সমুদ্রসীমা বিজয়ের এক দশক পরও বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এর আগে চারটি বিদেশি কোম্পানি কাজ শুরু করলেও তিনটি বঙ্গোপসাগর ছেড়ে গেছে। ২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নতুন উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি বা পিএসসি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পায়। পরের বছর দরপত্র আহ্বান করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সন মোবিল ও শেভরনসহ ১৭টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দরপত্রের নথি কিনেছিল। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের কারণে প্রক্রিয়াটি এগোয়নি। পরে অন্তর্র্বতী সরকার আবার দরপত্র আহ্বান করলেও কোনো কোম্পানি নথি কেনেনি বা প্রস্তাব জমা দেয়নি। বরং পিএসসিতে কিছু সংশোধনের প্রস্তাব দেয় কোম্পানিগুলো। বর্তমানে বিএনপি সরকার পিএসসি সংশোধন করে আবার দরপত্র আহ্বান করেছে। আগামী ৩০ নভেম্বর দরপত্র জমার সময়সীমা শেষ হবে। তবে তুরস্কের একটি কোম্পানি ছাড়া আর কোনো প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত দরপত্রের নথি কেনেনি। ওই কোম্পানিও শেষ পর্যন্ত প্রস্তাব জমা দেবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে অন্য কোম্পানিগুলোর দরপত্র কেনার সম্ভাবনাও কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আবারও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। গ্যাস ও খনিজ সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় পেট্রোবাংলা দেশের স্থলভাগকে ২২টি এবং সমুদ্রভাগকে ২৬টি ব্লকে ভাগ করেছে। সমুদ্রের ২৬টি ব্লকের মধ্যে ১১টি অগভীর এবং ১৫টি গভীর সমুদ্রে অবস্থিত। বর্তমানে অগভীর সমুদ্রের দুটি ব্লক এসএস-০৪ ও এসএস-০৯-এ অনুসন্ধান চালাচ্ছে ভারতীয় কোম্পানি ওএনজিসি ভিদেশ লিমিটেড ও অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড। বঙ্গোপসাগরে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পিএসসির শর্ত সংশোধন এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দরপত্র জমার সময় ঘনিয়ে আসার পরও কোনো প্রস্তাব না আসায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ৩০ নভেম্বর শেষ সময় নির্ধারিত থাকায় অক্টোবরের শেষে হাতে থাকবে প্রায় এক মাস। এই সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোকে আগ্রহী করে প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাব জমা দেওয়ানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ দরপত্র আহ্বান কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ। প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ, চুক্তি স্বাক্ষর ও অনুসন্ধান কূপ খননের ওপর। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্ভাবনাময় সমুদ্র ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান শুরু না হলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বড় সুযোগ পিছিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশে গ্যাস সংকট দূর করতে দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রে তেল, গ্যাস ও খনিজ অনুসন্ধানের চেষ্টা চলছে। উৎপাদন বণ্টন চুক্তি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় নয় বলে বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। অন্তর্র্বতী সরকারের সময় তৎকালীন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান পিএসসি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করে। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসীনকে আহ্বায়ক করে নয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। পর্যালোচনা শেষে গত ১৫ জানুয়ারি প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়। এরপর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার অভ্যন্তরীণ তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেয়। চলতি বছরের মার্চে এ লক্ষ্যে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়। এতে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো এবং ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি কমাতে স্থলভাগ ও সমুদ্রের ব্লকগুলোতে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়। তবে প্রায় সাত মাস পেরিয়ে গেলেও সমুদ্রে দরপত্র গ্রহণ প্রক্রিয়া ছাড়া উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা দেশীয় কূপ খননের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েব বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গভীর সমুদ্রের ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রের ১১টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের জন্য গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। আগ্রহী কোম্পানিগুলো ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দরপত্র জমা দিতে পারবে। এ বিষয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি। বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যেও কোম্পানিগুলোর দরপত্র না কেনার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যান্য দেশে সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র বা তথ্য অনেক ক্ষেত্রে বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশে দরপত্রের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ডলার। এ কারণে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টার্কিশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানি এখনো দরপত্রের নথি কেনেনি। বিশেষজ্ঞরা ওই কোম্পানির আগ্রহকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও সরকারের পক্ষ থেকে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রচারমূলক আয়োজন না করা এবং দরপত্রের উচ্চমূল্য অন্য কোম্পানিগুলোর আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন। পেট্রোবাংলার বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ মে অফশোর বিডিং রাউন্ড চালু করা হয়। এতে বঙ্গোপসাগরের ১১টি অগভীর ও ১৫টি গভীর সমুদ্রের ব্লক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দরপত্র জমার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর ২০২৬, দুপুর ১টা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, তাঁর জানা অনুযায়ী, জুনে পাঁচটি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান সমুদ্রাঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক তথ্যের প্যাকেজ কিনেছিল। তবে তখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্রের নথি কেনেনি। তথ্য কেনা মানেই কোনো ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া নয়। ফলে প্রাথমিক আগ্রহ দরপত্রে অংশগ্রহণে রূপ নিচ্ছে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। তিনি বলেন, সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগকারীদের সাড়া না পাওয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নতুন নয়। ২০২৪ সালের অফশোর দরপত্রেও কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানি প্রস্তাব জমা দেয়নি। বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের মধ্যে ছিল গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, অনুসন্ধানের ব্যয়, ভূতাত্ত্বিক তথ্যের পর্যাপ্ততা এবং চুক্তির আর্থিক শর্ত। এবার নতুন পিএসসিতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে গ্যাসের মূল্য সংযুক্ত করা, বিনিয়োগ ব্যয় পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা, কর-সুবিধা এবং নির্দিষ্ট শর্তে গ্যাস বিক্রি ও রপ্তানির সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এসব সুবিধা বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে অনুসন্ধানে আগ্রহী করবে। তবে দরপত্রের নথি কেনার ক্ষেত্রে অনাগ্রহের কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকার বিদেশেও প্রচার চালিয়েছে।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, সরকারের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কতটি কোম্পানি দরপত্রের নথি কিনেছে, কতটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে, কতটি ব্লকে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, নির্বাচিত কোম্পানিগুলো কত অর্থ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং অনুসন্ধান কূপ খনন কবে শুরু হবে, তার ওপর। এসব তথ্য প্রকাশিত না হলে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কঠিন হবে। স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমে আসায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে। বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে সরবরাহের অনিশ্চয়তাও তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় বঙ্গোপসাগরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তবে দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হলে অনুসন্ধান, মজুত যাচাই ও উৎপাদন শুরুর সময়ও পিছিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ প্রতিনিধি : 

















