উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে দ্রুত বাড়ছে কাপ্তাই হ্রদের পানি। এরই মধ্যে হ্রদতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন বসতি প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন মানুষ। পানি বেড়ে রাঙামাটির অন্যতম পর্যটন প্রতীক ৩৩৫ ফুট দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতুও তলিয়ে গেছে। সেতুর পাটাতনের ওপর প্রায় এক ফুট পানি ওঠায় পর্যটকদের চলাচল নিয়ে দেখা দিয়েছে নিরাপত্তা শঙ্কা।
শনিবার দুপুর পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১০৫ দশমিক ৬৪ ফুট এমএসএল। হ্রদের সর্বোচ্চ পানি ধারণক্ষমতা ১০৯ ফুট এমএসএল। ফলে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি চলে আসায় বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও হ্রদের পানি ব্যবস্থাপনায় কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়ের গেট খুলে পানি নিষ্কাশনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার দিবাগত রাত ১০টার দিকে কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়ের ১৬টি গেট ৬ ইঞ্চি করে খুলে দেওয়া হতে পারে। এতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯ হাজার কিউসেক পানি হ্রদ থেকে নিষ্কাশিত হবে। তবে হ্রদের পানির উচ্চতা, উজান থেকে আসা পানির প্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী গেট খোলার সময় এগিয়ে বা পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে। ইনফ্লো বাড়লে পর্যায়ক্রমে গেট খোলার পরিমাণও বাড়ানো হতে পারে।
বর্তমানে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন চলছে। এসব ইউনিটের মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩২ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে।
হ্রদের পানি বাড়তে থাকায় রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। বাঘাইছড়ি, লংগদু ও বিলাইছড়িসহ বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও বসতবাড়িতে পানি উঠেছে, কোথাও চলাচলের পথ ডুবে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে হ্রদতীরবর্তী বসতিগুলোতে নতুন করে পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে রাঙামাটি পর্যটন কমপ্লেক্স এলাকার ঝুলন্ত সেতুতে। জেলার অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত ৩৩৫ ফুট দীর্ঘ সেতুটির পাটাতনের ওপর প্রায় এক ফুট পানি উঠে গেছে। ফলে সেতুটির বড় একটি অংশ এখন পানির নিচে।
বর্ষা মৌসুমে প্রতিবছরই হ্রদের পানি বাড়লে ঝুলন্ত সেতুর কিছু অংশ তলিয়ে যায়। তবে এবার সেতুর পাটাতন পর্যন্ত পানি উঠে যাওয়ায় পর্যটকদের চলাচল নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাঙামাটিতে আসা পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এই ঝুলন্ত সেতু। সেতুটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক পর্যটক হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে সেতু এলাকায় সতর্কতা জারি এবং প্রয়োজন হলে সাময়িকভাবে প্রবেশ বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ঝুলন্ত সেতুতে পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে রাঙামাটির পর্যটন ব্যবসায়। পর্যটকদের একটি বড় অংশ সেতুটি দেখতে রাঙামাটিতে আসেন। সেতু বন্ধ হলে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পর্যটকবাহী বোটসহ হ্রদকেন্দ্রিক বিভিন্ন ব্যবসায়ও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে হ্রদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে নৌ-যোগাযোগ, মাছ ধরা এবং হ্রদনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা, বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে আসা পানির প্রবাহ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় স্পিলওয়ের গেট খোলার পরিমাণ বাড়ানো-কমানোর পাশাপাশি হ্রদতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাঙামাটি প্রতিনিধি 


















