ঢাকা ০৮:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদের শিরোনাম :
পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা ডাকসুতে ইতিহাসের বিতর্ক, বাংলাদেশের জন্মপথ কি মুছে ফেলা যায়? জেডএফসি-২: বাংলাদেশের কমব্যাট স্পোর্টসে নতুন দিগন্ত মোংলায়  জীবাশ্ম জ্বালানির নতুন প্রকল্প না করার দাবিতে মানববন্ধন রাজশাহীতে নারীসহ আলোচিত সাবেক ওসি মাহবুব আলম আটক  বাউফলে তিন লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে দোকানে তালা দেওয়ার অভিযোগ যুবদল কর্মীর বিরুদ্ধে ভোলায় ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে নারীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ মাদারীপুরে বেশি লাভের আশায় পচে গেল ৩ কোটি টাকার আলু পাথরঘাটায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাবিতে মানববন্ধন ভোলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ড্রেজার-বাল্কহেডসহ আটক ৭

বিশ্বব্যাপী এইডস মহামারি অবসানে জাতিসংঘ ও ইউএনএইডস নির্ধারিত ৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো পিছিয়ে বাংলাদেশ

২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এইডস মহামারি অবসানের লক্ষ্যে জাতিসংঘ ও ইউএনএইডস নির্ধারিত ৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো পিছিয়ে বাংলাদেশ। দেশে অনুমিত এইডস আক্রান্তদের ৯৫ শতাংশকে শনাক্ত করা, শনাক্ত ব্যক্তিদের ৯৫ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় আনা এবং চিকিৎসাধীনদের ৯৫ শতাংশের ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তিনটি ধাপের কোনোটিতেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশ। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাংলাদেশের অর্জন ৮২-৭৪-৯১ শতাংশ। তৃতীয় স্তরে দেশ লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি থাকলেও প্রথম দুই ধাপে বড় ঘাটতি রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সর্বশেষ তথ্যে এমন চিত্র পাওয়া যায়। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে অনুমিত এইডস আক্রান্তদের ৮২ শতাংশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ চিকিৎসার আওতায় এসেছেন এবং চিকিৎসাধীনদের ৯১ শতাংশের ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।

ফলে আক্রান্তদের শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার আওতায় আনার ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক লজ্জা, কুসংস্কার, বৈষম্য এবং পরিচয় প্রকাশের আশঙ্কায় অনেকেই এইডস পরীক্ষা করাতে চান না। এতে আক্রান্তদের একটি অংশ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এইডস নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আক্রান্ত হলে দ্রুত পরীক্ষা, চিকিৎসা এবং নিয়মিত ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভবএই বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য বন্ধ করতে হবে।

জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইডস সংক্রমণের হার এখনো শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশের নিচে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। ২০২৫ সালে দেশে নতুন করে ১ হাজার ৮৯১ জনের শরীরে এইডস শনাক্ত হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত এক বছরে শনাক্তের সর্বোচ্চ সংখ্যা। চলতি বছরও দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮টি জেলায় আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। চলতি বছরের পূর্ণাঙ্গ হিসাব ডিসেম্বর শেষে প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে। কর্মসূচির তথ্য বলছে, ২০২৫ সাল শেষে দেশে আনুমানিক ১৭ হাজার ৪৮০ জন মানুষ এইডস নিয়ে বসবাস করছেন। এর মধ্যে এ পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৩১৩ জন। গত বছর নতুন শনাক্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৫৬ শতাংশই বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সদস্য। ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত ব্যক্তিদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে সমকামী পুরুষ জনগোষ্ঠী। মোট শনাক্ত ব্যক্তির ৩৪ শতাংশ এই জনগোষ্ঠীর। এ ছাড়া শিরায় মাদক গ্রহণকারী, নারী ও পুরুষ যৌনকর্মী, হিজড়া জনগোষ্ঠী, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মায়ানমারের নাগরিক, অভিবাসীসহ অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এইডস শনাক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রথম এইডস সংক্রমণ শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। এর পর থেকে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশের নিচে রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশকে বৈশ্বিকভাবে কম প্রাদুর্ভাব কিন্তু উচ্চঝুঁকিরদেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ কম হলেও নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। ২০২০ সালের সর্বশেষ জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে এইডস সংক্রমণের হার ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ। পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষদের মধ্যে এ হার ১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং নারী যৌনকর্মীদের মধ্যে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। তবে জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষদের মধ্যে সংক্রমণের প্রবণতা বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইডস প্রতিরোধ ও চিকিৎসাসেবা বাড়াতে বর্তমানে দেশের ৪৪ জেলার ১৩৫টি সেবাকেন্দ্রে কার্যক্রম চলছে। শিরায় মাদক গ্রহণকারী, যৌনকর্মী, পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষ এবং হিজড়া জনগোষ্ঠী এসব সেবা পাচ্ছেন। ২০২৪ থেকে ২০২৬ মেয়াদে বৈশ্বিক তহবিলের সহায়তায় এসব কার্যক্রম চলছে। এ পর্যায়ে মোট ২৭ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ রয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে এইডস সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি এমন ২৩টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জেলার মধ্যে ২০টির সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে এইডস পরীক্ষার ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। সাধারণ রোগী থেকে শুরু করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সদস্য, সবাই এসব কেন্দ্রে পরীক্ষা করাতে পারেন। একসময়ে এসব কেন্দ্রে বছরে প্রায় ৭০ হাজার পরীক্ষা করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বন্ধ থাকায় বর্তমানে পরীক্ষার সংখ্যা কমেছে।

