শরতের এক রোদেলা দুপুরে নীলফামারীর বাফলা বিলের শান্ত জলে বসে কথা হচ্ছিল এক মাঝির সঙ্গে। নাম তাঁর বেলাল হোসেন, পিতা মরহুম হোসেন মাহমুদ। বাড়ি বিলেরই কোলঘেঁষা হালাইপাড়ায়। বয়সের ছাপ স্পষ্ট তাঁর চেহারায়—অনুমান ষাট কিংবা বাষট্টি পেরিয়ে গেছেন। দেশের স্বাধীনতার সময়ের ঝাপসা স্মৃতি এখনো তাঁর মনে আছে। হিন্দু পরিবারগুলো যখন দেশ ছাড়ছিল, তখনকার এক ভারী কাঁঠালগাছের শিকড়ের তৈরি শক্ত উঁড়ুন কুড়িয়ে পেয়ে আজো আগলে রেখেছেন ঘরে; যে উঁড়ুন আজও দুজন মানুষ সহজে নাড়াতে পারে না। জীবনের শিকড়টাও যেন সেই উঁড়ুনের মতোই শক্ত করে ধরে রেখেছেন বেলাল।
দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে বেলাল বড়। ছোট ভাইও পাশেই নদীর ওপারে থাকেন, পেশায় কৃষক। নিজস্ব জমিজমা বলতে মোটে দুই শতক, ভিটেটুকু ছাড়া আর কিছুই নেই। অভাবের সংসারের চাকা ঘুরাতে মানুষের জমি বর্গা নিয়ে চাষবাস আর বিলের বুকে নৌকা বাওয়া—এই তাঁর পথচলা।
বেলালের ছোট ছেলে আপন। মেট্রিক পাসের অটোপাসের সনদ হাতে পাওয়া ছেলেটি একসময় বাফলা বিলে পর্যটকদের নৌকা বাইতো, বাপের কাজে ধোকা-ঢাকি দিতো। কিন্তু বিলের সীমিত আয়ে সংসার চলে না, তাই ভালো উপার্জনের আশায় আপন এখন পাড়ি জমিয়েছে দূর ঢাকায়।
দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এক মেয়ে হালিম মাস্টারের বাড়ির পাশে সুখে থাকলেও, আরেক মেয়েকে নিয়ে বেলালের বুকফাটা হাহাকার। বাংলাবাজারের জামিনুর (পিতা: সোলেমান সরদার)-এর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া ছোট মেয়েটার ঘরে আজ দুই সন্তান। কিন্তু মাস দুই-আড়াই হলো জামাই ঢাকায় গিয়ে লাপাত্তা। মোবাইল বন্ধ, কোনো খোঁজ নেই, সংসারের জন্য এক টাকাও পাঠায় না। অসহায় মেয়েটি দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে বাবার ভিটায় এসে কান্নাকাটি করে।
বিলের জলে যখন আশপাশের তরুণ ও স্থানীয়রা দু-চারটা নৌকা নিয়ে পর্যটক টানে, তখন ষাটোর্ধ্ব বেলাল হোসেনকে লড়তে হয় আরেক যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। নিজের অভাব, ছেলের ভবিষ্যৎ আর নিঃস্ব মেয়ের দুবেলা অন্নসংস্থানের তাগিদ—সবটুকু বোঝা নিজের বয়সের কাঁধে তুলে নিয়ে বাফলা বিলের জলে এখনো বৈঠা টেনে চলেন বেলাল মাঝি।
সংবাদের শিরোনাম :
জীবনের ঘূর্ণিপাকে নীলফামারীর বাফলা বিলের মাঝি বেলালের লড়াকু জীবন
-
ফজল কাদির,নীলফামারী : - আপডেটের সময় : ০৯:৫১:৪৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ০ সময়-দৃশ্য
Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট



















