২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় সংসদ ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ১৬টি পরামর্শ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। দুদকের কর্মকর্তা নিয়োগে স্বতন্ত্র ক্যাডার সার্ভিস এবং কর্মচারী নিয়োগে পৃথক, স্বতন্ত্র ও স্বাধীন নিয়োগ বোর্ড গঠনসহ এসব পরামর্শ বাস্তবায়ন করা হলে ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে বলে পর্যবেক্ষণে আশা প্রকাশ করেছিলেন আদালত। ১৫ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণের একটি মামলায় তিতাস গ্যাসের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান সরকার ও টেকনিশিয়ান আব্দুর রহিমের সাজা বাতিল করে হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের একক বেঞ্চ ওই ১৬টি পরামর্শসহ রায় দেন। ২০২৩ সালের ৮ নভেম্বর রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে ১৬টি পরামর্শসহ লিভ টু আপিল করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাষ্ট্রপক্ষ। লিভ টু আপিলের শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর তৎকালীন চেম্বার বিচারপতি এম এনায়েতুর রহীম এক আদেশে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণসহ ১৬টি পরামর্শ স্থগিত করেন। তবে তিতাস গ্যাসের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান সরকারের সাজা বাতিলের রায় বহাল রাখা হয়। টেকনিশিয়ান আব্দুর রহিমের সাজা বাতিলের রায় স্থগিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষ নিয়মিত আপিল করে। ইতোমধ্যে টেকনিশিয়ান আব্দুর রহিম মারা যাওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে করা আপিলটি অকার্যকর হয়ে গেছে। তবে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হাইকোর্টের দেওয়া ১৬টি পরামর্শের বিষয়ে এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। বিষয়টি প্রায় চার বছর ধরে আপিল বিভাগে অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের দেওয়া ১৬টি পরামর্শের মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের জন্য স্বতন্ত্র ক্যাডার সার্ভিস গঠন এবং অধস্তন আদালতের বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়ায় দুদকের কর্মকর্তা নিয়োগ; দুদকের অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগের জন্য পৃথক, স্বতন্ত্র ও স্বাধীন নিয়োগ বোর্ড গঠন; দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণ দাখিল এবং বাধ্যতামূলকভাবে তাঁদের সম্পদের হিসাব কমিশনের ওয়েবসাইটে জনসমক্ষে প্রকাশ; বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্য থেকে দুদকের চেয়ারম্যান এবং হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্য থেকে কমিশনের সদস্য নির্বাচন; সৎ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সমন্বয়ে উচ্চ আদালত ও অধস্তন আদালতের জন্য পৃথক প্রসিকিউশন প্যানেল গঠন এবং প্রতি তিন বছর পর তা পুনর্গঠন; দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান বা তদন্তের জন্য গ্রহণ করা হলে ৩০ দিনের মধ্যে অনুসন্ধানের ফলাফল এবং মামলা দায়েরের ১৫ দিনের মধ্যে মামলার এজাহারের অনুলিপিসহ অভিযোগকারীকে অবহিত করা; অভিযোগ গ্রহণ না করা হলে বা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া না গেলে প্রতিটি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ৩০ দিনের মধ্যে কারণ উল্লেখ করে অভিযোগকারীকে জানানো; অনুসন্ধানের ফলাফলে অভিযোগকারী সংক্ষুব্ধ হলে হলফনামাসহ কারণ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট জেলার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে অভিযোগ দায়েরের সুযোগ দেওয়া; দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া না গেলে কিংবা সত্যতা পাওয়া সত্ত্বেও কমিশন মামলা দায়ের না করলে অভিযোগকারীকে সংশ্লিষ্ট জেলার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মামলা দায়েরের সুযোগ দেওয়া; দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিশেষ জজ নিয়োগ এবং বিশেষ জজ আদালতকে ট্রাইব্যুনালে রূপান্তর করে ‘দুর্নীতি দমন ট্রাইব্যুনাল’ নামকরণ; দুদকের নির্ধারিত পদে কমিশনের বাইরের কোনো কর্মকর্তাকে পদায়ন না করা; দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগ, মামলা, তদন্ত ও অনুসন্ধানের বিষয় এবং ফলাফল মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষাণ্মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তের ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পদের তালিকা কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ; দুদকে কোনো তথ্য চেয়ে বিধি অনুযায়ী আবেদন করা হলে ৩০ দিনের মধ্যে ফলাফল জানানো এবং এ ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুসরণ করা; দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ১৭(ক) ধারার আওতা ও পরিধি বাড়ানো এবং ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স, ১৯৮৬’-এর (জুলাই ২০২০ পর্যন্ত সংশোধিত) ১ থেকে ২৫ নম্বর টেবিলে বর্ণিত সাংবিধানিক দায়মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তফসিলভুক্ত অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্ত পরিচালনার বিধান সংযুক্ত করা; দুর্নীতিবিষয়ক প্রতিটি অনুসন্ধান ও তদন্তে আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরণ করা; এবং ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪, দুর্নীতি কমিশন বিধিমালা, ২০০৯, ক্রিমিনাল ল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৮, প্রিভেনশন অব করাপশন অ্যাক্ট, ১৯৪৭, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯, অপরাধসংক্রান্ত বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তা আইন, ২০১২সহ প্রাসঙ্গিক আইন ও বিধিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা। রায়ের অনুলিপি আইন কমিশনের চেয়ারম্যানকে ই-মেইলে পাঠানোর জন্য রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া রায় ও আদেশের অনুলিপি জাতীয় সংসদের সব সংসদ সদস্য এবং অধস্তন আদালতের সব বিচারককে ই-মেইলে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। মামলায় তিতাস গ্যাসের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান সরকারের পক্ষে শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সেলিহা আক্তার ইসলাম। তিনি জানান, দুদক ও জাতীয় সংসদকে দেওয়া হাইকোর্টের ১৬টি পরামর্শের বিষয়টি আপিল বিভাগে অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। ওই সময়ে দুদকের পক্ষে শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান। বর্তমানে তিনি দুদকের প্যানেল আইনজীবীদের তালিকায় নেই। এ কারণে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংবাদের শিরোনাম :
সংসদ ও দুদককে দেয়া হাইকোর্টের ১৬ পরামর্শ চার বছরেও বাস্তায়ন হয়নি
-
বিশেষ প্রতিনিধি : - আপডেটের সময় : ০৭:১৭:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
- ০ সময়-দৃশ্য
Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট



