এ ছাড়া নিয়মিত পরীক্ষার সুবিধা নেইএমন এলাকায় মোবাইল ভ্যানের মাধ্যমে এইডস পরীক্ষা করা হচ্ছে। বাস ও রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, হাট-বাজারসহ জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় পরীক্ষার ক্যাম্প পরিচালনা করা হয়। তবে পরীক্ষা বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও জনবল ও কর্মসূচির সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক জায়গায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে দেশের ১৬টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি বিনামূল্যে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ২০১২ সাল থেকে আক্রান্তদের চিকিৎসা পুরোপুরি সরকারি অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় দেওয়া হচ্ছে। তবে শনাক্ত আক্রান্তদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ চিকিৎসার আওতায় থাকায় এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তি চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন।

মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি, এমন এলাকার ১২টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে এইডস, সিফিলিস ও হেপাটাইটিস-সি পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারাগারগুলোর প্রায় ৩৯ শতাংশ বন্দি মাদকসংক্রান্ত মামলার আসামি অথবা মাদক ব্যবহারকারী। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহীর কারাগারে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। আক্রান্ত বন্দিদের কারাগারেই প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। কক্সবাজারের ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও এইডস পরীক্ষা ও চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। তাদের উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। মা থেকে শিশুর মধ্যে এইডস সংক্রমণ প্রতিরোধেও কার্যক্রম চালু রয়েছে। দেশের পাঁচটি মেডিকেল কলেজ ও জেলা পর্যায়ের ২৫০ শয্যার হাসপাতালে গর্ভবতী নারীদের গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় এইডস পরীক্ষা করা হচ্ছে। কোনো গর্ভবতী নারী আক্রান্ত শনাক্ত হলে তাকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা হয়। কক্সবাজারের ২২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হাসপাতালেও এ ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস-এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক ডা. মো. খায়রুজ্জামান বলেন, কয়েক বছর ধরে দেশে এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে আক্রান্তদের শনাক্ত ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তুতিও জোরদার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের ৩৯টি জেলায় এইডস পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৪ জেলায় এইডস পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। ডা. খায়রুজ্জামান বলেন, এ কার্যক্রমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত রাখতে তাদের নিয়মিত আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য হলো, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের গোপনীয়তা বজায় রেখে পরীক্ষার আওতায় আনা এবং যত দ্রুত সম্ভব আক্রান্তদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, এইডস নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসাসেবা বাড়ালেই হবে না। পরীক্ষার সুযোগ আরও সহজলভ্য করতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছে দিতে হবে এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে পর্যটন বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে রোহিঙ্গাদের আগমনের পর এইডস সংক্রমণও বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আমাদের সামাজিক কার্যক্রমের পাশাপাশি অসামাজিক কর্মকাণ্ডও হয়েছে, যা সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের মধ্যে এইচবি সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। তারা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হচ্ছেন না। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের রাষ্ট্রীয় খরচে সার্বক্ষণিক পরিচর্যা ও চিকিৎসার আওতায় আনা প্রয়োজন। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ও হিজড়া জনগোষ্ঠী এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় রেখে সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে তাদের শনাক্ত ও নিয়মিত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পৃথক পরিচয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

dainik madhumati

জনপ্রিয় পোস্ট

পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতায় বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তা

