল্পে পরামর্শক ফি, যানবাহনের বিশাল বহর এবং অপ্রাসঙ্গিক ভবন নির্মাণে জন্য রাখা হয়েছে বড় অঙ্কের বরাদ্দ। প্রকল্প প্রস্তাবনায় অপ্রাসঙ্গিক বিভিন্ন খাতকে সরিয়ে রাখা হয়েছে বিলাসী নৌযান এবং প্রকল্পে বাস্তবায়ন ব্যয় প্রস্তাব। অর্থাৎ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো ৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল এই প্রকল্প নিয়েছে এলজিইডি। খোদ পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনায় বিধিমালা লঙ্ঘনসহ নানা আপত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্প প্রস্তাবনা সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে ১০৮টি উপজেলায় সেতু নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়কে দীর্ঘ সেতু নির্মাণ প্রকল্প শীর্ষক প্রকল্পটি নিয়েছে এলজিইডি। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৫৫৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি বছর থেকে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। দেশের ৮টি বিভাগের ৪৭টি জেলার মোট ১০৮টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হওয়ার কথা।

প্রকল্প প্রস্তাবনায় যৌক্তিকতা হিসেবে গ্রামীণ জনপদের উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এলজিইডির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, নদীমাতৃক বাংলাদেশে হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং কৃষি ও অকৃষি পণ্য উৎপাদন কেন্দ্রের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা জরুরি। এতে করে একদিকে যেমন গ্রামীণ মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে, অন্যদিকে হাট-বাজারে কৃষি ও অকৃষি পণ্য সহজে সরবরাহের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন হবে এবং গ্রাম ও শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরি হবে।

তবে এই প্রকল্প প্রস্তাবনায় মানা হয়নি প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারের বিধিমালা। এলজিইডির প্রস্তাবিত প্রকল্পের ওপর গত ৬ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হাসান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় আলোচ্য প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় এলজিইডি সংশ্লিষ্টদের। প্রকল্প প্রস্তাবনায় নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে খাতভিত্তিক ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অংশের ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্র্নিধারণ করতে বলা হয়েছে।পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা অনুযায়ী ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের যে কোনো প্রকল্পের জন্য একটি নিরপেক্ষ ও পেশাদার প্রতিষ্ঠান দিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে হয়। অথচ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে এলজিইডি মৌলিক ও আবশ্যক এই শর্তটি পূরণ করেনি। অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই গ্রামীণ জনপদের ৪৩ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন বলছে, ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে প্রাক্কলিত ব্যয়ের সব বিনিয়োগ প্রকল্প নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ, নিরপেক্ষ ও পেশাদারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি পরামর্শক কর্তৃক আবশ্যিকভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে হবে। তবে এলজিইডির প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়নি এবং ডিপিপিতে সমীক্ষা প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়নি, যা প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অপরিহার্য।

প্রকল্পের প্রস্তাবনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ১৯১টি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি সেতুর ডিজাইন রিভিউ, ৮৫টি সেতুর ডিজাইন প্রস্তুত এবং ৯৬টি সেতুর সম্পূর্ণ নতুন করে সমীক্ষা ও ডিজাইন করার জন্য পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছে, প্রকল্পের জন্য সমীক্ষা ছাড়াই ১৯১টি সেতুর জন্য ৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞমহলে প্রশ্ন উঠেছে।প্রকল্পটির আওতায় ৪৩ হাজার ৮২ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। নিয়মানুযায়ী, ১০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের যে কোনো সেতু নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং বিআইডব্লিউটিএর নেভিগেশনাল ক্লিয়ারেন্স বা নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার প্রত্যয়নপত্র আবশ্যক। কিন্তু ৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে কোনো পরিবেশগত প্রভাব যাচাই কিংবা নৌপথের ছাড়পত্র ডিপিপিতে যুক্ত করা হয়নি। এমনকি নদীপথে নৌযান চলাচলের পথ সুগম রাখতে বিআইডব্লিউটিএর নেভিগেশনাল ক্লিয়ারেন্স এবং হাইড্রোলজিক্যাল ও মরফোলজিক্যাল সমীক্ষার সুপারিশও ডিপিপিতে যুক্ত করা হয়নি।

সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা অনুযায়ী-সাধারণভাবে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ পরিহার করতে হবে। জমি অধিগ্রহণ অনিবার্য হলে জমির পরিমাণ নির্ধারণে রক্ষণশীলতা অবলম্বনসহ কৃষি বা আবাদি জমি অধিগ্রহণ নিরুৎসাহিত করতে হবে।কিন্তু আলোচ্য প্রকল্পের জন্য ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার জন্য ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা। এছাড়া জমি অধিগ্রহণের আগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট জমির বর্তমান ভিডিও চিত্র এবং ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করে ডিপিপিতে সংযুক্ত করার কথা থাকলেও এলজিইডি তা করেনি। অর্থাৎ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।এলজিইডির প্রকল্প প্রস্তাবনা পর্যালোচনায় শুধু বিধি লঙ্ঘন নয়, বিভিন্ন খাতে অত্যাধিক ব্যয় প্রস্তাবসহ নানা অসঙ্গতি দেখা গেছে। এলজিইডির প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে সবচেয়ে অপ্রাসঙ্গিক ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে আইআরটিসি ক্যাপাসিটি বিল্ডিং নির্মাণ। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের এই প্রকল্পের আওতায় গাজীপুর ও কক্সবাজারে দুটি ভবন নির্মাণের জন্য ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে গ্রামীণ সড়কের সেতু নির্মাণের প্রকল্পে কেন গাজীপুর বা কক্সবাজার এলাকায় ভবন নির্মাণ করা হবে, তার কোনো সদুত্তর এলজিইডির প্রস্তাবে নেই। কমিশন মনে করছে, এই ব্যয় প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।

প্রকল্পের ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রকল্পের আওতায় শুধু পরামর্শকদের পেছনে ১৫৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা খরচের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তি পরামর্শকের পেছনে ৯৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং পরামর্শক ফার্মের মাধ্যমে সেতুর ডিজাইন রিভিউ, ভেটিং, মাটি পরীক্ষা, নকশা প্রস্তুত এবং সমীক্ষার জন্য আরও ৫৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হবে পরামর্শকদের পেছনে।

বর্তমানে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সরকারের কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতি থাকলেও এলজিইডির এই প্রকল্পে বিলাসিতার কোনো কমতি নেই। প্রস্তাবিত বাজেটে মাঠ পর্যায়ে যাতায়াতের জন্য ১১০টি মোটরসাইকেল, ১টি জিপ এবং ১টি ডাবল কেবিন পিকআপ ভ্যান কেনার কথা বলা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক যানবাহনের জন্য জ্বালানি বাবদ বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, পেট্রোল ও লুব্রিকেন্ট বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা। গ্যাস ও জ্বালানি বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে আরও ২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, প্রকল্পের আওতায় তেল ও গ্যাস খরচ বাবদই ব্যয় হবে ৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। ১১০টি মোটরবাইকের প্রয়োজনীয়তা এবং এই বিশাল জ্বালানি ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। জিপিএসের নামে বিআরটিএর নতুন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের গাড়ি বহরের সক্ষমতা যাচাই না করেই কেন এই বিশাল কেনাকাটার আয়োজন, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।বর্তমানে বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আলোচ্য প্রকল্পে বৈদেশিক প্রশিক্ষণের নামে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। উপজেলায় এলজিইডির অফিস এবং আবাসনের ব্যবস্থা থাকলে বাড়ি ভাড়ার জন্য ২ কোটি, অনিয়মিত শ্রমিক মজুরি ২ কোটি ৬০ লাখ, অফিস ভবন ভাড়া ১ কোটি ৮০ লাখ, গ্যাস ও জ্বালানি বাবদ ২ কোটি টাকা প্রস্তাবের প্রয়োজনীয়তা জানতে চাওয়া হয়েছে। সরঞ্জাম কেনাকাটাতেও একই ধরনের বিলাসিতা দেখা গেছে। প্রকল্পের আওতায় ২০টি রোড রোলার (১০ টন) এবং ৬টি লিফট কেনার জন্য ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া ৫৫টি কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম এবং ই-মেইল সিকিউরিটি সফটওয়্যারের জন্য ১১ কোটি ১৫ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা প্রকল্পের মোট বাজেটকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি বজ্র নিরোধক যন্ত্রের (লাইটনিং স্পার্ক) জন্য ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে, যা প্রকল্পের মোট বাজেটকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলেছে। আসবাবপত্র ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সমীক্ষা ছাড়া শুধু অনুমানের ভিত্তিতে প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা হলেও বিশাল এই অবকাঠামো নির্মাণের পর সেতুগুলো কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা এক্সিট প্ল্যান ডিপিপিতে নেই। এছাড়া বর্তমানের জনবল কাঠামোর অতিরিক্ত জনবলের বেতন ও ভাতার জন্য প্রায় ১৯.৬৯ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এলজিইডি বর্তমানে যে জনবল ব্যবহার করছে তাদের সাথে সামঞ্জস্য না রেখে কেন এই অতিরিক্ত জনবল এবং তাদের বেতন-ভাতা চাওয়া হলো, তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা কমিশন খুঁজে পায়নি।

