যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন ও মারধরের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় মো. আরমান হোছাইন (২৯) নামে এক ব্যক্তিকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন রাঙামাটির নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে তাকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেলে ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলাটি নারী ও শিশু মামলা নম্বর-৬৬/২৩ হিসেবে নথিভুক্ত হয়। এতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর (সংশোধিত ২০০৩) ১১(গ)/৩০ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। মামলার বাদী মোছা. মিনুয়ারা আক্তার (৩০) এবং প্রধান আসামি তার স্বামী মো. আরমান হোছাইন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর ইসলামী শরিয়ত ও সামাজিক রীতিতে পাঁচ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে আরমান হোছাইনের সঙ্গে মিনুয়ারা আক্তারের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে সন্তান রয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, বিয়ের পাঁচ-ছয় মাস পর থেকেই যৌতুকের জন্য তাকে চাপ দিতে থাকেন স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। সংসার টিকিয়ে রাখার আশায় তিনি বাবার কাছ থেকে কয়েক দফায় মোট ৫ লাখ ৮ হাজার টাকা এনে দেন। পরে স্বামী বিদেশে যাওয়ার কথা বলে আরও দুই লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন।
মামলার আরজিতে বলা হয়, দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মিনুয়ারাকে স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে সন্তানকে নিয়ে ২০২২ সালের ১৫ জানুয়ারি তিনি ভগ্নিপতির বাড়িতে আশ্রয় নেন। সংসার করার জন্য স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান হয়নি। দুই লাখ টাকা না দিলে তাকে আর সংসারে নেওয়া হবে না বলে জানানো হয়।
নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৫ জুন আরমান হোছাইন বাদিনীর বর্তমান ঠিকানা, অর্থাৎ তার ভগ্নিপতির বাড়িতে যান। ওই বছরের ১২ জুন সকালে মিনুয়ারা স্বামীকে সংসারে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করলে আরমান আবারও দুই লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন বলে মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়।
এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে আরমান তাকে কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন বলে অভিযোগ করেন বাদী। একপর্যায়ে চুলের মুঠি ধরে মাটিতে ফেলে বুকে ও পেটে লাথি মারার অভিযোগও করা হয়। পরে আশপাশের লোকজন ও সাক্ষীরা এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ঘটনার পর মিনুয়ারা স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। পরে থানায় মামলা করতে গেলে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি ন্যায়বিচারের আশায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন।
মামলায় বাদীসহ একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ ও শুনানি শেষে আদালত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন। পরে বিচারক মো. আরমান হোছাইনকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করেন।
রায়ের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মাকসুদা হক বলেন, ‘যৌতুকের মতো সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ সবসময় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আইন অনুযায়ী তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের রায় সমাজে যৌতুক ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ইতিবাচক বার্তা দেবে।’
রায় ঘোষণার পর আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়।
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে মামলার বাদী মিনুয়ারা আক্তার বলেন, ‘আমি আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞ। দীর্ঘদিন পর আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি। এ রায়ে আমি সন্তুষ্ট।’
মামলাটি পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মাকসুদা হাবিবের আন্তরিকতার কথাও উল্লেখ করেন মিনুয়ারা। তিনি বলেন, ‘সরকারি কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মাকসুদা হাবিব অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে মামলাটি পরিচালনা করেছেন। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টা ও আদালতের ন্যায়বিচারের কারণে আমি আমার অধিকার পেয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, তা যেন আর কোনো নারীর জীবনে না ঘটে। যৌতুক ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে এ ধরনের শাস্তি ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ কমাতে ভূমিকা রাখবে।’
রাঙামাটি প্রতিনিধি।। 


















