ক্রমে কমে আসছে দেশীয় গ্যাসের মজুত। নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রমে গতি না থাকায় আমদানিনির্ভর হচ্ছে এ খাত। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রাপ্তি কমে যাওয়ায় বাড়ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার। তবে দেশে এলপিজির উৎপাদন নামমাত্র। ফলে রান্না থেকে শুরু করে শিল্প ও পরিবহন খাতে ব্যবহৃত এ জ্বালানির প্রায় পুরোটাই নির্ভর করতে হচ্ছে আমদানির ওপর। দীর্ঘমেয়াদি আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতিতে ঝুঁকি দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সমস্যা সমাধানে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দিয়েছেন তারা। সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের হাইড্রোকার্বন ইউনিটের এনার্জি অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্স ডিভিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট সরকারি উৎপাদন ও বেসরকারি আমদানি মিলিয়ে এলপিজির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৩৪ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সরকারি উৎপাদন মাত্র ২০ হাজার ৩৮৬ মেট্রিক টন। বিপিসির অনুমোদিত তিন বেসরকারি রিফাইনারির উৎপাদন ২৫ হাজার ১৯১ টন। বিপরীতে বেসরকারি খাতে আমদানি হয়েছে ১৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৫৭ দশমিক ১৩ মেট্রিক টন, যা মোটের ৯৭ দশমিক ১৪ শতাংশ।
তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড (এলপিজিএল) ২০ হাজার ৪৫০ টন, বিপিসির অনুমোদিত তিন বেসরকারি রিফাইনারির মধ্যে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল ১৯ হাজার ৬১১ টন, অ্যাকুয়া রিফাইনারি ২ হাজার ৮০ টন এবং পারটেক্স পেট্রো ৩ হাজার ৪৯০ টন এলপিজি বাজারে সরবরাহ করে। বেসরকারিভাবে সরবরাহ করা হয় ১৭ লাখ ৬ হাজার ১৯৯ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি উৎপাদন ছিল ১২ হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন। বেসরকারি খাতে আমদানি করা হয় ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৮৬০ মেট্রিক টন। ওই বছর মোট সরবরাহ ছিল প্রায় ১৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সরকারি উৎপাদনের অংশ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৮৮ শতাংশ। বিপরীতে আমদানির অংশ ছিল ৯৯ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ, ওই অর্থবছরেও দেশের এলপিজি সরবরাহের প্রায় পুরোটাই এসেছে বেসরকারি খাতের আমদানির মাধ্যমে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকারি উৎপাদন ১২ হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন এবং বেসরকারি আমদানি ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৮৬০ মেট্রিক টন। সে হিসাবে সরকারি উৎপাদনের অংশ শূন্য দশমিক ৮৮ শতাংশ, আর বেসরকারি আমদানির অংশ ৯৯ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারি উৎপাদন ছিল ১২ হাজার ৩৬১ মেট্রিক টন। একই সময়ে বেসরকারি খাতে এলপিজি আমদানি হয় ১৫ লাখ ৩১ হাজার ২৩১ মেট্রিক টন। মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৫ লাখ ৪৩ হাজার ৫৯২ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সরকারি উৎপাদনের অংশ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৮০ শতাংশ। আমদানির অংশ ছিল ৯৯ দশমিক ২০ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকারি উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ৪৬১ মেট্রিক টন এবং বেসরকারি আমদানি ছিল ১৪ লাখ ২৭ হাজার ৮২৬ মেট্রিক টন। মোট সরবরাহের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৪ লাখ ৪১ হাজার ২৮৭ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সরকারি উৎপাদনের অংশ শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ, আর বেসরকারি আমদানির অংশ ৯৯ দশমিক ০৭ শতাংশ।
সরকারি উৎপাদন বনাম আমদানির চিত্র: পাঁচ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের এলপিজি বাজারে সরাসরি সরকারি উৎপাদনের অংশ কখনোই ১ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি হয়নি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি উৎপাদন আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৬১ দশমিক ২৮ শতাংশ বেড়েছে। ১২ হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন থেকে তা বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৩৮৬ মেট্রিক টন। তবে উৎপাদন বাড়লেও মোট সরবরাহের তুলনায় সরকারি উৎপাদনের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৩০ শতাংশ। এই হিসাব সরকার অনুমোদিত তিন বেসরকারি রিফাইনারি বাদে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি আমদানি আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৮৬০ মেট্রিক টন থেকে আমদানি বেড়ে হয়েছে ১৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৫৭ দশমিক ১৩ মেট্রিক টন। অর্থাৎ, সরকারি উৎপাদন বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও এলপিজি বাজারে এর প্রভাব এখনো খুবই সীমিত। বিপুল পরিমাণ এলপিজি আমদানি করতে হচ্ছে বেসরকারি খাতকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম, ডলার বিনিময় হার, জাহাজভাড়া ও আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের এলপিজির বাজারও সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছে। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি উৎপাদনের তুলনায় বেসরকারি আমদানির পরিমাণ প্রায় ৭৬ গুণ বেশি। অর্থাৎ, দেশে প্রতি ১ মেট্রিক টন সরকারি উৎপাদনের বিপরীতে প্রায় ৭৬ মেট্রিক টন এলপিজি বেসরকারি খাতে আমদানি হয়েছে।
কেন এই আমদানিনির্ভরতা? বাংলাদেশে এলপিজির আমদানিনির্ভরতার মূল কারণ হলো দেশীয় উৎপাদন চাহিদার তুলনায় খুবই কম। প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ ও তেল পরিশোধন থেকে যে পরিমাণ এলপিজি পাওয়া যায়, তা দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে চাহিদার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। এদিকে পাইপলাইনের গ্যাস সংকট ও সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, ডলারের বিনিময় হার ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর দেশের এলপিজি বাজারের নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
দেশে যেভাবে উৎপাদন হয় এলপিজি: ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত (ক্রুড) তেল পরিশোধনের সময় বিভিন্ন উপজাতের পাশাপাশি এলপিজি উৎপাদিত হয়। রিফাইনারির ডিস্টিলেশন ও পরিশোধন প্রক্রিয়ায় ক্রুড তেল থেকে প্রোপেন ও বিউটেনের মতো হালকা হাইড্রোকার্বন আলাদা করা হয়। এসব গ্যাসীয় উপাদান প্রক্রিয়াজাত ও বিশুদ্ধ করে তরল অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়, যা পরবর্তীসময়ে এলপিজি হিসেবে বাজারজাত করা হয়। অর্থাৎ, এখানে এলপিজি মূলত অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। এছাড়া সিলেট গ্যাস ফিল্ডে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সময় গ্যাসের সঙ্গে আসা তরল হাইড্রোকার্বন বা এনজিএল সংগ্রহ করা হয়। তবে সব প্ল্যান্টে এনজিএল উৎপাদন সম্ভব নয়। বিশেষ ধরনের প্ল্যান্টের মাধ্যমে এটি আলাদা করা হয়। কৈলাশটিলা গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদিত এনজিএল প্রক্রিয়াজাত করে এর একটি অংশ থেকে এলপিজি এবং বাকি অংশ থেকে কনডেনসেট তৈরি করা হয়। উৎপাদিত এনজিএলের প্রায় ৪০ শতাংশ এলপিজিতে রূপান্তর করা সম্ভব। এছাড়া রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্রে পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেনের মতো বিভিন্ন বাই-প্রোডাক্টের সঙ্গে সামান্য পরিমাণ এলপিজিও পাওয়া যায়।
সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (এনজিএল অ্যান্ড এলপিজি) প্রকৌশলী মো. শাহজান আলী বলেন, আমাদের অধীনে যে গ্যাস উৎপাদন হয়, এর সঙ্গে যে তেল আসে, সেই তেলের একটি উপাদান হচ্ছে এনজিএল। সব প্ল্যান্টে এই এনজিএল উৎপাদন হয় না। শুধু কৈলাশটিলা কূপে পাওয়া যায়। এই এনজিএল থেকেই এলপিজি পাওয়া যায়। আমাদের যদি ৩৫০ ব্যারেল এনজিএল প্রোডাকশন হয় তাহলে এর মধ্য থেকে ১৫০ ব্যারেল এলএনজি এবং বাকি ২০০ ব্যারেল কনডেনসেট তৈরি হবে।’ এই প্রকৌশলী বলেন, ‘সব প্ল্যান্টে এনজিএল তৈরি হয় না। স্পেশাল টাইপের প্ল্যান্ট প্রয়োজন হয়। যে পরিমাণ এনজিএল পাওয়া যাবে তার ৪০ শতাংশ এলপিজি হবে। উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কারণ গ্যাসের উৎপাদন কমছে। আমরা যখন আরও বেশি ড্রিলিংয়ে যাবো তখন আরও কিছুটা বেশি এনজিএল পাওয়া সম্ভব হবে। তবে দিনদিন উৎপাদন কমা ছাড়া আপাতত কোনো সম্ভাবনা নেই।’ এছাড়া রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্র থেকে পেট্রোল, ডিজেল, অকটেনের মতো বাই প্রোডাক্ট হিসেবে সামান্য এলপিজি আসে। সিলেট গ্যাস ফিল্ডে দৈনিক ৯শ থেকে ১ হাজার বোতল (সাড়ে ১২ কেজির) এলপিজি উৎপাদন সম্ভব হয় বলেও জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম বলেন, ‘আমদানিনির্ভরতা একটি দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ওঠা-নামা করে। আবার কোনো যুদ্ধ বাধলে জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী হবে, তখন দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। দেশীয় সম্পদকে কাজে লাগাতে হবে। তাহলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে।’
মধুমতি ডেস্ক: 


