ডিপিপি সভায় উপস্থিত থাকা পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, এলজিইডির প্রস্তাবনার প্রকল্প তৈরি এবং অনুমোদন নিয়মনীতি তোয়াক্কা করা হয়নি। ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পে সমীক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও এক্ষেত্রে সেটা করা হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রও নেওয়া হয়নি। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে এত বড় একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া অপ্রাসঙ্গিক ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে অত্যাধিক ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব বিষয়ে পিইসি সভায় জানতে চাওয়া হলে তারা কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। এ কারণে প্রকল্প সংশোধন করে পাঠাতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের দোহাই দিয়ে এলজিইডি যে ৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সাজিয়েছে, তার অধিকাংশ ব্যয়ই যৌক্তিক নয়। প্রয়োজনের তুলনায় ২ গুণের বেশি ব্যয়ে যন্ত্রপাতি কেনা এবং ১ হাজার ৫০০ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সমীক্ষা ছাড়াই কেন এই প্রকল্প অনুমোদনের চেষ্টা চলছে, তা এখন প্রশ্ন। ব্যয়ের পরিকল্পনা সঠিক মূল্যায়ন না করে প্রকল্প প্রস্তাব করা উচিত নয়; এক বাক্যে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। জিওটেকনিক্যাল স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া এসব প্রকল্প নিয়ে অর্থ অপচয় হবে এবং অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন স্থানে ব্রিজ নির্মাণ করা হবে। এরপর গ্যাসের ওপর ব্যবহারের একটি মনিটরিং পরিস্থিতিও তৈরি হবে।

তিনি বলেন, বিদেশ ভ্রমণের মতো বিষয়গুলোতে বর্তমান সরকারের সুস্পষ্ট নীতিগত নির্দেশনা রয়েছে। সেই নির্দেশনা না মানলে এসব প্রকল্পে একেবারেই বিবেচনা বা প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। সাধারণত স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) জমি অধিগ্রহণ করে কাজ করার কথা নয়। যেসব প্রকল্প জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলোতে আগে ডিসি (জেলা প্রশাসক) অফিস থেকে মতামত নিয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত যে, জমিটা আদৌ অধিগ্রহণযোগ্য কি না। তা না হলে প্রকল্পের বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হবে এবং প্রকল্পের মেয়াদ বাড়বে। সেটিও আমাদের সরকারের ব্যয় কমানোর নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। একেবারে প্রকল্প বেলাতেই বিবেচনা করা উচিত নয়।

এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা, ডিজাইন ও গবেষণা ইউনিট) আব্দুর রাজ্জাক টেলিফোনে জানান, প্রকল্পের প্রায় সবকিছুতেই সংশোধন আনা হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ, মনিটরিং ও জিওটেকনিক্যালের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রসহ আরও কিছু বিষয় যোগ করার জন্য বলা হয়েছে। আমরা এখন প্রয়োজনীয় সমীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করছি।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, ২০২৩ সালে প্রকল্পটির ডিপিপি প্রণয়নের সময় কিছু বিষয় বাদ পড়ে থাকতে পারে। এ জন্য ডিপিপি ফেরত দেওয়া হয়েছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্পটি ২০২৩ সালে উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়কে দীর্ঘ সেতু নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পে ৯৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এরপর ডিপিপি সংশোধন করে ৫৮ কোটি টাকা থেকে তা বাড়িয়ে ৯৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২৪ সালে প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে ও জনস্বার্থে ফিজ সংখ্যা পর্যালোচনা করে ২ বছর পর চলতি বছরের ১৩ জুলাই ২ হাজার ৯৫৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ডিপিপি পুনর্গঠন করে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।