ঢাকা ০৪:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদের শিরোনাম :
তিন দিনের ব্যবধানে কেসিসির দুই চালকের মৃত্যু দাকোপে নদীগর্ভে বেড়িবাঁধ, হুমকিতে ঘরবাড়ি-ফসলি জমি আমার কোনো সঞ্চয় নেই, মেয়েরাই আমার সঞ্চয় : উপকুলে আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন শ্যামনগর উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অনুমোদিত কমিটি ঘোষণা : সভাপতি বিষ্ণুপদ মন্ডল,সাধারণ সম্পাদক কিরণ চ্যাটার্জী ফ্ল্যাটের দাম নাগালে আনতে গৃহঋণে ৫ শতাংশ সুদ চান রিহ্যাব সভাপতি এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপ ২০২৬ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়াঙ্গনে নতুন অধ্যায় ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ অন্যায়ের বিরুদ্ধে গণজোয়ার সৃষ্টি করবে : অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ এমপি খুলনায় লায়ন্স ক্লাবের উদ্যোগে হতদরিদ্রদের মাঝে ঘর, খাদ্য ও সহায়ক উপকরণ বিতরণ এবং মেডিকেল সহায়তা প্রদান রামপালে জেলা পরিষদের মালিকানা জমিতে সুপার মার্কেট নির্মাণে মতবিনিময় সভা ইসলামপুরে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা, মাদকবিরোধী শপথ নিল শতাধিক শিক্ষার্থী

চেয়ারম্যান নেই, সচিবের মৃত্যু—পুঠিয়ার ভাল্লুকগাছি ইউপি, সেবা পেতে নাকাল মানুষ

চেয়ারম্যান নেই। সচিব মারা গিয়েছেন। প্রশাসকের দেখা মিলল না ইউনিয়ন পরিষদে। তালাবন্দি চেয়ারম্যানের ঘর, উদ্যোক্তার কক্ষও। মেম্বারদের হলঘর খোলা থাকলেও নেই কোনও জনপ্রতিনিধি। অথচ বাইরে অপেক্ষায় একের পর এক মানুষ—কারও কলেজে ভর্তি হতে নাগরিকত্ব সনদ দরকার, কারও প্রয়োজন বাবার মৃত্যুসনদ, কেউ আবার ভোটার হওয়ার জন্য এসেছেন প্রত্যয়নপত্র নিতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে তাঁদের।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ৪ নম্বর ভাল্লুকগাছি ইউনিয়ন পরিষদের এই ছবিই এখন কার্যত ‘অভিভাবকহীন’ প্রশাসনের চেহারা তুলে ধরছে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) সকালে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, চেয়ারম্যানের কক্ষে ঝুলছে তালা। মেম্বারদের জন্য নির্ধারিত হলঘর খোলা থাকলেও সেখানে কোনও সদস্যকে পাওয়া যায়নি। উদ্যোক্তার ঘরেও তালা। পরিষদের ভিতরে বসে ছিলেন শুধু হিসাব সহকারী ও দু’জন গ্রাম পুলিশ। বাইরে অপেক্ষা করছিলেন একাধিক সেবাগ্রহীতা।

তাঁদের অভিযোগ, শুধু বুধবার নয়, কয়েক দিন ধরেই একই পরিস্থিতি। জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, নাগরিকত্ব সনদ, প্রত্যয়নপত্র-সহ বিভিন্ন পরিষেবা কার্যত বন্ধ হয়ে রয়েছে। কেউ তিন দিন, কেউ চার দিন ধরে পরিষদে ঘুরছেন। কিন্তু পরিষেবা মিলছে না।

ধোকড়াকুল এলাকার আব্দুল নুরের কথাতেই ধরা পড়েছে সমস্যার গভীরতা। কলেজে ভর্তির জন্য প্রয়োজন নাগরিকত্ব সনদ। সেই সনদের জন্য তিন দিন ধরে ইউনিয়ন পরিষদে ঘুরছেন তিনি। বুধবারও এসেছিলেন। কিন্তু ফিরে যেতে হল খালি হাতেই।