বিশ্বব্যাপী এইডস মহামারি অবসানে জাতিসংঘ ও ইউএনএইডস নির্ধারিত ৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো পিছিয়ে বাংলাদেশ

আপডেটের সময় : ১২:১১:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এইডস মহামারি অবসানের লক্ষ্যে জাতিসংঘ ও ইউএনএইডস নির্ধারিত ৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো পিছিয়ে বাংলাদেশ। দেশে অনুমিত এইডস আক্রান্তদের ৯৫ শতাংশকে শনাক্ত করা, শনাক্ত ব্যক্তিদের ৯৫ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় আনা এবং চিকিৎসাধীনদের ৯৫ শতাংশের ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তিনটি ধাপের কোনোটিতেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশ। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাংলাদেশের অর্জন ৮২-৭৪-৯১ শতাংশ। তৃতীয় স্তরে দেশ লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি থাকলেও প্রথম দুই ধাপে বড় ঘাটতি রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সর্বশেষ তথ্যে এমন চিত্র পাওয়া যায়। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে অনুমিত এইডস আক্রান্তদের ৮২ শতাংশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ চিকিৎসার আওতায় এসেছেন এবং চিকিৎসাধীনদের ৯১ শতাংশের ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।

ফলে আক্রান্তদের শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার আওতায় আনার ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক লজ্জা, কুসংস্কার, বৈষম্য এবং পরিচয় প্রকাশের আশঙ্কায় অনেকেই এইডস পরীক্ষা করাতে চান না। এতে আক্রান্তদের একটি অংশ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এইডস নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আক্রান্ত হলে দ্রুত পরীক্ষা, চিকিৎসা এবং নিয়মিত ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভবএই বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য বন্ধ করতে হবে।

জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইডস সংক্রমণের হার এখনো শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশের নিচে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। ২০২৫ সালে দেশে নতুন করে ১ হাজার ৮৯১ জনের শরীরে এইডস শনাক্ত হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত এক বছরে শনাক্তের সর্বোচ্চ সংখ্যা। চলতি বছরও দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮টি জেলায় আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। চলতি বছরের পূর্ণাঙ্গ হিসাব ডিসেম্বর শেষে প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে। কর্মসূচির তথ্য বলছে, ২০২৫ সাল শেষে দেশে আনুমানিক ১৭ হাজার ৪৮০ জন মানুষ এইডস নিয়ে বসবাস করছেন। এর মধ্যে এ পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৩১৩ জন। গত বছর নতুন শনাক্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৫৬ শতাংশই বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সদস্য। ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত ব্যক্তিদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে সমকামী পুরুষ জনগোষ্ঠী। মোট শনাক্ত ব্যক্তির ৩৪ শতাংশ এই জনগোষ্ঠীর। এ ছাড়া শিরায় মাদক গ্রহণকারী, নারী ও পুরুষ যৌনকর্মী, হিজড়া জনগোষ্ঠী, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মায়ানমারের নাগরিক, অভিবাসীসহ অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এইডস শনাক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রথম এইডস সংক্রমণ শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। এর পর থেকে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশের নিচে রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশকে বৈশ্বিকভাবে কম প্রাদুর্ভাব কিন্তু উচ্চঝুঁকিরদেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ কম হলেও নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। ২০২০ সালের সর্বশেষ জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে এইডস সংক্রমণের হার ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ। পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষদের মধ্যে এ হার ১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং নারী যৌনকর্মীদের মধ্যে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। তবে জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষদের মধ্যে সংক্রমণের প্রবণতা বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইডস প্রতিরোধ ও চিকিৎসাসেবা বাড়াতে বর্তমানে দেশের ৪৪ জেলার ১৩৫টি সেবাকেন্দ্রে কার্যক্রম চলছে। শিরায় মাদক গ্রহণকারী, যৌনকর্মী, পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষ এবং হিজড়া জনগোষ্ঠী এসব সেবা পাচ্ছেন। ২০২৪ থেকে ২০২৬ মেয়াদে বৈশ্বিক তহবিলের সহায়তায় এসব কার্যক্রম চলছে। এ পর্যায়ে মোট ২৭ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ রয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে এইডস সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি এমন ২৩টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জেলার মধ্যে ২০টির সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে এইডস পরীক্ষার ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। সাধারণ রোগী থেকে শুরু করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সদস্য, সবাই এসব কেন্দ্রে পরীক্ষা করাতে পারেন। একসময়ে এসব কেন্দ্রে বছরে প্রায় ৭০ হাজার পরীক্ষা করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বন্ধ থাকায় বর্তমানে পরীক্ষার সংখ্যা কমেছে।

