ঢাকা ০৭:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদের শিরোনাম :
পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়? জেডএফসি-২: বাংলাদেশের কমব্যাট স্পোর্টসে নতুন দিগন্ত মোংলায়  জীবাশ্ম জ্বালানির নতুন প্রকল্প না করার দাবিতে মানববন্ধন রাজশাহীতে নারীসহ আলোচিত সাবেক ওসি মাহবুব আলম আটক  বাউফলে তিন লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে দোকানে তালা দেওয়ার অভিযোগ যুবদল কর্মীর বিরুদ্ধে ভোলায় ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে নারীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ মাদারীপুরে বেশি লাভের আশায় পচে গেল ৩ কোটি টাকার আলু পাথরঘাটায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাবিতে মানববন্ধন ভোলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ড্রেজার-বাল্কহেডসহ আটক ৭

ধেয়ে আসছে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা , বাংলাদেশে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে ৬ লাখ মানুষ : বিশ্বব্যাংক

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, গ্যাসের সংকটে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, সার উৎপাদন কমে যাওয়া এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার মতো সমস্যায় চাপে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে প্রায় ৬ লাখ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে চলতি বছর দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকা বিপুলসংখ্যক মানুষ সেই সুযোগ হারাতে পারেন। বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের এক মূল্যায়নে এসব আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সরকারকে বাজেট সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে ওই মূল্যায়ন করা হয়। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন থেকে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালেই বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে। চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ সংঘাতের কারণে আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নষ্ট হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বড় প্রভাব পড়ছে জ্বালানি খাতে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার কার্যক্রম ও সার উৎপাদনসব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। জ্বালানির জন্য বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতা এ সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশের মোট প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। অথচ ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ।

অন্যদিকে বাংলাদেশ যে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বা সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলেই বাংলাদেশকে সরাসরি তার প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও জ্বালানির দাম বেড়েছে। পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিকে ফোর্স মেজরঘোষণা করা হয়েছে। এর অর্থ, বিশেষ পরিস্থিতির কারণে চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এর মধ্যে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে। আগের দামের তুলনায় এটি দ্বিগুণেরও বেশি। সরবরাহ সংকটের মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসের জন্য দুটি এলএনজি চালান কিনতে বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিটে ২৪ ডলারের বেশি দিতে হয়েছে। সরকার এখন দেশে আরও বেশি এলএনজি গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা বাড়ানোর পথ খুঁজছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু তেল ও গ্যাসে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে। জ্বালানির বাড়তি দাম ধাপে ধাপে ভোক্তাদের ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দরিদ্র মানুষের। পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে তাদের প্রকৃত আয় কমে যাবে এবং ধনী-গরিবের ব্যবধান আরও বাড়তে পারে। তবে অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জুলাইয়ে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে মূল্যস্ফীতি আরও কমত বলেও তিনি মনে করেন। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে সরকারের ওপরও বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি মোট দেশজ উৎপাদনের ২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সব মিলিয়ে সরকারের মোট ভর্তুকির পরিমাণ ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ব্যয় ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। বাড়তি এই অর্থ জোগাতে গিয়ে সরকারকে অন্য খাতের ব্যয় কমাতে হতে পারে। এর ফলে সামাজিক নিরাপত্তা ও জরুরি প্রয়োজনীয় কর্মসূচিতে সরকারি বরাদ্দ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষিতেও। সারসহ কৃষি উপকরণের সরবরাহে সমস্যা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছোট কৃষকদের। বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন অনেকটাই সারনির্ভর। দেশে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি সার ব্যবহার করা হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি।

এদিকে দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিই গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দামও প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে সারের দাম দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে। জ্বালানি ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব পড়ছে দেশের স্বাস্থ্য খাতেও। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের কারণে প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৬ হাজার ২০০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। দেশের প্রায় ৬৪টি বড় সরকারি হাসপাতালের শুধু বিদ্যুৎ বিলেই মাসে ৬ লাখ থেকে ১১ লাখ ডলার পর্যন্ত ব্যয় হয়। বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি হলে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে জেনারেটর চালাতে হয়, যার ফলে জ্বালানি ব্যয় আরও বাড়ে। ওষুধ শিল্পও এ সংকটের বাইরে নয়। দেশের প্রায় ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানি করে। আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে এসব কাঁচামাল আমদানির খরচ বাড়ে। এ ছাড়া দেশের হাসপাতালগুলোতে ব্যবহৃত ৯০ শতাংশের বেশি চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানি করতে হয়। জাহাজভাড়া ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এসব পণ্যের খরচও বাড়ছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, বাড়তি ব্যয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এমনিতেই দেশের স্বাস্থ্য খাত চাপের মধ্যে রয়েছে। মার্চ থেকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং এতে শত শত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অর্থ ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি মোকাবিলাও কঠিন হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংকের ৬ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কার কিছু লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় নতুন করে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও উৎপাদনের সময় কমানো হয়েছে, আবার জ্বালানি সংকটের কারণে কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কারখানা বন্ধ হওয়া এবং শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঘটনা নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটিই পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে বলে মনে করেন তিনি। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, কর্মসংস্থান নিয়ে বিশ্বব্যাংকের যে আশঙ্কা, তার কিছুটা প্রতিফলন ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

dainik madhumati

জনপ্রিয় পোস্ট

পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা

ধেয়ে আসছে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা , বাংলাদেশে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে ৬ লাখ মানুষ : বিশ্বব্যাংক