আব্দুল নুর বলেন, “নাগরিকত্ব সনদ না পেলে কলেজে কী ভাবে ভর্তি হব, সেটাই বুঝতে পারছি না। কবে সনদ পাব, সেটাও কেউ বলতে পারছেন না।” একই দশা এক ব্যক্তির। বাবার মৃত্যুর সনদ নিতে বেশ কয়েক দিন ধরে পরিষদে আসছেন তিনি। বুধবারও অপেক্ষা করলেন। শেষ পর্যন্ত সনদ না পেয়েই ফিরতে হল। ভোটার হওয়ার জন্য প্রত্যয়নপত্র ও নাগরিকত্ব সনদ নিতে এসেছিলেন আফসানা মিমি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তাকেও ফিরতে হয়েছে। অর্থাৎ, সরকারি পরিষেবা পাওয়ার জন্য যে ইউনিয়ন পরিষদে মানুষের যাওয়ার কথা, সেখানেই এখন পরিষেবা পেতে গিয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে তাঁদের।

ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন পুঠিয়া উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন। তাঁর দাবি, সচিবের মৃত্যুর পরেই কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি কখনও কাউকে হয়রানি করি না। তবে সচিব মারা যাওয়ার পর একটু সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া আজ আমি অসুস্থ হয়ে পড়ায় পরিষদে যেতে পারিনি।” কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, একজন সচিবের মৃত্যু হলে তাঁর বিকল্প ব্যবস্থা না করে কি দিনের পর দিন ইউনিয়ন পরিষদের পরিষেবা কার্যত অচল হয়ে থাকতে পারে?

পরিষদে উদ্যোক্তার অনুপস্থিতি নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। উদ্যোক্তা মিঠুন ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি ইউনিয়ন পরিষদে না থাকলেও পরিষদের কাজে ব্যস্ত ছিলাম।”

বিষয়টি নিয়ে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত সালমানের বক্তব্য, সচিবের মৃত্যুর কারণেই সাধারণ মানুষকে পরিষেবা পেতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তিনি বলেন, “সচিবের মৃত্যুর কারণে সেবা পেতে সাধারণদের বেগ পেতে হচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে বিষয়টি অবগত করেছি। দ্রুতই এটার একটি ব্যবস্থা হবে, যাতে করে মানুষ আগের মতো সেবা পেতে পারে।”

প্যানেল চেয়ারম্যান, সদস্য এবং উদ্যোক্তার অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ইউএনও বলেন, “আগামীতে সেবা প্রদানকারীরা যাতে উপস্থিত থেকে সেবা দিয়ে থাকেন, সে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

তবে প্রশাসনের এই আশ্বাসের মধ্যে প্রশ্ন একটাই—নতুন সচিব নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষ পরিষেবা পাবেন কী ভাবে?

ভুক্তভোগীদের দাবি, দ্রুত নতুন সচিব নিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসককে নিয়মিত ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত থেকে পরিষেবা কার্যক্রম তদারক করতে হবে। জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারীদের উপস্থিতিও নিশ্চিত করতে হবে। নইলে চেয়ারম্যানহীন, সচিবহীন এবং তালাবন্দি দফতরের এই ছবিই আরও কত দিন চলবে—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরছে ভাল্লুকগাছির মানুষের মুখে। #

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

danik madhumati

জনপ্রিয় পোস্ট

তিন দিনের ব্যবধানে কেসিসির দুই চালকের মৃত্যু

চেয়ারম্যান নেই, সচিবের মৃত্যু—পুঠিয়ার ভাল্লুকগাছি ইউপি, সেবা পেতে নাকাল মানুষ

আপডেটের সময় : ১২:৫৭:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

চেয়ারম্যান নেই। সচিব মারা গিয়েছেন। প্রশাসকের দেখা মিলল না ইউনিয়ন পরিষদে। তালাবন্দি চেয়ারম্যানের ঘর, উদ্যোক্তার কক্ষও। মেম্বারদের হলঘর খোলা থাকলেও নেই কোনও জনপ্রতিনিধি। অথচ বাইরে অপেক্ষায় একের পর এক মানুষ—কারও কলেজে ভর্তি হতে নাগরিকত্ব সনদ দরকার, কারও প্রয়োজন বাবার মৃত্যুসনদ, কেউ আবার ভোটার হওয়ার জন্য এসেছেন প্রত্যয়নপত্র নিতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে তাঁদের।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ৪ নম্বর ভাল্লুকগাছি ইউনিয়ন পরিষদের এই ছবিই এখন কার্যত ‘অভিভাবকহীন’ প্রশাসনের চেহারা তুলে ধরছে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) সকালে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, চেয়ারম্যানের কক্ষে ঝুলছে তালা। মেম্বারদের জন্য নির্ধারিত হলঘর খোলা থাকলেও সেখানে কোনও সদস্যকে পাওয়া যায়নি। উদ্যোক্তার ঘরেও তালা। পরিষদের ভিতরে বসে ছিলেন শুধু হিসাব সহকারী ও দু’জন গ্রাম পুলিশ। বাইরে অপেক্ষা করছিলেন একাধিক সেবাগ্রহীতা।

