পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করতে নতুন কৌশল হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা, তৃণমূলের স্থবিরতা কাটানো এবং মাঠের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি। কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এখন সরকার ও সংগঠনকে সমান্তরালে এগিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
ক্ষমতার অংশীদারিত্ব ও দলীয় শৃঙ্খলা: রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার পর বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলীয় চেইন অব কমান্ড বা শৃঙ্খল রক্ষা করা। দলীয় সূত্রে জানা যায়, দলের অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা মন্ত্রিত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত থাকায় কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে সমন্বয়হীনতা ও কোথাও কোথাও আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে বিএনপি চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় দলের ভেতর শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দলের মূল কাঠামোর পাশাপাশি এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের কমিটিগুলোতে নতুন ও গতিশীল নেতৃত্ব আনার প্রক্রিয়া: ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের কমিটিগুলোতে নতুন ও গতিশীল নেতৃত্ব আনার প্রক্রিয়া চলছে। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা প্রতিকূলতা ও দমন-পীড়নের মুখে যেসব নেতাকর্মী রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, তাদের মূল্যায়ন করে দলকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে জানানো হয়, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলের তৃণমূলকে শক্তিশালী করা এখন আমাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। কিছু ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন ঘটনা দলের ইমেজ ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করলেও, শক্ত হাতে তা দমন করা হয়েছে এবং এর চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে। খুব শিগগিরই জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন হবে।
স্থায়ী কমিটির একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, আমরা সংগঠনকে ভুলে যাব। রাষ্ট্র ও দল এক সুতোয় গাঁথা। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে তার প্রভাব দলের ওপরও পড়বে। তাই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল দূর করে এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়ে আমরা রাজনৈতিক মাঠে সংগঠনকে আরও বেশি কার্যকর ও শক্তিশালী করে তুলছি। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য যোগ করেন, অতীতে আন্দোলন-সংগ্রামে আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মী নির্যাতন ও মামলার শিকার হয়েছেন। আজ সেই পরীক্ষিত শক্তিকে সঠিক চ্যানেলে পরিচালিত করে সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক ধারা তৈরি করা হচ্ছে। মাঠের রাজনীতিতে বিএনপি আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ ও সতর্ক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিচালনার ব্যস্ততার মাঝেও বিএনপি যদি সময়মতো তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে, তবে তা দলের দীর্ঘমেয়াদি রাজনীতিতে সুফল বয়ে আনবে। আগামী দিনে সম্ভাব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং দলের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে তৃণমূলে সদস্য সংগ্রহ ও কমিটি হালনাগাদের কাজ পুরোদমে চলছে।
রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি দল গোছানোর চ্যালেঞ্জ: তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর থেকেই বিএনপির সামনে দুটি বড় কাজ ছিল। একদিকে সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পুরোনো সংগঠনকে সক্রিয় রাখা। তবে সরকার গঠনের পর ছয় মাস পার হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততায় দলীয় রাজনীতি অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। এ সময়ে বড় কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কর্মসূচি দেখা যায়নি এবং মাঠপর্যায়ের তৎপরতা প্রধানত দিবসভিত্তিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
মাঠের নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক দায়িত্ব: বিএনপির মাঠপর্যায়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতাই এখন সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান যেমন- জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্বেও আছেন দলের অনেক নেতা। ছাত্রদল ও যুবদলসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের বহু নেতাকর্মীকেও সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় যুক্ত করা হয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ের একটি বড় অংশের রাজনীতিতে এমপি ও মন্ত্রীরাই এখন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন।
দলের ভেতরে পদ না পাওয়া নেতাকর্মীদের ভূমিকা: দলের যে অংশটি সরকারি বা দলীয় কোনো বড় পদ পাননি, তাদের অনেকেরই মূল নজর এখন আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দিকে। বর্তমান সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী এ বছরের মধ্যেই সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হওয়ার কথা থাকায়, তৃণমূলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ ও তৎপরতা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দল সরকারে থাকলে সরকারের কার্যক্রমে সহযোগিতা করে, যার অর্থ এই নয় যে, দল পুরোপুরি সরকারে ঢুকে পড়েছে। তবে সংগঠন পুনর্গঠনের বিষয়ে নেতারা স্বীকার করেছেন যে, সরকার গঠনের পর বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোকে দ্রুততম সময়ে পুরোপুরি ঢেলে সাজানো সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে অঙ্গসংগঠনগুলো পুনর্গঠন এবং একটি জাতীয় সম্মেলন আয়োজনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্স জানান, সরকারের কর্মকাণ্ড বুঝে নিতে নেতাদের কিছুটা সময় লেগেছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক। সরকারের কাজে দলের সহযোগিতা প্রয়োজন হলেও, সরকারের ভেতরে দলকে সরাসরি ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে না, এ বিষয়ে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন।
বিশেষ প্রতিনিধি: 


