আপডেটের সময় : ১২:২১:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, গ্যাসের সংকটে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, সার উৎপাদন কমে যাওয়া এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার মতো সমস্যায় চাপে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে প্রায় ৬ লাখ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে চলতি বছর দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকা বিপুলসংখ্যক মানুষ সেই সুযোগ হারাতে পারেন। বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের এক মূল্যায়নে এসব আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সরকারকে বাজেট সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে ওই মূল্যায়ন করা হয়। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন থেকে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালেই বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে। চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ সংঘাতের কারণে আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নষ্ট হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বড় প্রভাব পড়ছে জ্বালানি খাতে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার কার্যক্রম ও সার উৎপাদনসব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। জ্বালানির জন্য বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতা এ সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশের মোট প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। অথচ ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ।

অন্যদিকে বাংলাদেশ যে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বা সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলেই বাংলাদেশকে সরাসরি তার প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও জ্বালানির দাম বেড়েছে। পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিকে ফোর্স মেজরঘোষণা করা হয়েছে। এর অর্থ, বিশেষ পরিস্থিতির কারণে চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এর মধ্যে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে। আগের দামের তুলনায় এটি দ্বিগুণেরও বেশি। সরবরাহ সংকটের মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসের জন্য দুটি এলএনজি চালান কিনতে বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিটে ২৪ ডলারের বেশি দিতে হয়েছে। সরকার এখন দেশে আরও বেশি এলএনজি গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা বাড়ানোর পথ খুঁজছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু তেল ও গ্যাসে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে। জ্বালানির বাড়তি দাম ধাপে ধাপে ভোক্তাদের ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দরিদ্র মানুষের। পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে তাদের প্রকৃত আয় কমে যাবে এবং ধনী-গরিবের ব্যবধান আরও বাড়তে পারে। তবে অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জুলাইয়ে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে মূল্যস্ফীতি আরও কমত বলেও তিনি মনে করেন। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে সরকারের ওপরও বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি মোট দেশজ উৎপাদনের ২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সব মিলিয়ে সরকারের মোট ভর্তুকির পরিমাণ ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ব্যয় ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। বাড়তি এই অর্থ জোগাতে গিয়ে সরকারকে অন্য খাতের ব্যয় কমাতে হতে পারে। এর ফলে সামাজিক নিরাপত্তা ও জরুরি প্রয়োজনীয় কর্মসূচিতে সরকারি বরাদ্দ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষিতেও। সারসহ কৃষি উপকরণের সরবরাহে সমস্যা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছোট কৃষকদের। বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন অনেকটাই সারনির্ভর। দেশে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি সার ব্যবহার করা হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি।

এদিকে দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিই গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দামও প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে সারের দাম দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে। জ্বালানি ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব পড়ছে দেশের স্বাস্থ্য খাতেও। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের কারণে প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৬ হাজার ২০০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। দেশের প্রায় ৬৪টি বড় সরকারি হাসপাতালের শুধু বিদ্যুৎ বিলেই মাসে ৬ লাখ থেকে ১১ লাখ ডলার পর্যন্ত ব্যয় হয়। বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি হলে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে জেনারেটর চালাতে হয়, যার ফলে জ্বালানি ব্যয় আরও বাড়ে। ওষুধ শিল্পও এ সংকটের বাইরে নয়। দেশের প্রায় ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানি করে। আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে এসব কাঁচামাল আমদানির খরচ বাড়ে। এ ছাড়া দেশের হাসপাতালগুলোতে ব্যবহৃত ৯০ শতাংশের বেশি চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানি করতে হয়। জাহাজভাড়া ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এসব পণ্যের খরচও বাড়ছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, বাড়তি ব্যয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এমনিতেই দেশের স্বাস্থ্য খাত চাপের মধ্যে রয়েছে। মার্চ থেকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং এতে শত শত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অর্থ ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি মোকাবিলাও কঠিন হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংকের ৬ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কার কিছু লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় নতুন করে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও উৎপাদনের সময় কমানো হয়েছে, আবার জ্বালানি সংকটের কারণে কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কারখানা বন্ধ হওয়া এবং শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঘটনা নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটিই পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে বলে মনে করেন তিনি। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, কর্মসংস্থান নিয়ে বিশ্বব্যাংকের যে আশঙ্কা, তার কিছুটা প্রতিফলন ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।