তাঁদের অভিযোগ, শুধু বুধবার নয়, কয়েক দিন ধরেই একই পরিস্থিতি। জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, নাগরিকত্ব সনদ, প্রত্যয়নপত্র-সহ বিভিন্ন পরিষেবা কার্যত বন্ধ হয়ে রয়েছে। কেউ তিন দিন, কেউ চার দিন ধরে পরিষদে ঘুরছেন। কিন্তু পরিষেবা মিলছে না।

ধোকড়াকুল এলাকার আব্দুল নুরের কথাতেই ধরা পড়েছে সমস্যার গভীরতা। কলেজে ভর্তির জন্য প্রয়োজন নাগরিকত্ব সনদ। সেই সনদের জন্য তিন দিন ধরে ইউনিয়ন পরিষদে ঘুরছেন তিনি। বুধবারও এসেছিলেন। কিন্তু ফিরে যেতে হল খালি হাতেই।

আব্দুল নুর বলেন, “নাগরিকত্ব সনদ না পেলে কলেজে কী ভাবে ভর্তি হব, সেটাই বুঝতে পারছি না। কবে সনদ পাব, সেটাও কেউ বলতে পারছেন না।” একই দশা এক ব্যক্তির। বাবার মৃত্যুর সনদ নিতে বেশ কয়েক দিন ধরে পরিষদে আসছেন তিনি। বুধবারও অপেক্ষা করলেন। শেষ পর্যন্ত সনদ না পেয়েই ফিরতে হল। ভোটার হওয়ার জন্য প্রত্যয়নপত্র ও নাগরিকত্ব সনদ নিতে এসেছিলেন আফসানা মিমি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তাকেও ফিরতে হয়েছে। অর্থাৎ, সরকারি পরিষেবা পাওয়ার জন্য যে ইউনিয়ন পরিষদে মানুষের যাওয়ার কথা, সেখানেই এখন পরিষেবা পেতে গিয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে তাঁদের।

ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন পুঠিয়া উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন। তাঁর দাবি, সচিবের মৃত্যুর পরেই কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি কখনও কাউকে হয়রানি করি না। তবে সচিব মারা যাওয়ার পর একটু সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া আজ আমি অসুস্থ হয়ে পড়ায় পরিষদে যেতে পারিনি।” কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, একজন সচিবের মৃত্যু হলে তাঁর বিকল্প ব্যবস্থা না করে কি দিনের পর দিন ইউনিয়ন পরিষদের পরিষেবা কার্যত অচল হয়ে থাকতে পারে?

পরিষদে উদ্যোক্তার অনুপস্থিতি নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। উদ্যোক্তা মিঠুন ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি ইউনিয়ন পরিষদে না থাকলেও পরিষদের কাজে ব্যস্ত ছিলাম।”

বিষয়টি নিয়ে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত সালমানের বক্তব্য, সচিবের মৃত্যুর কারণেই সাধারণ মানুষকে পরিষেবা পেতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তিনি বলেন, “সচিবের মৃত্যুর কারণে সেবা পেতে সাধারণদের বেগ পেতে হচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে বিষয়টি অবগত করেছি। দ্রুতই এটার একটি ব্যবস্থা হবে, যাতে করে মানুষ আগের মতো সেবা পেতে পারে।”

প্যানেল চেয়ারম্যান, সদস্য এবং উদ্যোক্তার অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ইউএনও বলেন, “আগামীতে সেবা প্রদানকারীরা যাতে উপস্থিত থেকে সেবা দিয়ে থাকেন, সে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

তবে প্রশাসনের এই আশ্বাসের মধ্যে প্রশ্ন একটাই—নতুন সচিব নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষ পরিষেবা পাবেন কী ভাবে?

ভুক্তভোগীদের দাবি, দ্রুত নতুন সচিব নিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসককে নিয়মিত ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত থেকে পরিষেবা কার্যক্রম তদারক করতে হবে। জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারীদের উপস্থিতিও নিশ্চিত করতে হবে। নইলে চেয়ারম্যানহীন, সচিবহীন এবং তালাবন্দি দফতরের এই ছবিই আরও কত দিন চলবে—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরছে ভাল্লুকগাছির মানুষের মুখে। #