এ ছাড়া নিয়মিত পরীক্ষার সুবিধা নেইএমন এলাকায় মোবাইল ভ্যানের মাধ্যমে এইডস পরীক্ষা করা হচ্ছে। বাস ও রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, হাট-বাজারসহ জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় পরীক্ষার ক্যাম্প পরিচালনা করা হয়। তবে পরীক্ষা বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও জনবল ও কর্মসূচির সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক জায়গায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে দেশের ১৬টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি বিনামূল্যে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ২০১২ সাল থেকে আক্রান্তদের চিকিৎসা পুরোপুরি সরকারি অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় দেওয়া হচ্ছে। তবে শনাক্ত আক্রান্তদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ চিকিৎসার আওতায় থাকায় এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তি চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন।

মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি, এমন এলাকার ১২টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে এইডস, সিফিলিস ও হেপাটাইটিস-সি পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারাগারগুলোর প্রায় ৩৯ শতাংশ বন্দি মাদকসংক্রান্ত মামলার আসামি অথবা মাদক ব্যবহারকারী। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহীর কারাগারে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। আক্রান্ত বন্দিদের কারাগারেই প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। কক্সবাজারের ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও এইডস পরীক্ষা ও চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। তাদের উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। মা থেকে শিশুর মধ্যে এইডস সংক্রমণ প্রতিরোধেও কার্যক্রম চালু রয়েছে। দেশের পাঁচটি মেডিকেল কলেজ ও জেলা পর্যায়ের ২৫০ শয্যার হাসপাতালে গর্ভবতী নারীদের গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় এইডস পরীক্ষা করা হচ্ছে। কোনো গর্ভবতী নারী আক্রান্ত শনাক্ত হলে তাকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা হয়। কক্সবাজারের ২২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হাসপাতালেও এ ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস-এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক ডা. মো. খায়রুজ্জামান বলেন, কয়েক বছর ধরে দেশে এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে আক্রান্তদের শনাক্ত ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তুতিও জোরদার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের ৩৯টি জেলায় এইডস পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৪ জেলায় এইডস পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। ডা. খায়রুজ্জামান বলেন, এ কার্যক্রমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত রাখতে তাদের নিয়মিত আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য হলো, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের গোপনীয়তা বজায় রেখে পরীক্ষার আওতায় আনা এবং যত দ্রুত সম্ভব আক্রান্তদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, এইডস নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসাসেবা বাড়ালেই হবে না। পরীক্ষার সুযোগ আরও সহজলভ্য করতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছে দিতে হবে এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে পর্যটন বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে রোহিঙ্গাদের আগমনের পর এইডস সংক্রমণও বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আমাদের সামাজিক কার্যক্রমের পাশাপাশি অসামাজিক কর্মকাণ্ডও হয়েছে, যা সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের মধ্যে এইচবি সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। তারা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হচ্ছেন না। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের রাষ্ট্রীয় খরচে সার্বক্ষণিক পরিচর্যা ও চিকিৎসার আওতায় আনা প্রয়োজন। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ও হিজড়া জনগোষ্ঠী এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় রেখে সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে তাদের শনাক্ত ও নিয়মিত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পৃথক পরিচয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।